সকালে তাড়াহুড়ো করে অফিসে যাওয়া, কাজের চাপে দুপুরের খাবার বাদ দেওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে বসে থাকা—ব্যস্ত কর্মজীবনে এমন অভ্যাস অনেকেরই নিত্যদিনের সঙ্গী। দিনের কাজ শেষ হতে হতে রাত হয়ে যায়। এরপর দেরিতে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাওয়াও নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়। সময়ের অভাবে এসব অভ্যাসকে স্বাভাবিক মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং অপর্যাপ্ত ঘুমসহ কিছু জীবনযাপন-সংক্রান্ত বিষয় টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে যাঁদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, ওজন বেশি কিংবা অন্যান্য ঝুঁকির কারণ আছে, তাঁদের দৈনন্দিন অভ্যাসের বিষয়ে আরও সচেতন থাকা প্রয়োজন।
শুধু কী খাচ্ছেন, তা-ই নয়; কখন খাচ্ছেন, কতটা নড়াচড়া করছেন এবং পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার অভ্যাস
অফিসে একটানা কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা অনেকের পেশাগত জীবনের অংশ। কিন্তু দিনের বেশির ভাগ সময় বসে কাটালে শারীরিক কার্যক্রম কমে যায়। নিয়মিত হাঁটাচলা বা ব্যায়ামের অভাব থাকলে এই নিষ্ক্রিয়তা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
শরীরের পেশি গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করে। শারীরিক কার্যক্রমের মাধ্যমে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সহায়তা পাওয়া যায়। বিপরীতে দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা এবং অন্যান্য ঝুঁকির কারণ একসঙ্গে থাকলে ইনসুলিন প্রতিরোধের আশঙ্কা বাড়তে পারে। এ অবস্থায় শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি যথাযথ সাড়া দিতে পারে না, ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই কাজের ফাঁকে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ানো, অল্প সময় হাঁটা কিংবা সম্ভব হলে সিঁড়ি ব্যবহার করার মতো ছোট অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী হতে পারে।
দুপুরের খাবার বাদ দেওয়া ও অনিয়মিত সময়ে খাওয়া
কাজের চাপ সামলাতে গিয়ে অনেকেই সময়মতো খাবার খান না। কেউ দুপুরের খাবার বাদ দেন, কেউ আবার ক্ষুধা লাগলে চা, বিস্কুট কিংবা অন্যান্য হালকা খাবার খেয়ে কাজ চালিয়ে যান। পরে একসঙ্গে বেশি খাবার খাওয়ার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের অনিয়ম সবার ক্ষেত্রে একই প্রভাব ফেলে না। তবে দীর্ঘদিন অসামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস বজায় থাকলে সুষম পুষ্টি গ্রহণ ব্যাহত হতে পারে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কর্মব্যস্ততার মধ্যেও খাবারের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা ভালো। সম্ভব হলে বাড়ি থেকে সুষম খাবার নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। খাবারে শাকসবজি, ডাল, পরিমিত পরিমাণে শর্করাজাতীয় খাবার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিন রাখার চেষ্টা করা উচিত। অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
রাত করে খাবার খাওয়ার অভ্যাস
কাজ শেষ করতে দেরি হওয়ায় অনেকের রাতের খাবার খাওয়ার সময় পিছিয়ে যায়। কখনো রাত জেগে কাজ করার কারণে ক্ষুধা বেড়ে যায়, ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার খাওয়ার প্রবণতাও দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসক নিরাজ কুমার সেল মেটাবলিজম সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেছেন। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর করা ওই গবেষণায় দেরিতে খাবার খাওয়ার সঙ্গে ক্ষুধা বৃদ্ধি, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের পরিবর্তন এবং জেগে থাকা অবস্থায় শক্তি ব্যয়ের হার কমে যাওয়ার সম্পর্ক দেখা গেছে।
তবে গবেষণার ফলাফল সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য হবে, এমন নয়। তারপরও নিয়মিত খাবারের সময় বজায় রাখা এবং ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে।
ঘুমের ঘাটতি ও অনিয়মিত রুটিন
কাজের চাপ, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে থাকা কিংবা রাত জেগে কাজ করার কারণে অনেকের ঘুমের সময় কমে যায়। দিনের পর দিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্ষুধা ও তৃপ্তি নিয়ন্ত্রণকারী প্রক্রিয়া, শরীরের বিপাক এবং দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে।
অপর্যাপ্ত ঘুম ও অনিয়মিত ঘুমের রুটিন টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। তবে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি শুধু ঘুমের ওপর নির্ভর করে না; বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, ওজন, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কার্যক্রমসহ একাধিক বিষয় এতে ভূমিকা রাখে।
তাই প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখা ভালো।
ব্যায়ামের জন্য সময় না রাখা
অনেকেই মনে করেন, ব্যস্ত রুটিনে আলাদা করে ব্যায়ামের সময় বের করা সম্ভব নয়। কিন্তু শারীরিক কার্যক্রমের জন্য সব সময় দীর্ঘ সময় বরাদ্দ করতে হবে, এমন নয়। দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প অল্প করে হাঁটা এবং নিয়মিত নড়াচড়া করাও কাজে আসতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম করা উচিত। দ্রুত হাঁটা এর একটি উদাহরণ। ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাস্থ্যের অবস্থা অনুযায়ী কার্যক্রমের ধরন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অফিসে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে বিরতি নিয়ে হাঁটা, কাছাকাছি দূরত্বে সম্ভব হলে হেঁটে যাওয়া এবং অবসর সময়ে নিয়মিত শরীরচর্চা করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণেও উপকার মিলতে পারে।
ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বুঝতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা
ডায়াবেটিসের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। ফলে কেউ কেউ দীর্ঘদিন বুঝতেই পারেন না যে তাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়েছে। অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, অকারণে ওজন কমে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিক ক্লান্তির মতো লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তবে এসব লক্ষণ না থাকলেও ঝুঁকির কারণ থাকলে পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, ওজন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা উচিত। প্রয়োজনে রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলও পরীক্ষা করতে হবে।
কাজের চাপ থাকলেও অভ্যাসে আনুন পরিবর্তন
কর্মজীবনের ব্যস্ততা সব সময় এড়ানো সম্ভব নয়। তবে কাজের ফাঁকে নিয়মিত নড়াচড়া করা, খাবারের সময় নির্ধারণ, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত ঘুমের মতো অভ্যাস ধীরে ধীরে গড়ে তোলা যায়।
মনে রাখতে হবে, কোনো একটি অভ্যাসই একা ডায়াবেটিসের কারণ নয়। আবার স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করলেই যে ডায়াবেটিস কখনো হবে না, এমন নিশ্চয়তাও নেই। তবে নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এসব পদক্ষেপ টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করতে পারে।
কাজের চাপের কারণে নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া যেন অবহেলিত না হয়। কারণ কর্মব্যস্ততার মধ্যেও সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কালের আলো/এএইচ/জেএন

লাইফস্টাইল ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:৩৪ অপরাহ্ণ