প্রবৃদ্ধি আছে, স্বস্তি নেই—মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক চাপে ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক , কালের আলো
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:০৬ অপরাহ্ণ

অর্থনীতির সূচকে ইতিবাচক বার্তা, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন এমন এক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটের মুখে, যেখানে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও ভোটারদের অভিজ্ঞতার মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান। কর্মসংস্থান ও শেয়ারবাজারের চিত্র আশাব্যঞ্জক হলেও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, জ্বালানি ব্যয় এবং সংসারের বাড়তি খরচ নিয়ে অসন্তোষ কাটছে না মার্কিন নাগরিকদের।

মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এই ব্যবধান ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি সামাল দিতে না পারায় সেই প্রতিশ্রুতি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।

অর্থনীতির সামগ্রিক সূচক ভালো থাকলেই যে সাধারণ মানুষ সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট থাকবেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি যেন সেই ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

সূচকে ইতিবাচক চিত্র, মানুষের মনে অসন্তোষ
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি একেবারে খারাপ নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। শেয়ারবাজারও রয়েছে প্রায় রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি।

ট্রাম্প প্রশাসন এসব সূচককে নিজেদের নীতির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। প্রেসিডেন্টের দাবি, জো বাইডেনের কাছ থেকে তিনি দুর্বল অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন। তাঁর প্রশাসনের নীতির কারণে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

তবে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির সাফল্যের হিসাব ভিন্ন। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কত, গাড়িতে জ্বালানি ভরতে কত খরচ হচ্ছে কিংবা মাস শেষে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য বিল পরিশোধের পর হাতে কত টাকা থাকছে—এসব বিষয়ই তাদের সন্তুষ্টি নির্ধারণ করছে। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতি এগোলেও সেই অগ্রগতির সুফল পরিবারগুলোর দৈনন্দিন ব্যয়ে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

দাম বাড়ছে, মজুরি পিছিয়ে
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সংকটের অন্যতম কারণ আয় ও ব্যয়ের মধ্যকার ব্যবধান। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছে ৩ শতাংশ। অন্যদিকে পণ্যের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এর অর্থ, গড় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যবৃদ্ধির হারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে আয় বাড়লেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

এখানেই মূল্যস্ফীতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যা এবং সাধারণ মানুষের উপলব্ধির পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়; বরং দাম আগের তুলনায় ধীরগতিতে বাড়তে পারে। কিন্তু যেসব পরিবারকে প্রতিদিন বেশি দামে খাবার, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হচ্ছে, তাদের কাছে এই পার্থক্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়।

ডেমোক্র্যাটদের প্রবীণ জরিপকারী সেলিন্ডা লেকের মতে, অর্থনীতিবিদ ও ভোটাররা মূল্যস্ফীতির বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখেন। অর্থনীতিবিদদের কাছে মূল্যবৃদ্ধির গতি কমা ইতিবাচক সংকেত হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক সময় থাকে, দাম কমে আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের এই দূরত্বই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

শুল্কনীতি ও ইরান সংঘাত বাড়াচ্ছে চাপ
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের নিজস্ব নীতিরও ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন কয়েকজন অর্থনীতিবিদ। বিশেষ করে আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতি আমদানি পণ্যের ব্যয় বাড়ানোর বিতর্ক তৈরি করে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের এক গবেষণা অনুযায়ী, এসব শুল্কের কারণে ভোক্তা পণ্যের দাম প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।

পরবর্তী সময়ে কিছু শুল্ক স্থগিত করা, নতুন বাণিজ্য চুক্তি এবং শুল্ক আরোপে জরুরি ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বাধার কারণে সম্ভাব্য প্রভাব কিছুটা সীমিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার চাপ পড়ে পেট্রলের দামে। আর যুক্তরাষ্ট্রের বহু পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে গাড়ি ও জ্বালানির খরচ সরাসরি জড়িত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়া মানে শুধু গাড়ি চালানোর ব্যয় বৃদ্ধি নয়; পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের খরচের মাধ্যমেও তা বৃহত্তর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ পিটার মরিসি শুল্কনীতি ও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে মূল্যস্ফীতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব সাধারণ মানুষের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না।

বাইডেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন ট্রাম্প?
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০২৪ সালে জো বাইডেনের প্রশাসনের অভিজ্ঞতার মিল রয়েছে। তখনও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কয়েকটি সূচক শক্তিশালী থাকলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে জনঅসন্তোষ বাইডেন প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠেছিল।

তবে দুই প্রশাসনের পরিস্থিতিতে পার্থক্য রয়েছে। বাইডেনের সময় করোনা মহামারির পর সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নসহ বৈশ্বিক নানা কারণ মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করেছিল। অন্যদিকে ট্রাম্পের সময় শুল্কনীতি ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন উঠছে।

ট্রাম্পের সহযোগী ও অর্থনৈতিক ভাষ্যকার ল্যারি কুডলো শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের পরিস্থিতিকে প্রশাসনের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু এসব অর্জন সাধারণ মানুষের ব্যয়ের চাপ কমাতে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত ভোটারদের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ অর্থনীতির সামগ্রিক অগ্রগতির দাবি রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট হবে কি না, তা নির্ভর করছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফেরানোর ওপর।

ভোটারদের মন জয়ে নতুন উদ্যোগ
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ কমাতে হোয়াইট হাউস কর হ্রাস, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রেসক্রিপশনের ওষুধের ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপকে সামনে আনছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারে সীমা আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন।

এ ছাড়া রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকদের পাঁচ হাজার ডলার দেওয়ার একটি ধারণাও আলোচনায় এসেছে। তবে এ ধরনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে কি না, তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট নীতির ওপর নির্ভর করবে।

এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু অর্থনৈতিক চাপ কমানো নয়, ভোটারদের কাছে প্রশাসনের কার্যকারিতার বার্তা পৌঁছে দেওয়াও। কারণ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়লে প্রবৃদ্ধি বা শেয়ারবাজারের সাফল্যের যুক্তি অনেক সময় যথেষ্ট হয় না।

শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হবে মানুষের অভিজ্ঞতা
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির ইতিবাচক পরিসংখ্যানকে মানুষের বাস্তব জীবনের স্বস্তিতে রূপান্তর করা। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ভালো চিত্র প্রশাসনের পক্ষে যুক্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় ও ঋণের খরচ নিয়ে অসন্তোষ থাকলে সেই যুক্তির প্রভাব সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

বাইডেন প্রশাসন অর্থনৈতিক সূচক ও জনমতের মধ্যকার ব্যবধান দূর করতে পারেনি—এমন মূল্যায়ন থেকে ট্রাম্পও পুরোপুরি মুক্ত নন। বরং নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রশ্নে তাঁর ওপর প্রত্যাশার চাপ আরও বেশি।

শেষ পর্যন্ত ভোটাররা শুধু অর্থনীতি কতটা বড় হচ্ছে, তা দেখবেন না; বরং সেই অর্থনৈতিক অগ্রগতি তাদের নিজেদের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনছে, সেটিও বিবেচনা করবেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন