চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশের অসংখ্য মানুষ আর্থিক সংকটে পড়ছেন, এমনকি অনেককে দারিদ্র্যসীমার নিচেও নেমে যেতে হচ্ছে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম থাকায় সাধারণ মানুষের ওপর চিকিৎসার ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণ এবং রোগীর নিজস্ব পকেট থেকে ব্যয় কমানোর দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে শুধু বাজেট বাড়ালেই হবে না, বরাদ্দ করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার, ওষুধের সহজলভ্যতা এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর দাবি
কারওয়ানবাজারের ডেইলি স্টার ভবনে মঙ্গলবার (১১ জুন) সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন (সিএসও) ফোরাম ও ডেইলি স্টারের যৌথ আয়োজনে ‘পাবলিক হেলথ এক্সপেন্ডিচার: এ ক্রিটিক্যাল চ্যালেঞ্জ ইন এনশিউরিং হেলথ কেয়ার ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি সেবার পরিধি বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন। বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিএসও ফোরামের আহ্বায়ক ডা. সৈয়দ রুবায়েত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গ্লোবাল হেলথ এক্সপেন্ডিচার ডেটাবেজের তথ্য বিশ্লেষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার স্বাস্থ্যখাতে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয় করে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ব্যয় কম
ডা. সৈয়দ রুবায়েতের উপস্থাপনা অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে একজন মানুষের জন্য সরকার গড়ে ২৬ ডলার ব্যয় করেছে। একই সময়ে মিয়ানমারে জনপ্রতি সরকারি ব্যয় ছিল ৪৮ ডলার, পাকিস্তানে ৪৯ ডলার, নেপালে ৭৬ ডলার, ভারতে ৮১ ডলার এবং শ্রীলঙ্কায় ২৮৩ ডলার। মালদ্বীপে এ ব্যয় ছিল জনপ্রতি গড়ে ১ হাজার ৪৭৯ ডলার। তিনি বলেন, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয়ের আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে কম ব্যয়কারী দেশগুলোর মধ্যেও রয়েছে। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং রোগীর নিজস্ব ব্যয় কমিয়ে আনা কঠিন হবে।
চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৩ শতাংশ রোগীর নিজের পকেট থেকে
মূল প্রবন্ধে তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৭৩ শতাংশ রোগীদের নিজেদের বহন করতে হয়েছে। ২০০০ সালে এ হার ছিল ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ দুই দশকের বেশি সময়ে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে রোগীর নিজস্ব অর্থের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
ডা. সৈয়দ রুবায়েত বলেন, ২০৩২ সালের মধ্যে রোগীর নিজস্ব পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের হার ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ না থাকলে এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তিনি আরও জানান, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে দেশে প্রায় ৮৬ লাখ ১০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছেন বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মতে, রোগীর ওপর থেকে চিকিৎসার ব্যয়ের বোঝা কমাতে সরকারি অর্থায়ন বাড়ানো জরুরি।
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব
সরকারের নীতিনির্ধারকেরা নিজেরা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না নেওয়ায় স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। তাঁর মতে, জনপ্রতিনিধি ও নীতিনির্ধারকেরা দেশে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করলে চিকিৎসাব্যবস্থার উন্নয়নে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার চাপ তৈরি হতো। তিনি স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি ভিআইপিদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া বন্ধের দাবি জানান।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানোর আহ্বান
কেয়ার বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি কর্মসূচির পরিচালক ইখতিয়ার উদ্দিন খন্দকার বলেন, দেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো আরও উন্নত ও সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। রোগী ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পাশাপাশি সেবার পরিধি বাড়াতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান কাঠামোকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারলে মানুষ স্থানীয় পর্যায়েই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে পারবেন। এতে উন্নত চিকিৎসার জন্য দূরে যাতায়াত এবং ব্যক্তিগত অর্থে ব্যয় করার চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বরাদ্দের অর্থ ফেরত যাওয়া ও দুর্নীতি নিয়ে উদ্বেগ
প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল বলেন, স্বাস্থ্যখাতে রোগীর নিজস্ব ব্যয় কমাতে বাজেটের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁর দাবি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিবছর প্রায় আট হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে পারে না, ফলে ওই অর্থ ফেরত যায়। তিনি বলেন, একদিকে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কম, অন্যদিকে বরাদ্দ করা অর্থ পুরোপুরি ব্যবহার না হওয়া এবং দুর্নীতির অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এ কারণে বরাদ্দের অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।
সরকারি ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর প্রস্তাব
শিশির মোড়ল আরও বলেন, রোগীদের নিজস্ব ব্যয়ের বড় একটি অংশ ওষুধ কেনার পেছনে যায়। বিভিন্ন সময়ে ওষুধের দাম বাড়ায় চিকিৎসার মোট ব্যয়ও বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডিসিএল) আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁর মতে, প্রয়োজনীয় ওষুধের উৎপাদন বাড়িয়ে তা সরকারি হাসপাতালের মাধ্যমে বিনামূল্যে বা সহজলভ্য মূল্যে রোগীদের সরবরাহ করা গেলে ব্যক্তিগত ব্যয়ের চাপ কমতে পারে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসায় বিশেষ বরাদ্দের দাবি
হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আঞ্চলিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ইশরাত জাহান বলেন, দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ জটিল রোগে ভুগছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রায় ৪২ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জটিল রোগে আক্রান্ত এবং তাঁদের গড় আয়ু অন্যদের তুলনায় ১০ থেকে ২০ বছর কম।তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ বা পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা নেই। তাঁদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যবিমা চালুর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, জনসংখ্যার অনুপাতে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মোট বাজেটের প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। তবে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচ্য বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৫ দশমিক ২ শতাংশ। তিনি বলেন, সীমিত বরাদ্দের অর্থও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সংকুচিত হচ্ছে এবং রোগীদের নিজস্ব ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং ওষুধের সরবরাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
গোলটেবিল বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাইনুল ইসলাম, আইসিডিডিআরবির বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আহমেদ এহসানুর রহমান, নারী পক্ষের প্রকল্প পরিচালক সামিয়া আফরিন, ওজিএসবির সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ানসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ উইমেন্স হেলথ কোয়ালিশন, নারী মৈত্রী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ব্র্যাক, ব্লাস্ট, মেরী স্টোপস, আইপাস বাংলাদেশ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের প্রতিনিধিরাও বৈঠকে অংশ নেন। বক্তাদের বক্তব্যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান ও পরিধি বাড়ানো, বাজেটের অর্থের যথাযথ ব্যবহার, ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তাঁদের মতে, এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষের আর্থিক সংকটে পড়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি