দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপস’ উদ্যোগে স্পেনকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদে দেশটির পররাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব দিয়েগো মার্তিনেজ বেলিওর সঙ্গে বৈঠকে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৈঠকের বিষয়গুলো জানায়। এতে দুই দেশের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি অর্থনীতি, শ্রম অভিবাসন, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দক্ষ কর্মীদের বৈধ অভিবাসনে গুরুত্ব
বৈঠকে শামা ওবায়েদ ইসলাম স্পেনে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারে বাংলাদেশি কমিউনিটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছে। দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপস’ উদ্যোগে স্পেনের অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। এ উদ্যোগে স্পেন যুক্ত হলে দক্ষ কর্মীদের জন্য বৈধভাবে কাজের সুযোগ সম্প্রসারণে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শূন্য সহনশীলতার নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন মোকাবিলার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ
বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর বিষয়ে দুই পক্ষ আলোচনা করে। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ানো, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং যৌথ প্রদর্শনীর আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের পণ্যের জন্য নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি করা এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ জোরদার করার বিষয়েও মতবিনিময় হয়। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করতে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। বৈঠকে স্পেনের পক্ষ থেকেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও পর্যটনে সহযোগিতা
বৈঠকে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত সাংস্কৃতিক সহযোগিতা স্মারক বা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) দ্রুত চূড়ান্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। এ ছাড়া ক্রীড়াকূটনীতি, সৃজনশীল অর্থনীতি, শিল্পকলা ও পর্যটন খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন প্রতিনিধিরা। দেশব্যাপী ক্রীড়ার প্রসারে সরকারের গুরুত্ব তুলে ধরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক জোরদারে খেলাধুলা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁর মতে, ক্রীড়াকূটনীতি দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগ বৃদ্ধির একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সম্মতি
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে সম্মত দ্বিপক্ষীয় দলিলগুলো দ্রুত চূড়ান্ত করার বিষয়ে একমত হন প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে চলমান আলোচনা ও সমঝোতা স্মারক-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
যত দ্রুত সম্ভব দ্বিতীয় বাংলাদেশ-স্পেন পররাষ্ট্র দপ্তর পর্যায়ের পরামর্শ বৈঠক বা ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন’ আয়োজনের আগ্রহও প্রকাশ করা হয়। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করতে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের সফর ও যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন উভয় দেশের প্রতিনিধিরা। স্পেনের পররাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব দিয়েগো মার্তিনেজ বেলিও ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনাকে আশাব্যঞ্জক উল্লেখ করেন। এ প্রচেষ্টায় স্পেনের সমর্থনের আশ্বাসও দেন তিনি।
ট্রেন দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ
বৈঠকের শুরুতে স্পেনের টোলেডোতে ওই দিন ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন। বৈঠকে আলোচনার বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ও স্পেনের মধ্যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষ কর্মীদের বৈধ অভিবাসন, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি চূড়ান্ত করার অগ্রগতি ভবিষ্যৎ সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি