নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই, তবু কেন ক্ষমতায় নেতানিয়াহু?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ২:১৩ অপরাহ্ণ

ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কোনো পক্ষই। বুথফেরত জরিপের ফল অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫২টি আসন। অথচ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১২০ আসনের পার্লামেন্টে অন্তত ৬১টি। ফলে নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়লেও আপাতত প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল থাকছেন নেতানিয়াহু। নতুন সরকার গঠনের সমীকরণ মেলাতে এখন শুরু হবে জোটের দর-কষাকষি।

নির্বাচনের ফলাফলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে। নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের পাশাপাশি আরব দলগুলোও সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের মূলধারার ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশ আরব দলগুলোর সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগিতে অনীহা দেখালেও এবার তাদের সমর্থন সরকার গঠনের হিসাব বদলে দিতে পারে।

সরকার গঠনে কঠিন সমীকরণ
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে নেতানিয়াহুর জোট ৫২টি আসন পেতে পারে বলে বুথফেরত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হলে তাঁকে আরও অন্তত ৯টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।

এ পরিস্থিতিতে বিরোধী শিবিরের কোনো দলকে নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু। আলোচনায় সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ নাম সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন ‘টুগেদার’ দল। দলটি ১২ থেকে ১৩টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের সমর্থন পেলে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে।

তবে বেনেটের দলকে সহজে নেতানিয়াহুর শিবিরে টেনে আনা সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যেই বেনেট ও ইয়ার লাপিদ বিরোধী রাজনৈতিক সমীকরণ গড়ে তুলেছেন। ফলে এই দুই শিবিরের মধ্যে সমঝোতা হবে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন।

বিরোধীদের সামনে আরব দলগুলোর সমর্থনের প্রশ্ন
নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের জন্যও সরকার গঠন সহজ নয়। নির্বাচনী প্রচারে বিরোধী জোটের নেতারা বারবার আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে নাফতালি বেনেট এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তবে আরব দলগুলোর নেতারা সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এখন আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিরোধী শিবিরের অবস্থান কতটা বদলায়, তার ওপরও সরকার গঠনের সম্ভাবনা নির্ভর করছে। নির্বাচনী প্রচারে যেসব দলকে রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে, তারাই শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিরোধী শিবিরের আরেক নেতা অ্যাভিগদর লিবারম্যান সংখ্যালঘু সরকারের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে নতুন নির্বাচনই হতে পারে বিকল্প পথ। অন্যদিকে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এড়াতে নেতানিয়াহুর নিজ দলের কিছু প্রবীণ রাজনীতিকও ভিন্ন সমীকরণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ নেতানিয়াহুকে ছেড়ে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রেসিডেন্টের হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব
নির্বাচনের পরবর্তী ধাপে সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। আগামী কয়েক সপ্তাহে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে কোন পক্ষ সরকার গঠনের সুযোগ পাবে, তা নির্ধারিত হতে পারে।

তবে সমঝোতা দ্রুত না হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন। কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস ধরে আলোচনা চললেও অন্তর্বর্তী সময়ে তাঁর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ থাকবে।

বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর বেনেট দাবি করেছেন, নেতানিয়াহু নির্বাচনে হেরেছেন এবং তাঁর সরকারের বিদায়ের সময় হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে রাজনৈতিক ধাক্কা খাওয়া আর আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ছাড়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নতুন সরকার গঠনের চূড়ান্ত সমীকরণই নির্ধারণ করবে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।

ক্ষমতা ধরে রাখতে যুদ্ধের আশঙ্কা?
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কাও আলোচনায় এসেছে। উদ্বেগ রয়েছে, ক্ষমতা ধরে রাখার স্বার্থে নেতানিয়াহু ইরান কিংবা প্রতিবেশী কোনো দেশের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াতে পারেন, অথবা চলমান সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই; বিষয়টি আপাতত আশঙ্কা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের পর্যায়ে রয়েছে।

সংঘাত বাড়লে সরকার গঠনের আলোচনা প্রভাবিত হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের দাবিও জোরালো হতে পারে। এমন সরকার গঠিত হলে নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, যদিও এর জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি প্রয়োজন হবে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চান, ইসরায়েলে দ্রুত একটি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য সরকার গঠিত হোক বলে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সম্ভাব্য সরকারের কাঠামো কেমন হবে, তা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও মতভেদ রয়েছে বলে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে, নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও এখনই ক্ষমতা ছাড়তে হচ্ছে না নেতানিয়াহুকে। বিরোধী দলগুলোর পারস্পরিক দূরত্ব, আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা এবং জোট গঠনের দর-কষাকষিই ঠিক করবে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে। সমঝোতা ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনের পথও খুলে যেতে পারে। তত দিন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকার সুযোগ থাকছে নেতানিয়াহুর।

কালের আলো/এমডিএইচ/জেএন

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন