ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে দুর্ঘটনা কমানো ও ট্রাফিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহনের গতিসীমা পর্যবেক্ষণ এবং ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই এক্সপ্রেসওয়েতে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এআই ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালু করা গেলে চালকদের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে দুর্ঘটনা কমানো ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
চার বছরে প্রায় ৫৮৯ দুর্ঘটনা, নিহত ১৫২
মুন্সীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর ২০২২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে এলাকায় প্রায় ৫৮৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫২ জন। আহত হয়েছেন ৯৫০ জন। দুর্ঘটনার এই পরিসংখ্যান সড়কটিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। বিশেষ করে দ্রুতগতির যানবাহন চলাচল, ঝুঁকি নিয়ে অন্য গাড়িকে অতিক্রম করা এবং ট্রাফিক আইন না মানার মতো প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। মুন্সীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মুহাম্মদ সফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করা।
৫৫ কিলোমিটার সড়কে থাকবে নজরদারি
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের মোট দৈর্ঘ্য ৫৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেলার অংশ প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই সড়কে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। দ্রুতগতিতে যানবাহন চলাচলের সুযোগ থাকায় এ সড়কে নিরাপদ গতিসীমা বজায় রাখা এবং নিয়ম মেনে ওভারটেকিং করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চালকদের অসতর্কতা ও আইন অমান্য করার কারণে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এআই ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনার আওতায় পুরো এক্সপ্রেসওয়েকে নজরদারির মধ্যে আনার কথা বলা হয়েছে। তবে ক্যামেরা স্থাপনের নির্দিষ্ট সময়সূচি ও মোট ক্যামেরার সংখ্যা সম্পর্কে প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
আইন অমান্য করলে স্বয়ংক্রিয় মামলার পরিকল্পনা
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জে উন্নয়নকাজ পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের জানান, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েকে এআই ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণে আনার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে জাতীয় মহাসড়কগুলো এআই ক্যামেরার পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলা ও আঞ্চলিক মহাসড়কেও এআই ক্যামেরা স্থাপন করে সার্বক্ষণিক নজরদারির ব্যবস্থা করা হবে। সড়ক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করা এবং অন্যান্য ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়াও আরও কার্যকর করার লক্ষ্য রয়েছে।
গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব
পদ্মা সেতু উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোহাম্মদ আক্তার বলেন, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে অধিকাংশ দুর্ঘটনার কারণ বেপরোয়া গতি। পুরো এক্সপ্রেসওয়েকে এআই ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণে এনে অতিরিক্ত গতি, ওভারটেকিং এবং সড়ক আইন অমান্যকারীদের স্বয়ংক্রিয় মামলার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তাঁর মতে, এআই ক্যামেরার নজরদারি চালু হলে চালকেরা নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং থেকে বিরত থাকতে আরও সচেতন হবেন। এতে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি চালকদের সচেতনতা, নিয়মিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
সড়কে সাইন ও সিসি ক্যামেরা থাকলেও দুর্ঘটনা
সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মমিনুল ইসলাম জানান, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনের গতিসীমা নির্ধারণ করে সাইন ও মার্কিং দেওয়া আছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরাও রয়েছে। তবে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, আকস্মিক ইউটার্ন, চালকের অসতর্কতা এবং সড়ক আইন অমান্য করার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া ঘন কুয়াশাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে জানান তিনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপন করা হলে বিদ্যমান নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে দুর্ঘটনা কমাতে ক্যামেরার কার্যকারিতা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার প্রত্যাশা
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে রাজধানী ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ করিডর। এ সড়কে দুর্ঘটনা কমানো গেলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তা বাড়বে। একই সঙ্গে সড়কে শৃঙ্খলা বজায় থাকলে যান চলাচল আরও সুশৃঙ্খল হতে পারে। এআই ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অতিরিক্ত গতি ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে এর বাস্তব ফল নির্ভর করবে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, নিয়মিত তদারকি এবং আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতার ওপর।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি