নতুন জনবল, নতুন সক্ষমতা; পুলিশে ১৪ হাজার নিয়োগের উদ্যোগ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:২৭ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ পুলিশে জনবল বাড়াতে ১৪ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে উপপরিদর্শক (এসআই) পদে চার হাজার এবং কনস্টেবল পদে ১০ হাজার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় এ নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সরকারের লক্ষ্য, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।

এই উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এসআই পদে এবার চার হাজার সদস্যই সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে নেওয়া হবে। প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, এ পদের ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং বাকি ৫০ শতাংশ বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হতো। এবার সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এ জন্য সংশোধন করা হয়েছে পুলিশ প্রবিধান (পিআরবি)।

  • চার হাজার এসআই সরাসরি, ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের পরিকল্পনা
  • আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে নতুন পদ সৃষ্টি
  • মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম জোরদারে নজর, ডিসেম্বরের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষের লক্ষ্য

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এসআই পদে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হবে। এ ছাড়া কনস্টেবল পদে ১০ হাজার নতুন নিয়োগ হবে।’ তিনি জানান, অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে এসব পদ নতুন করে সৃষ্টি করা হয়েছে। সরাসরি নিয়োগের সুবিধার্থে পুলিশ প্রবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তবে এবারই একবারের জন্য এভাবে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। সরকার প্রয়োজন মনে করলে ভবিষ্যতেও সরাসরি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়ছে পুলিশের জনবল
পুলিশের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে জনবল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত, টহল, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সদস্য প্রয়োজন। এ বিবেচনায় চার হাজার এসআই ও ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগের উদ্যোগ পুলিশের কার্যক্রমে জনবল বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে।

কনস্টেবলরা মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা, টহল ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে এসআইরা অপরাধ তদন্ত, মামলা-সংক্রান্ত কার্যক্রম এবং আইন প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকেন। ফলে দুই পদে নতুন সদস্য যুক্ত হলে দায়িত্ব বণ্টন ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে নিয়োগের সুফল নিশ্চিত করতে নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পদায়নও গুরুত্বপূর্ণ। জনবল বৃদ্ধির পাশাপাশি পেশাদারত্ব ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়া গেলে নাগরিকদের পুলিশি সেবা আরও কার্যকর করার সুযোগ বাড়বে।

এসআই পদে সরাসরি নিয়োগে বিশেষ ব্যবস্থা
প্রচলিত পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী, এসআই পদের অর্ধেক সরাসরি নিয়োগ এবং বাকি অর্ধেক বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করার নিয়ম ছিল। এবার চার হাজার পদেই সরাসরি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ পরিবর্তন কার্যকর করতে পুলিশ প্রবিধান সংশোধন করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী, এবার একবারের জন্য এভাবে সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। তবে সরকার প্রয়োজন মনে করলে ভবিষ্যতেও সরাসরি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এই ব্যবস্থায় নতুন প্রার্থীদের জন্য এসআই পদে যোগ দেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীতে নতুন জনবল যুক্ত করে মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

এ ক্ষেত্রে বিভাগীয় পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা সদস্যদের পেশাগত অগ্রগতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির সুযোগ বজায় রাখা গেলে নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কর্মপ্রেরণাও ধরে রাখা সম্ভব হবে।

অনুমোদন শেষে নতুন পদে নিয়োগের প্রস্তুতি
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, নতুন জনবল নিয়োগের প্রস্তাবটি কয়েকটি প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করেছে। প্রথমে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। পরে সেটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ১৪ হাজার নতুন পদের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি বুধবার প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়। ১৪টি মন্ত্রণালয়ের সচিবদের নিয়ে গঠিত এ উচ্চপর্যায়ের কমিটি সরকারি দপ্তরে নতুন পদ সৃষ্টিসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রস্তাব পর্যালোচনা ও অনুমোদনের দায়িত্ব পালন করে। সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব অনুমোদিত হওয়ায় নিয়োগপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাছাই ও নিয়োগের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করাই হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগ শেষ করার লক্ষ্য
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা একটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ১৪ হাজার পদে নিয়োগ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আবেদন যাচাই, পরীক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং নিরাপত্তা যাচাইয়ের মতো বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব কার্যক্রম শেষ করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই-বাছাইয়ের পর চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হবে বলে তাঁরা জানিয়েছেন। স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে নিয়োগ সম্পন্ন করা গেলে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর প্রতি জনআস্থা জোরদার করারও সুযোগ তৈরি হবে।

এএসপি পদেও ৪০০ থেকে ৫০০ কর্মকর্তা নিয়োগের পরিকল্পনা
এসআই ও কনস্টেবল নিয়োগের পাশাপাশি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদেও নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, এ জন্য একটি বিশেষ বিসিএস পরীক্ষা নেওয়া হতে পারে, যা ৫২তম বিসিএস হতে পারে। এর মাধ্যমে ৪০০ থেকে ৫০০ জন এএসপি নিয়োগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

নিয়োগের পর তাঁদের মৌলিক প্রশিক্ষণের সময় কিছুটা কমিয়ে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে প্রশিক্ষণের সময় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হলে কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পেশাগত দক্ষতা, আইন সম্পর্কে জ্ঞান এবং দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

নিয়োগে যোগ্যতা ও যাচাই-বাছাইয়ে গুরুত্ব
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে কনস্টেবল, এসআই ও পুলিশ সার্জেন্ট পদে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার সদস্য নিয়োগ পেয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ওই সময়ে নিয়োগের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রভাবিত হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। মেধাভিত্তিক নির্বাচন, যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং কার্যকর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ সদস্য গড়ে তোলা গেলে বাহিনীর পেশাদারত্ব বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।

কালের আলো/ওয়াইএ/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন