ছয় মাসে পুলিশের ওপর ৩১৭ হামলা, মব নিয়ন্ত্রণে নিরপেক্ষ আইনি পদক্ষেপের তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৬:২০ অপরাহ্ণ

দেশে পুলিশের ওপর হামলা, দায়িত্ব পালনে বাধা এবং মব তৈরি করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আক্রান্ত করার ঘটনা মোকাবিলায় নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। দায়িত্ব পালনের সময় বডি ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশনার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের মনোবল, পেশাগত দক্ষতা ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও মোটিভেশন কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সারা দেশে পুলিশের ওপর ৩১৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পুলিশ বলছে, হামলা ও দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ছয় মাসে ৩১৭ হামলা

পুলিশ সদর দপ্তরের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে পুলিশের ওপর ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটে। ফেব্রুয়ারিতেও ৪২টি হামলা নথিভুক্ত হয়। মার্চে ৬৩টি, এপ্রিলে ৬৬টি, মে মাসে ৫৫টি এবং জুনে ৪৯টি হামলার ঘটনা ঘটে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগে এ ধরনের হামলা মূলত ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান বা দুর্গম এলাকায় বেশি দেখা গেলেও এখন দিনের বেলায় জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও ঘটছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুজব ছড়িয়ে জনতাকে সংগঠিত করে হামলা চালানো হচ্ছে। এতে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সরকারি যানবাহন ও স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

গুজব ও উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে হামলা

গত ২৪ অক্টোবর গোপালগঞ্জের রঘুনাথ ইউনিয়নের পুরোনো ফেরিঘাট এলাকার সেতুসংলগ্ন বাজারে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি মিছিল চলাকালে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। চার সদস্যের একটি টহল দল সেখানে থামলে মিছিলের অংশগ্রহণকারীরা পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করেন এবং সদস্যদের মারধর করেন। এতে এসআই ফুল মিয়া ও কনস্টেবল মাহবুবুর রহমান আহত হন।

এর আগে ১ এপ্রিল যশোরের কেশবপুরের হিজলডাঙ্গা গ্রামে এক দণ্ডিত আসামিকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশি নির্যাতনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে—এমন ঘোষণা মসজিদের মাইকে প্রচার করা হয়। এরপর স্থানীয় ৫০ থেকে ৬০ জন বাসিন্দা জড়ো হয়ে পুলিশ সদস্যদের মারধর করেন এবং আসামিকে ছিনিয়ে নেন। এতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হন।

৯ জুলাই বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় এক আটক ব্যক্তির পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে—এমন গুজব ছড়িয়ে হামলা চালানো হয়। শত শত মানুষ থানার সামনে জড়ো হয়ে পুলিশ সদস্যদের মারধর ও থানা ভাঙচুর করেন। সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন আহত হন, যাঁদের মধ্যে ছয়জন পুলিশ সদস্য। পরে হামলায় জড়িত ৬০ জনকে শনাক্ত করা হয় এবং ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে সরকারি জমি উদ্ধার ও ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান ঘিরেও। ২০ মে ঢাকার পল্লবীর বাউনিয়া বাঁধ বস্তিতে সরকারি জমি উদ্ধারের সময় পুলিশ, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে অন্তত ছয় থেকে সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হন।

৩০ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১০ এলাকায় ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করার অভিযানের সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একদল হকার পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ সময় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার ট্রাকে আগুন দেওয়া হয়। একটি পুলিশ গাড়ি ও একটি এক্সকাভেটর ভাঙচুর করা হয়। ঘটনায় আট থেকে নয়জন পুলিশ সদস্য আহত হন।

প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনাও রয়েছে

পুলিশের ওপর হামলার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনরত সদস্যদের গুরুতর আহত ও নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ৫ সেপ্টেম্বর সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী মদিনা হাউজিংয়ে একটি বিরোধ থামাতে গিয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার উপপরিদর্শক আলতাফ হোসেন ও তাঁর ছেলে আরিফুল ইসলাম হামলার শিকার হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর আলতাফ হোসেনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর ছেলে গুরুতর আহত হন।

এ ছাড়া জুলাইয়ে পাবনার সুজানগর, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, ঢাকার মোহাম্মদপুর ও জুরাইন এবং চট্টগ্রামের আমবাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা, সদস্যদের আহত করা ও আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।

এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ৬৩টি মব-সংশ্লিষ্ট ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও ৬৫ জন আহত হয়েছেন।

বডি ক্যামেরা ও প্রশিক্ষণে গুরুত্ব

পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, আইনানুগ দায়িত্ব পালনে বাধা এবং মব সহিংসতার ঘটনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া, মামলার তদন্ত ও তদারকি জোরদার করতে মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বডি ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপরাধ দমনে জনগণের সহযোগিতা বাড়াতে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া বিভাগের এআইজি কামারুন মুনিরা  বলেন, পুলিশ সদস্যদের মনোবল, পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও কর্মদক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি জানান, এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে মোটিভেশনাল ও ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ, কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ, জনসচেতনতামূলক সভা, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতি দেওয়া। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ, মানসিক সুস্থতা, উন্নত কর্মপরিবেশ ও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মব নিয়ন্ত্রণে নিরপেক্ষ বিচার জরুরি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে শুধু বক্তব্য বা মৌখিক সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়; কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি  বলেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ন্যায়বিচার না পেলে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে। একপর্যায়ে কেউ কেউ নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার পথ বেছে নেন। তবে ন্যায়বিচার না পাওয়ার ক্ষোভ কখনোই মব সৃষ্টি বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বৈধতা দিতে পারে না।

তাঁর মতে, মব তৈরির পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট থাকলেও অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পুলিশকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

ড. তৌহিদুল হক বলেন, যারা মব তৈরি করে, হামলায় অংশ নেয় কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, নিরপেক্ষভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব কিংবা ক্ষমতা অপরাধীদের সুরক্ষা দিতে না পারে।

তিনি আরও বলেন, মব নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ন্যায়বিচারের কার্যকর পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। জনগণের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন