শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনাজুড়ে বিস্তৃত চলনবিলে আসতে শুরু করেছে হাজারো অতিথি পাখি। বিলের অল্প পানিতে সাদা বক, গাংচিল, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, ডাহুক ও শামুকখোলসহ নানা প্রজাতির পাখির বিচরণে মুখর হয়ে উঠেছে জলাভূমি। সারাদিন পানিতে খাবার খোঁজার পর সন্ধ্যা নামলে ঝাঁক বেঁধে গাছের ডালে আশ্রয় নিচ্ছে তারা। পাখিদের ডানা ঝাপটানো, উড়ে বেড়ানো আর কোলাহলে মনোরম পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে চলনবিলজুড়ে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলনবিলের বিভিন্ন অংশে এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চোখে পড়ছে অতিথি পাখির আনাগোনা। বিশেষ করে নাটোরের সিংড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে পাখিদের বিচরণ প্রকৃতিপ্রেমীদের নজর কাড়ছে। নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে চলনবিল। এর বড় একটি অংশ নাটোরের সিংড়া উপজেলায় অবস্থিত। বিলের নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের দুই পাশ এবং সিংড়া-বারুহাস-তাড়াশ ডুবন্ত সড়কের আশপাশে দেখা যাচ্ছে নানা প্রজাতির পাখি।
কাকডাকা ভোরে দল বেঁধে খাবারের সন্ধানে বের হয় পাখিরা। অল্প পানিতে ডুব দিয়ে মাছ ধরা, জলাশয়ের ওপর দিয়ে ডানা মেলে উড়ে যাওয়া কিংবা একসঙ্গে গাছের ডালে বসার দৃশ্য বিলের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে। সাদা বক, পানকৌড়ি, শামুকখোল ও বালিহাঁসের পাশাপাশি দেখা মিলছে নাম না জানা বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরও। শীতের মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই পাখিদের এমন উপস্থিতি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আনন্দ তৈরি করেছে। তবে পাখির নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে শিকারিদের তৎপরতা ঠেকানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চলনবিলের পাখিদের মধ্যে সাদা বক কৃষকের উপকারী বন্ধু হিসেবে পরিচিত। মাগুড়া গ্রামের কৃষক সহিদুল ইসলাম ও তাজপুর গ্রামের বাবুল হোসেন জানান, এ বছর বিলে অতিথি পাখির সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। সাদা বক ও শামুকখোলের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে।কৃষকদের ভাষ্য, জমিতে হালচাষের সময় সাদা বক দল বেঁধে কৃষকের পেছনে পেছনে ঘোরে। এ সময় মাটি থেকে বেরিয়ে আসা ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসলের উপকার করে পাখিগুলো। ফলে পাখির উপস্থিতি শুধু বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই বাড়ায় না, কৃষিকাজেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, তারা চলনবিলের পাখি শিকার করতে দেন না। পাখি ও প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা থেকেই এসব প্রাণী রক্ষায় সচেতন থাকার চেষ্টা করেন তারা। অতিথি পাখির আগমনে চলনবিল প্রাণবন্ত হয়ে উঠলেও কিছু শিকারির তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে পরিবেশবাদীদের। চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর এ সময়ে বক, বালিহাঁস, পানকৌড়ি ও শামুকখোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বিলে আসে। তাদের বিচরণে জলাভূমিতে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি হয়।
তবে কিছু অসাধু শিকারি ফাঁদ পেতে এসব পাখি শিকার করে বলে জানান তিনি। পাখি শিকার বন্ধ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংগঠনটির সদস্যরা ২০১২ সাল থেকে কাজ করছেন। তারা শিকারের ঘটনা সম্পর্কে প্রশাসনকে অবহিত করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং অতিথি পাখির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা। চলনবিলের পাখি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রশাসনও তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন সিংড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত আনজুম।
সন্ধানী বার্তা/এএইচ/এমএসআইপি