ধান, পাট ও গম চাষ করে আশানুরূপ লাভ না পাওয়ায় বিকল্প ফসলের সন্ধানে নেমেছিলেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার পাতিবিলা গ্রামের কৃষক আক্তার হোসেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারোমাসি শজনে চাষের সম্ভাবনা দেখে এক বিঘা জমিতে শুরু করেন ওডিসি-৩ জাতের শজনে চাষ। এখন সেই জমির গাছ থেকে শজনে বিক্রি করে আয় করছেন তিনি। ফলন ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে বছরে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখছেন এই কৃষক। আক্তার হোসেনের দাবি, শজনে বিক্রি করে ইতিমধ্যে প্রায় ৪০ হাজার টাকা আয় করেছেন। প্রাথমিক বিনিয়োগের অর্থও উঠে এসেছে। গাছে নতুন করে ফল আসতে শুরু করায় আগামী মৌসুমে আরও বেশি আয়ের প্রত্যাশা করছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখে শজনে চাষে আগ্রহ
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে যশোর জেলা হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত ওডিসি-৩ জাতের ৩০০টি চারা সংগ্রহ করেন আক্তার হোসেন। জমি তৈরি, চারা কেনা, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ তাঁর প্রাথমিক খরচ হয় প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। চারা রোপণের কয়েক মাসের মধ্যেই গাছে ফল আসতে শুরু করে। এরপর থেকে শজনে বিক্রি করে আয় করছেন তিনি। আক্তার জানান, গত ৯ থেকে ১০ মাসে প্রায় ৪০ হাজার টাকার শজনে বিক্রি করেছেন। চলতি মৌসুমে তিন থেকে চার লাখ টাকা আয়ের সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। ফলন ভালো হলে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে গাছের ক্ষতি না হলে আয় পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
একই গাছে বছরের বিভিন্ন সময়ে ফলন
আক্তারের জমিতে গিয়ে দেখা যায়, গাছের ডালে ডালে থোকায় থোকায় ঝুলছে লম্বা সবুজ শজনে। কৃষকের ভাষ্য, দেশি শজনে সাধারণত নির্দিষ্ট মৌসুমে ফল দিলেও ওডিসি-৩ জাতের গাছে বছরের বিভিন্ন সময়ে ফুল ও ফল আসে।
তিনি জানান, রোপণের পাঁচ থেকে সাত মাসের মধ্যে এ জাতের গাছে ফলন শুরু হতে পারে। একটি গাছ থেকে পাঁচ থেকে ছয় বছর পর্যন্ত শজনে পাওয়া সম্ভব। বর্তমানে তাঁর জমির সুস্থ গাছগুলোতে ৮ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত শজনে ধরছে বলে দাবি করেন তিনি। আক্তারের হিসাব অনুযায়ী, বছরে তিন থেকে চার দফা ফলন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে প্রচলিত মৌসুমি ফসলের পাশাপাশি বারোমাসি শজনে চাষ কৃষকদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
কেজিপ্রতি শজনে বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়
বর্তমানে আক্তারের উৎপাদিত শজনে প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চৌগাছা বাজারের সবজি বিক্রেতা জামাল হোসেন জানান, পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি শজনের দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। খুচরা বাজারে তা ১৮০ টাকা পর্যন্ত উঠছে। লম্বা আকার ও সতেজতার কারণে ক্রেতাদের কাছে এ শজনের চাহিদা রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে বাজারদর ও চাহিদা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই প্রত্যাশিত আয় নির্ভর করবে উৎপাদন, বিক্রির পরিমাণ এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর।
আক্তারের সাফল্যে অন্য কৃষকদের আগ্রহ
এক বিঘা জমিতে বারোমাসি শজনে চাষ করে আক্তারের আয় করার অভিজ্ঞতা দেখে এলাকার অন্য কৃষকেরাও এ জাতের চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তাঁদের একজন হোসেন মাহমুদ। তিনি জানান, আক্তারের জমিতে শজনে চাষ দেখে উৎসাহিত হয়েছেন। আগামী মৌসুমে হর্টিকালচার সেন্টার থেকে চারা সংগ্রহ করে তিনিও চাষ শুরু করতে চান। তাঁর মতে, প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি বিকল্প ফসল হিসেবে শজনে চাষের সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। তবে চাষ শুরুর আগে উৎপাদন খরচ, জমির উপযোগিতা ও বাজারের চাহিদা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া প্রয়োজন।
ওডিসি-৩ জাতের চাষে প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা
চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসাব্বির হোসাইন বলেন, ওডিসি-৩ একটি সম্ভাবনাময় উচ্চফলনশীল জাত। রোগ প্রতিরোধ এবং খরা সহ্য করার সক্ষমতার কারণে যশোরের আবহাওয়ায় এটি চাষের সুযোগ রয়েছে। কৃষকদের এ জাতের শজনে চাষে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
যশোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ দীপংকর দাস জানান, টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে ওডিসি-৩ জাতের মানসম্মত চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। রোপণের পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে ফলন শুরু হতে পারে। বাণিজ্যিক চাষের পাশাপাশি বসতবাড়িতেও এ জাতের শজনে চাষ করা সম্ভব। তিনি জানান, গত বছর হর্টিকালচার সেন্টারে প্রায় সাত হাজার চারা উৎপাদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছয় হাজার চারা কৃষকেরা সংগ্রহ করেন। চলতি বছর ১০ হাজার চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
শজনে পাতা থেকেও আয়ের সুযোগ
শজনে শুধু সবজি হিসেবেই নয়, পুষ্টিগুণের জন্যও পরিচিত। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. তানভীর ইসলাম জানান, শজনে ও শজনে পাতায় ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। তিনি বলেন, শজনে পাতাকে কেন্দ্র করেও বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাতা শুকিয়ে গুঁড়া করে বাজারজাত করা যায়। আবার অন্যান্য শাকের মতো আঁটি করেও বিক্রি করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে পণ্যের মান বজায় রাখা, সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কৃষকের আয় বাড়াতে নতুন সম্ভাবনা
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক প্রতাপ মন্ডল জানান, ওডিসি-৩ জাতের শজনে সারা বছর ফুল ও ফল দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সরকারি সহায়তা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানির উপযোগী বাজার গড়ে তোলা গেলে এ ফসল দেশের পুষ্টিচাহিদা পূরণের পাশাপাশি কৃষকদের আয়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। আক্তার হোসেনের এক বিঘা জমিতে শজনে চাষের অভিজ্ঞতা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে প্রত্যাশিত লাভ নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিচর্যা, ফলন ধরে রাখা, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণের কার্যকর ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি