ছাতিম ফুলের ঘ্রাণে মুগ্ধ মৌলভীবাজার

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ

হেমন্তের আগমনে সুগন্ধি ফুলে ভরে উঠেছে মৌলভীবাজারের কয়েকটি এলাকার ছাতিম গাছ। ডালে ডালে ফুটে থাকা সাদা ফুলের মিষ্টি সুবাস আর অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা। তবে একসময় গ্রামবাংলার পথঘাট ও বনজঙ্গলে প্রচুর দেখা গেলেও বর্তমানে কমছে ঐতিহ্যবাহী এই গাছের সংখ্যা।

মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর-ফেঞ্চুগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের পাশে, শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখান সড়কের কাকিয়ারপুল ও বিরাহিমপুর এলাকায় রয়েছে তিনটি বিশালাকার ছাতিম গাছ। হেমন্তের শুরু থেকেই গাছগুলোর ডালপালা ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে। ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এবং সুবাস নিতে বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ সেখানে ভিড় করছেন।

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও ছাতিম ফুলের বিশেষ স্থান রয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই গাছ। শান্তিনিকেতনে ছাতিম গাছের নিচে বসে তিনি লেখালেখি ও পাঠদান করতেন। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ছাতিমের পাতা উপহার দেওয়ার ঐতিহ্যও রয়েছে সেখানে।

কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসেও ছাতিম ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাসের বর্ণনা পাওয়া যায়। কবি মোহাম্মদ জায়েদ আজিজের কবিতাতেও উঠে এসেছে এই ফুলের প্রতি মুগ্ধতা। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশেষভাবে পরিচিত ছাতিম ফুল হেমন্তের প্রকৃতিতেও যোগ করেছে অনন্য সৌন্দর্য।

ছাতিম একটি সুগন্ধি ফুলের গাছ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Alstonia scholaris। গাছটি Apocynaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত এবং অনুকূল পরিবেশে প্রায় ৪০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ভারতীয় উপমহাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছাতিম পরিচিত একটি বৃক্ষ। সংস্কৃত ভাষায় একে ‘সপ্তপর্ণ’ বা ‘সপ্তপর্ণা’ বলা হয়।

বাংলাদেশের আর্দ্র ও জলসিক্ত পরিবেশে ছাতিম গাছ জন্মাতে দেখা যায়। এর নরম কাঠ দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ড, পেনসিল ও প্যাকিংবক্স তৈরি করা হয়। গাছটির ছাল ও আঠা ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এসব ঔষধি ব্যবহারের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন।

একসময় বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের রাস্তার পাশে, বন-জঙ্গলে ও বসতবাড়ির আশপাশে প্রচুর ছাতিম গাছ দেখা যেত। কিন্তু কাঠের বাণিজ্যিক মূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় গাছটি রোপণে মানুষের আগ্রহ কমেছে। পাশাপাশি নির্বিচারে গাছ কাটা ও বসতবাড়ি নির্মাণের কারণে অন্যান্য বৃক্ষের সঙ্গে ছাতিমও হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি থেকে।

শ্রীমঙ্গল আনওয়ারুল উলুম ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাফসা খাতুন বলেন, একসময় তাঁদের এলাকায় অনেক ছাতিম গাছ ছিল। হেমন্তে ফুল ফুটলে চারপাশ সুগন্ধে ভরে উঠত। ছোটবেলায় মা-চাচিদের কাছে তিনি এই গাছের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর ঐতিহ্যগত ঔষধি ব্যবহারের কথাও শুনেছেন।

তিনি আরও বলেন, কাঠের বাণিজ্যিক মূল্য কম হওয়ায় বর্তমানে ছাতিম গাছ রোপণে মানুষের আগ্রহ কম। ফলে ক্রমেই কমছে এর সংখ্যা। আগামী প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্যবাহী গাছের পরিচয় ধরে রাখতে ছাতিম সংরক্ষণ ও নতুন করে গাছ লাগানো জরুরি।

হেমন্তে ছাতিম ফুলের তীব্র সুবাস প্রকৃতিকে মোহিত করলেও গাছটির সংখ্যা কমে যাওয়া পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রশ্ন সামনে এনেছে। তাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ছাতিম গাছ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে নতুন গাছ রোপণ করা প্রয়োজন।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন