পে-স্কেলে জট

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশের সময়: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ । ৮:১৬ অপরাহ্ণ

নতুন বেতনকাঠামো ঘিরে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা ছিল বেতন বাড়বে, বৈষম্য কমবে, আর্থিক নিরাপত্তা আরও জোরালো হবে। কিন্তু বাস্তবায়নের শুরুতেই দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। কোথাও গ্রেডের ক্রমে অসংগতি, কোথাও পদোন্নতির পর বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়ে জটিলতা, আবার কোথাও উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণে তৈরি হয়েছে নতুন বৈষম্যের আশঙ্কা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি বেতন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আইবাস-এর জটিলতা। ফলে নতুন কাঠামোয় বেতন পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনিশ্চয়তা কাটছে না।

  • বেতন নির্ধারণ শেষ হয়নি সবার; বাড়ছে ভোগান্তি
  • অনেকে আপাতত পুরোনো কাঠামোয়ই বেতন পাবেন
  • গ্রেড, পদোন্নতি ও উচ্চতর বেতনের হিসাবে অসংগতি; সমাধান চান চাকরিজীবীরা

আগামী রোববার বকেয়াসহ বর্ধিত বেতন পাওয়ার কথা থাকলেও সবার জন্য সেই সুবিধা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। যাঁদের নতুন বেতন নির্ধারণ নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে না, তাঁদের আপাতত পুরোনো কাঠামোয় বেতন দেওয়া হবে। অর্থাৎ, নতুন বেতনকাঠামো কার্যকরের সময়েই একদল চাকরিজীবী বাড়তি অর্থ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকবেন, অন্যদের অপেক্ষা করতে হবে হিসাবের জট খুলতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, আট লাখ পেনশনভোগী এবং ছয় লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন ও সংশ্লিষ্ট হিসাবের কাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। এত বিপুলসংখ্যক সুবিধাভোগীর হিসাব নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যেই গ্রেড, পদোন্নতি, উচ্চতর গ্রেড ও ভাতার নিয়ম নিয়ে অসংগতি দূর করার দাবি জোরালো হচ্ছে।

গ্রেডে পিছিয়ে, বেতনে এগিয়ে জুনিয়র
নতুন বেতন নির্ধারণে গ্রেডের ক্রম অনুযায়ী অসংগতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা, আর ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অথচ নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন দাঁড়াচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা, আর ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। এমন হিসাব কীভাবে তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। গ্রেডের অবস্থান অনুযায়ী বেতনের সামঞ্জস্য নিশ্চিত না হলে একই ধরনের চাকরিতে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে। তবে এই অসংগতি কতটা বিস্তৃত এবং কোন নিয়মের প্রয়োগে তা তৈরি হচ্ছে, তা যাচাই করে সংশোধন করা জরুরি।

পদোন্নতি পেলেই কি কমবে আয়?
নতুন কাঠামোর আরেকটি উদ্বেগ বাড়িভাড়া ভাতা। কর্মচারীদের হিসাব অনুযায়ী, দশম গ্রেড থেকে নবম গ্রেডে পদোন্নতির পর কারও মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫১ হাজার টাকা হতে পারে। কিন্তু বাড়িভাড়া ভাতার হার ৫০ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশে নেমে এলে এ খাতে অর্থ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বাড়িভাড়া ভাতা কমতে পারে ১ হাজার ৯০০ টাকা। ফলে মূল বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা বাড়লেও মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতা মিলিয়ে মাসিক আয় ৬০০ টাকা কমে যেতে পারে।

উচ্চতর গ্রেডেও বৈষম্যের শঙ্কা
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময়সীমা নিয়েও আপত্তি রয়েছে। কর্মচারীদের আশঙ্কা, চাকরির মেয়াদ ও জ্যেষ্ঠতার পার্থক্য যথাযথভাবে বিবেচনা না করা হলে জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মচারীর বেতন একই পর্যায়ে চলে আসতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মচারীর বেতন জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর বেতনকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের দাবি, উচ্চতর গ্রেডের শর্ত, চাকরির মেয়াদ গণনা এবং পদোন্নতির প্রভাব সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। অন্যথায় পুরোনো অসংগতি দূর করতে গিয়ে নতুন বেতনবৈষম্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

আইবাস-এ আটকে বেতন নির্ধারণ
গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারির পর ৫ অক্টোবর থেকে আইবাস ব্যবস্থায় বেতন নির্ধারণ শুরু হয়। কিন্তু নতুন নিয়ম প্রয়োগে জটিলতা ও অভিজ্ঞ জনবলের ঘাটতির কারণে অনেকের হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব সমস্যা সমাধানে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার পর্যন্ত এসব আবেদনের নিষ্পত্তি হয়নি। কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জটিলতা ১ নভেম্বরের আগে সমাধান করা কঠিন হতে পারে বলেও জানা গেছে।

অর্থ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ চলছে এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। তবে সমাধানের উদ্যোগ চললেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সবার বেতন হিসাব শেষ হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

প্রথম ধাপে মিলবে আংশিক সুবিধা
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ এবং প্রথম থেকে নবম গ্রেডের কর্মকর্তারা ৪০ শতাংশ পাওয়ার কথা রয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে এই সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

কিন্তু বেতন নির্ধারণের জটিলতা দূর না হলে ঘোষিত সুবিধা বাস্তবে পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। পুরোনো কাঠামোয় সাময়িকভাবে বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও নতুন কাঠামোর পাওনা কীভাবে ও কখন সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা চাকরিজীবীদের উদ্বেগ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।

কালের আলো/আরআই/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন