১৮ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা, মিলবে কবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ । ৫:১৯ অপরাহ্ণ

বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থায়ন পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও এখনো নিশ্চিত হয়নি কোনো অর্থই। বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ অর্থায়ন কাঠামো এবং চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আরও ৩.৭৭ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ও বাজেট সহায়তা চেয়েছে সরকার। অন্যদিকে, আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চলছে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে। সব মিলিয়ে অর্থায়নের আলোচনায় রয়েছে ১৮.২৭ বিলিয়ন ডলার। তবে কোনো প্রস্তাবই এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।

গত ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের অর্থায়ন প্রস্তাব ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। সহযোগিতার আশ্বাস মিললেও অর্থের পরিমাণ, ঋণের শর্ত এবং অর্থ ছাড়ের সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ফলে বড় অঙ্কের অর্থায়নের সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা কবে বাস্তবে রূপ নেবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

  • বিশ্বব্যাংকের ১৩.৭৭ ও আইএমএফের ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদনের অপেক্ষায়
  • বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে
  • ঋণ অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের সময়সূচি এখনো চূড়ান্ত নয়

বিশ্বব্যাংকের ১০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ প্রস্তাব
নিয়মিত সহায়তার বাইরে আগামী তিন বছরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পেতে বিশ্বব্যাংকের কাছে বিশেষ কাঠামো প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। ‘রেজিলিয়েন্স, রিফর্ম অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ’ (আরআরআইপি) নামের এই উদ্যোগে বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান সচল রাখা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং জরুরি অর্থায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, সরবরাহ ও বাণিজ্যের সহনশীলতা বাড়াতে চার বিলিয়ন ডলার, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানে দেড় বিলিয়ন ডলার, আর্থিক খাতের পুনরুদ্ধার ও ব্যাংকিং সংস্কারে তিন বিলিয়ন ডলার এবং জরুরি ও যৌথ অর্থায়নের জন্য দেড় বিলিয়ন ডলার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

গত ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের বৈঠকে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। ব্যাংককের বার্ষিক সভাতেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যে কাঠামোটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এ জন্য আগামী ৬০ দিনের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বিশ্বব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে কারিগরি দল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে প্রস্তাবটির অনুমোদন, অর্থায়নের শর্ত ও অর্থ ছাড়ের সময়সীমা এখনো নিশ্চিত নয়।

চলতি অর্থবছরের ৩.৭৭ বিলিয়ন ডলারও অনিশ্চিত
দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ অর্থায়নের পাশাপাশি চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে ৩.৭৭ বিলিয়ন ডলার চেয়েছে সরকার। এর মধ্যে ২.৭৭ বিলিয়ন ডলার প্রকল্প অর্থায়ন এবং এক বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা হিসেবে চাওয়া হয়েছে। এই অর্থায়নও এখনো অনুমোদিত হয়নি।

সরকারের পাইপলাইনে থাকা ১০টি প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও খাদ্যনিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্যোগ। তুলনামূলক কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সুবিধা পেতে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের আইডা গ্যারান্টির প্রস্তাব রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে ফিন্যানশিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২-এর জন্য চাওয়া হয়েছে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার। খাদ্যনিরাপত্তায় জরুরি সহায়তার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৩০০ মিলিয়ন ডলার।

এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডর, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা ইনার সার্কুলার রিং রোড এবং রাজধানীর চারপাশের নদী ও খাল পুনরুদ্ধার নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব প্রকল্পে অর্থায়ন পাওয়া গেলে যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহ ও খাদ্যনিরাপত্তায় সহায়তা মিলতে পারে। তবে প্রস্তাবিত প্রকল্পের তালিকাভুক্তি অর্থ ছাড়ের নিশ্চয়তা দেয় না; এ জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন ও অনুমোদন সম্পন্ন হতে হবে।

আইএমএফের ঋণে বড় শর্ত অর্থনৈতিক সংস্কার
আইএমএফের সঙ্গে সম্ভাব্য ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা চলছে। ১৬ অক্টোবর ব্যাংককে সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আলোচনায় নীতিগত অগ্রগতি হয়েছে। বাকি বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে দুই পক্ষের কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চলবে।

আলোচনায় কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, রাজস্ব আহরণ জোরদার, ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য কর্মসূচিতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য এবং দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনে সময়সীমাবদ্ধ পরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে ঋণের চূড়ান্ত শর্ত, অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের সময়সূচি এখনো নিশ্চিত হয়নি। এখানে মূল বিবেচ্য শুধু নতুন ঋণের পরিমাণ নয়; বরং অর্থনৈতিক নীতিতে কী পরিবর্তন আনা হবে এবং সরকার সেগুলো বাস্তবায়নে কতটা অগ্রগতি দেখাতে পারবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আলোচনা এগোলেও অর্থপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা এখনো তৈরি হয়নি।

আন্তর্জাতিক বাজারেও অর্থায়নের চেষ্টা
বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার থেকেও অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। প্রতিনিধিদল ইউরোক্লিয়ার, সিটি, ফিচ রেটিংস, নিউইয়র্ক ফেড, এইচএসবিসি, ব্যাংক অব আমেরিকা ও জেপি মরগানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে।

এসব আলোচনায় বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং, সার্বভৌম বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনা, বিনিয়োগ পরিবেশ ও সামষ্টিক অর্থনীতি গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থার (আইএফসি) সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠন, আর্থিক খাতের সংস্কার, বাণিজ্য অর্থায়ন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকারি প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাসের কথা উল্লেখ করা হলেও নতুন অর্থায়নের নির্দিষ্ট পরিমাণ বা অর্থ ছাড়ের সময়সীমা জানানো হয়নি।

অর্থায়ন পেলেই কি কাটবে অর্থনীতির চাপ?
দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং বেসরকারি বিনিয়োগে মন্থরতার কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজন বেড়েছে। নতুন অর্থায়ন বাজেটের চাপ সামলানো, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে সহায়তা করতে পারে। তবে ঋণ পেলেই অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলামের মতে, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের অর্থায়ন তুলনামূলক কম ব্যয়ে পাওয়া যায়। যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে তা বাজেট ঘাটতি মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনীতির প্রতি আস্থা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।

তবে তিনি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও অর্থপাচার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অর্থনীতির ঝুঁকি থেকেই যাবে।

কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন