বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সৌরির নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নতুন তথ্য জানিয়েছেন তার পরিচিত আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপ। তার দাবি, গত ২৭ অক্টোবর তাহসিফের সঙ্গে মোটরসাইকেল মেরামত থেকে শুরু করে রাতের খাবার খাওয়া পর্যন্ত একসঙ্গেই ছিলেন তিনি। পরে উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় দুজন আলাদা হয়ে যান। এরপর তাহসিফকে ফোন করলেও তার মোবাইল বন্ধ পান দ্বীপ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মোবাইল ফোনে এসব তথ্য জানান দ্বীপ। তিনি দাবি করেন, তাহসিফের সঙ্গে তার প্রায় ছয় বছরের পরিচয়। তাহসিফ তার কাছে কাছের বড় ভাইয়ের মতো ছিলেন।
মোটরসাইকেল মেরামত করতে একসঙ্গে বের হন
দ্বীপের ভাষ্য অনুযায়ী, তাহসিফের মোটরসাইকেলটি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এবং সেটি চালু হচ্ছিল না। এ বিষয়ে পরামর্শ চাইলে তিনি তাহসিফের বাসায় যান। সেখানে দুজনে প্রায় ১০ থেকে ২০ মিনিট চেষ্টা করে মোটরসাইকেলটি চালু করেন। পরে মোটরসাইকেলটি একটি ওয়ার্কশপে নিয়ে প্রয়োজনীয় মেরামত করানো হয় এবং তেল পরিবর্তন করা হয়। কাজ শেষে তাহসিফ তাকে রাতের খাবারের আমন্ত্রণ জানান।
রুআপ শপিং কমপ্লেক্সের রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার
দ্বীপ জানান, উত্তরার রুআপ শপিং কমপ্লেক্সের ‘কুকরুক্কু’ রেস্তোরাঁয় দুজনে একসঙ্গে রাতের খাবার খান। খাওয়ার সময় তাহসিফের আচরণে অস্বাভাবিক কিছু তার চোখে পড়েনি বলেও দাবি করেন তিনি। দ্বীপের ভাষ্য, রাতের খাবারের সময় তাহসিফের এক বন্ধু ফোন করেছিলেন বলে তার মনে আছে। তবে সেই সময় কথাবার্তা স্বাভাবিক ছিল বলে জানান তিনি।
হাউস বিল্ডিং এলাকায় আলাদা হন দুজন
রাতের খাবার শেষে দুজন আলাদা মোটরসাইকেলে করে রওনা দেন। দ্বীপের দাবি, উত্তরার হাউস বিল্ডিং এলাকায় এসে তিনি ইউটার্ন নিয়ে একদিকে চলে যান, আর তাহসিফ অন্যদিকে চলে যান। রাত ১২টার দিকে তাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা জানান তিনি। তাহসিফ কোথায় যাবেন, তা তাকে স্পষ্ট করে বলেননি বলে দাবি দ্বীপের। তার ভাষ্য, তাহসিফ বয়সে বড় হওয়ায় তিনি সাধারণত কোথায় যাচ্ছেন, তা সরাসরি জিজ্ঞাসা করতেন না।
ফোন বন্ধ পেয়ে প্রথমে অন্য ধারণা করেছিলেন
দ্বীপ জানান, বাসায় পৌঁছে তাহসিফকে ফোন করে নিজের পৌঁছানোর খবর দিতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তখন তাহসিফের মোবাইল ফোন বন্ধ পান। রেস্তোরাঁয় তাহসিফ তার পাওয়ার ব্যাংক দিয়ে ফোন চার্জ দিচ্ছিলেন। তাই চার্জ শেষ হয়ে ফোন বন্ধ হয়ে গেছে বলে ধারণা করেছিলেন দ্বীপ। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার ফোন করলেও একই অবস্থা দেখতে পান বলে জানান তিনি। তাহসিফের সঙ্গে শেষ দেখা হওয়ার সময় কোনো অস্বাভাবিক আচরণ চোখে পড়েনি বলেও দাবি করেন দ্বীপ।
নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কাউকে সন্দেহ করছেন না দ্বীপ
তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় কাউকে সন্দেহ করেন কি না, জানতে চাইলে দ্বীপ বলেন, এখন পর্যন্ত কাউকে সন্দেহ করার মতো অবকাশ তার নেই। তার দাবি, তাহসিফের সঙ্গে কথাবার্তা স্বাভাবিক ছিল এবং পরিচয়ের পর থেকে এমন কোনো কথোপকথন হয়নি, যা থেকে কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা যেত। দ্বীপ বলেন, ‘বাকি ১০ জন যেমন রহস্যের মধ্যে আছে, আমিও একদম একই রহস্যের মধ্যে আছি।’ তাহসিফের পরিবারের পক্ষ থেকে দ্বীপ তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে যে কথা বলা হয়েছে, সে প্রসঙ্গে দ্বীপ জানান, মোটরসাইকেল মেরামতের বিষয়েই মূলত তাদের দেখা হয়েছিল। পরে তারা একসঙ্গে রাতের খাবার খান।
নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের ব্যবসায়ও সম্পর্ক ছিল
দ্বীপ জানান, তাহসিফের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মী সরবরাহের ব্যবসা নিয়েও তার সম্পর্ক ছিল। এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে পরিচিতদের মধ্যে ব্যক্তিগত মনোমালিন্য থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে বিষয়টি তেমন বড় কিছু ছিল না বলে দাবি তার। তাহসিফের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তার পরিচয় ছিল বলে জানান দ্বীপ। তার ভাষ্য, তাহসিফ মাঝেমধ্যে তাকে বলতেন, তিনি না থাকলে যেন তার ছোট ভাইকে দেখে রাখেন। তবে কেন তাহসিফ এমন কথা বলতেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে চাননি দ্বীপ।
ভাইরাল ভিডিও নিয়ে তাহসিফের সঙ্গে আলোচনা হয়নি
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ নিয়ে তাহসিফের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে দ্বীপ বলেন, তিনি বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। এ নিয়ে তাহসিফের সঙ্গে তার কোনো আলোচনা হয়নি।
দ্বীপ আরও জানান, সম্প্রতি তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করেছেন। তাহসিফের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে মর্গ থেকে নেওয়ার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এরপর পরিবারের উদ্বেগের কথা বিবেচনা করে আর বাইরে বের হননি বলে জানান তিনি। তাহসিফের নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতের ঘটনাগুলো নিয়ে দ্বীপের বক্তব্য সামনে এলেও, তার নিখোঁজ হওয়ার পেছনে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে এই বক্তব্য থেকে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি