গণপূর্তে বদলি-পদায়ন: লটারির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৭:০৪ অপরাহ্ণ

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেও এ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। কর্মকর্তাদের গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন, লটারির আগেই কর্মস্থল নির্ধারণ, জ্যেষ্ঠতা ও অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে পছন্দের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পদায়ন ঘিরে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।

গ্রেডিং শিট পরিবর্তনের অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দাবি, নির্বাহী প্রকৌশলীদের এ-প্লাস, এ, বি, সি ও ডি—এই পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে পদায়নের ব্যবস্থা করা হলেও ক্যাটাগরি নির্ধারণের লিখিত মানদণ্ড ও মূল্যায়নপদ্ধতি স্পষ্ট নয়। কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সততা ও বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

একাধিক বাক্সে আলাদাভাবে কর্মকর্তাদের নাম রেখে লটারি প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, ক্যাটাগরি নির্ধারণের ভিত্তি ও লটারির নিয়ম প্রকাশ করা হলে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাই করা সহজ হবে।

গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকার চার-পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মবিভাগে কোন কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হবে, তা লটারির আগেই নির্ধারণ করা হয়েছিল। গ্রেডিং শিটে পরিবর্তন এনে কয়েকজনকে গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে পদায়নের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে আ ন ম মাজহারুল ইসলাম, মো. জিয়াউর রহমান, আহসান হাবীব, রেজা তাইমুর মালিক, মাসুম বিল্লাহ ও রাশেদ আহসানসহ কয়েকজনের পদায়ন প্রক্রিয়া তদন্তের দাবি উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মাজহারুল ইসলাম ও জিয়াউর রহমানের ক্যাটাগরি নির্ধারণ এবং ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সংসদ ভবন, এমপি হোস্টেল, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সদর দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পদায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, প্রশাসনিক অনুমোদন ও নিরাপত্তা যাচাই যথাযথভাবে হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

কয়েকজন কর্মকর্তার পদায়ন ঘিরে অভিযোগ

সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহর ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এ পদায়ন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া রেজা তাইমুর মালিক, রাশেদ আহসান ও রাজিবুল ইসলামসহ কয়েকজনের কর্মস্থল পরিবর্তন এবং দায়িত্ব বণ্টনের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।

একই পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে কারও নাম লটারিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও কারও নাম বাদ পড়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কেন এমন হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

দেড় হাজার প্রকৌশলীর বদলি

অভিযোগ অনুযায়ী, অল্প সময়ের ব্যবধানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলী (ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল), ২০০ জন সহকারী প্রকৌশলী, ২১৯ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এবং ১২০ জন নির্বাহী প্রকৌশলীসহ প্রায় দেড় হাজার প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়েছে।

এত বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তার বদলি ও পদায়নে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের মতে, লটারিতে অংশগ্রহণের যোগ্যতা, নাম অন্তর্ভুক্তি, ক্যাটাগরি নির্ধারণ ও পদায়নের ফলাফল যাচাই করা প্রয়োজন।

১২০ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ

পদায়ন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের পাশাপাশি কথিত একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রায় ১২০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অভিযোগ যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী, সম্পদ কেনার অর্থের উৎস এবং নিকটাত্মীয়দের নামে অর্জিত সম্পদের তথ্য পরীক্ষা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তবে আর্থিক লেনদেন ও অনিয়মসংক্রান্ত এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

লটারি পদ্ধতির পক্ষে মন্ত্রীর বক্তব্য

এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের জানিয়েছিলেন, নির্বাহী প্রকৌশলীদের লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন করা হচ্ছে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে বদলি বাণিজ্য বন্ধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মকর্তাদের উপযুক্ত কর্মস্থলে পদায়নের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রী বলেন, গত ৩০ জুলাই ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে, আগস্টে ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে এবং ১৬ আগস্ট ২১৯ জন সহকারী প্রকৌশলী ও ১৯০ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, তখন পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৪৩০ জনকে এ পদ্ধতিতে বদলি-পদায়ন করা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, বদলি বাণিজ্য বন্ধ করা, সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়াই তাঁদের লক্ষ্য। যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত স্থানে পদায়নের পাশাপাশি গণপূর্ত বিভাগকে স্বচ্ছ, গতিশীল ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চায় সরকার। রূপপুর প্রকল্প ঘিরে গণপূর্ত বিভাগের যে বদনাম হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার কথাও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির বাসভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের পদায়নে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করলে তা উদ্বেগের বিষয়। তাই গ্রেডিং শিট, লটারির নথি, কর্মকর্তাদের তালিকা, পদায়নের অনুমোদন এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন