আগের দুই মৌসুমের লোকসান কাটিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় রংপুর অঞ্চলে আগাম আলু চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকেরা। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি ও বাজারদরের অনিশ্চয়তা থাকলেও আগাম আলু বাজারে তুলে ভালো দাম পাওয়ার আশায় নতুন মৌসুমের পরিকল্পনা করছেন তাঁরা। অন্যদিকে বীজ আলুর বিক্রি বাড়াতে ডিলারদের জন্য প্রতি কেজিতে এক টাকা ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী বীজ সরবরাহ এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। কৃষকদের প্রত্যাশা, এবার ফলন ভালো হলে এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া গেলে আগের মৌসুমের ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে বীজের দাম কিছুটা কমলেও সার, কীটনাশক, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না তাঁদের।
বীজ আলু বিক্রিতে বিএডিসির বিশেষ ছাড়
বিএডিসি রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় সংস্থাটির অনুমোদিত ডিলারের সংখ্যা ৮১৩। চলতি মৌসুমে এসব জেলায় মোট ৪ হাজার ৪৯৩ মেট্রিক টন বীজ আলু বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর থেকে বীজ আলু বিক্রি শুরু হয়েছে। ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত ১৭৯ জন ডিলার প্রায় ৯৬০ মেট্রিক টন বীজ আলু সংগ্রহ করেছেন। বিক্রি বাড়াতে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ডিলারদের জন্য প্রতি কেজি বীজ আলুতে এক টাকা ছাড় ঘোষণা করেছে বিএডিসি।
বিএডিসি রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মাসুদ সুলতান বলেন, কৃষকদের চাহিদার ভিত্তিতে আগাম বুকিং দিয়ে ডিলাররা বীজ আলু সংগ্রহ করেন। বীজ বিক্রি বাড়াতে ডিলারদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, বীজ সরবরাহ ও বিক্রির কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলে কৃষকেরা সময়মতো প্রয়োজনীয় বীজ সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে আগাম আলু রোপণের প্রস্তুতিও সহজ হবে।
আগাম আলু চাষে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশা
আগের মৌসুমের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগাম জাতের আলু চাষের পরিকল্পনা করছেন রংপুর অঞ্চলের অনেক কৃষক। তাঁদের একজন রংপুর সদর উপজেলার কৃষক জুয়েল হোসেন। তিনি স্বল্পমেয়াদি আগাম আমন ধান কাটার পর একই জমিতে আলু রোপণ করবেন। এ জন্য জমি পরিচর্যা, সার প্রয়োগ ও বীজ সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। জুয়েল হোসেন জানান, আগের মৌসুমের লোকসান পুষিয়ে নিতে এবার আগাম আলু চাষে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। গতবারের তুলনায় বীজের দাম কিছুটা কমলেও সার, কীটনাশক, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচের চাপ সামলে লাভ করতে হলে ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়া জরুরি।
কৃষকদের হিসাবে, আগাম আলু বাজারে তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে বাজারে সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে গেলে তাঁদের প্রত্যাশিত লাভ নাও হতে পারে। এ কারণে উৎপাদন পরিকল্পনার পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক থাকতে হচ্ছে তাঁদের।
বীজের দাম কিছুটা কমলেও বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
চলতি মৌসুমে বীজ আলুর দাম কিছুটা কমেছে। কিন্তু অন্যান্য কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আলু উৎপাদনের মোট খরচ বেড়ে যাচ্ছে। সার, কীটনাশক, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরি—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়ছেন কৃষকেরা।
রংপুরের কৃষক শাহাদৎ হোসেন এবার সানশাইন ও বারি-৭ জাতের আলু রোপণ করছেন। তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় বীজের দাম কমলেও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। গত বছর এক ট্রলি গোবর সার এক হাজার টাকায় কিনেছিলেন, এবার একই পরিমাণ সার কিনতে হচ্ছে এক হাজার ২৫০ টাকায়। এর পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি ও সার সংগ্রহের ভোগান্তিও রয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচ এভাবে বাড়তে থাকলে বাজারে ভালো দাম না পেলে লোকসানের ঝুঁকি আরও বাড়বে। বিশেষ করে চাষের শুরুতেই বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে হওয়ায় মৌসুম শেষে লাভের হিসাব নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হচ্ছে তাঁদের।
শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিতে চাপে কৃষকেরা
কাউনিয়া উপজেলার বাহাগীলি গ্রামের কৃষক শহিদুর রহমানের ১০ বিঘা জমিতে অ্যাস্টেরিক জাতের আলু রোপণের কাজ চলছে। সেখানে কর্মরত শ্রমিক সরদার আলিম উদ্দিন জানান, আগাম আলু রোপণের কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার জমিতে আলুর বীজ রোপণের মজুরি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর এক বিঘা জমিতে আলুর বীজ রোপণের মজুরি ছিল এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা। এবার তা বেড়ে দুই হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে।
আলিম উদ্দিন বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি আয় করেও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি কৃষকদের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। জমির পরিমাণ বেশি হলে শ্রমিক নিয়োগে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে বীজের দামে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সামগ্রিক উৎপাদন খরচ কমছে না।
৫৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা
চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় ৫৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এসব জমি থেকে ১৫ লাখ ৯১ হাজার ৫২৫ মেট্রিক টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এরই মধ্যে ১ হাজার ৭০ হেক্টর জমিতে আগাম আলুর আবাদ হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ মো. সাইফুল আলম বলেন, চলতি মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আলু উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। আগাম আলু চাষের মাধ্যমে কৃষকেরা জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারবেন বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। আগাম আলু চাষের মাধ্যমে একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে জমির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের আয় বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সময়মতো বীজ, সার ও অন্যান্য উপকরণ পাওয়া এবং উৎপাদিত আলুর উপযুক্ত বাজার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই কৃষকদের বড় প্রত্যাশা
রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষকের জীবিকায় আলু চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই নতুন মৌসুমে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমানো, কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কৃষকদের প্রত্যাশা, আগাম আলুর ভালো ফলন এবং বাজারে উপযুক্ত দাম পাওয়া গেলে আগের দুই মৌসুমের লোকসান কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে। বিএডিসির বীজে ছাড় এবং কৃষি বিভাগের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের উদ্যোগও তাঁদের সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু উৎপাদন বাড়লেই কৃষকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি নিশ্চিত হবে না। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পেলে ভালো ফলন সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাই নতুন মৌসুমে আলু চাষের সাফল্য নির্ভর করবে ফলন, উৎপাদন খরচ এবং বাজারদরের সমন্বয়ের ওপর।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি