জুয়ার নেশায় নিঃস্ব, এজেন্টদের সম্পদের পাহাড়

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ১১:২০ পূর্বাহ্ণ

স্মার্টফোনের পর্দায় এক ক্লিকেই বাজি, মুহূর্তেই জেতার স্বপ্ন—আর পরক্ষণেই নিঃস্ব হওয়ার ফাঁদ। এই প্রলোভনে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়ার ভয়াবহ নেটওয়ার্ক। জুয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে আর্থিক সর্বস্ব হারাচ্ছেন অনেকে; কেউ কেউ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জড়িয়ে পড়ছেন অপরাধে। অন্যদিকে, বিদেশ থেকে পরিচালিত জুয়ার সাইটের দেশীয় এজেন্টরা কমিশন, গ্রাহকের জমা অর্থ ও লেনদেন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গড়ে তুলছেন লাভজনক নেটওয়ার্ক। এর সঙ্গে বাড়ছে অবৈধ অর্থের প্রবাহ ও বিদেশে অর্থ পাচারের আশঙ্কা।

  • অনলাইন বেটিংয়ে ৮৩০ কোটি টাকার বাজার
  • কমিশনের ব্যবসায় ফুলেফেঁপে ওঠার অভিযোগ
  • জুয়াড়িদেরও ধরছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে পাওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, দেশে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত মানুষের সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে। কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলা না গেলে ২০২৭ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দুই কোটিতে পৌঁছাতে পারে। একই প্রতিবেদনে অনলাইন জুয়ার বাজারের আকার প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। বাজারটি বছরে ৪ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়ছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এই পরিসংখ্যান শুধু আসক্ত মানুষের সংখ্যা কিংবা জুয়ার বাজারের আকারে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণদের আর্থিক নিরাপত্তা, পারিবারিক স্থিতিশীলতা, ডিজিটাল লেনদেনের অপব্যবহার এবং সংঘবদ্ধ আর্থিক অপরাধের ঝুঁকি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একদিকে জুয়ার এজেন্ট ও সমন্বয়কারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে, অন্যদিকে নজরদারিতে রাখছে জুয়ায় অংশগ্রহণকারীদেরও।

বিদেশি প্ল্যাটফর্ম, দেশীয় অর্থের জোগান
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশ থেকে পরিচালিত অনলাইন জুয়ার সাইটগুলোর বাংলাদেশি গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ, অ্যাকাউন্ট খোলা এবং অর্থ জমা ও উত্তোলনের কাজে স্থানীয় এজেন্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে এসব লেনদেন সম্পন্ন করা হয়। ফলে অনলাইন জুয়ার কার্যক্রম শুধু ইন্টারনেটে বাজি ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর পেছনে তৈরি হয়েছে গ্রাহক সংগ্রহ ও অর্থ ব্যবস্থাপনার পৃথক নেটওয়ার্ক।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এজেন্টরা নতুন গ্রাহক সংগ্রহের কমিশন, গ্রাহকের জমা করা অর্থের নির্দিষ্ট অংশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাসিক বেতন পান। এই আর্থিক প্রণোদনাই জুয়ার বাজার সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অভিযানে বড় এজেন্ট ও সমন্বয়কারীদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও সামনে এসেছে। গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর শাজাহানপুর থেকে অহিদুর রহমান (৪৩) নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তিনি আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়ার একাধিক সাইটের প্রশাসক ও সুপার এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছিল। তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে জুয়ার অর্থ দিয়ে জমি, গাড়িসহ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও ওঠে। এ ছাড়া সুমন রায়, স্নিগ্ধ সিকদার ও আনোয়ার নামে আরও কয়েকজনকে ঘিরে অনলাইন জুয়ার দেশীয় নেটওয়ার্কের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

সিআইডির পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলা এবং অনলাইন ক্যাসিনোকে কেন্দ্র করে এসব প্ল্যাটফর্মে অর্থ লেনদেন চলে। এজেন্টরা অর্থ জমা ও উত্তোলন ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি নতুন গ্রাহকদের সহায়তা ও কাস্টমার সাপোর্টের দায়িত্বও পালন করেন।

জুয়াড়িদের বিরুদ্ধেও অভিযান
অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযানের পরিধি এখন শুধু পরিচালনাকারী ও এজেন্টদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জুয়ায় অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত ১৩ অক্টোবর রাজধানীর আদাবরে অনলাইন জুয়া খেলার সময় এক যুবককে আটক করা হয়। ১৪ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খাদেমপাড়ায় পাঁচজন এবং ২০ অক্টোবর গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে আটজনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়। এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও পাবনার আতাইকুলায়ও অনলাইন জুয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছিল।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জুয়ায় অর্থ হারিয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ মাদক, চুরি ও ছিনতাইসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। তবে জুয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকেই অপরাধে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। আসক্তি, আর্থিক ক্ষতি এবং অপরাধের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও পৃথক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

অভিযানই কি যথেষ্ট?
অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করা, সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ, বিদেশি প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জুয়ার বিজ্ঞাপন ও গ্রাহক সংগ্রহের নেটওয়ার্ক বন্ধ করা। একই সঙ্গে তরুণদের সচেতন করা এবং আর্থিক ক্ষতি ও আসক্তিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তার ব্যবস্থাও জরুরি।

কারণ, এজেন্ট গ্রেপ্তার হলেও নতুন এজেন্ট তৈরি হলে কিংবা একটি সাইট বন্ধ হওয়ার পর অন্য সাইট চালু হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। আবার জুয়ায় অংশগ্রহণকারীদের আটক করাই যদি প্রধান কৌশল হয়, তাহলে এর পেছনের অর্থনৈতিক কাঠামো ও পরিচালনাকারী চক্র অক্ষত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

অনলাইন জুয়ার বাজার ও আসক্তির যে চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা সত্য হলে এটি নিছক আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; বরং তরুণ সমাজের আর্থিক নিরাপত্তা এবং দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কসংকেত। কার্যকর নজরদারি, জবাবদিহি, আর্থিক অপরাধ দমন ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের সমন্বয়ই পারে এই বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনতে।

কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন