দুই বছরে বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত ৮ শিশু

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ । ৩:২১ অপরাহ্ণ

দেশে গত দুই বছরে এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছেন আটজন। উদ্বেগের বিষয়, আক্রান্তদের সবাই আট বছরের কম বয়সী শিশু। তাঁদের কয়েকজনের অসুস্থ পোলট্রির সংস্পর্শে আসার তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা। এমনকি অসুস্থ পাখির সঙ্গে খেলাধুলার মাধ্যমেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে উঠে এসেছে গবেষণায়। এর মধ্যে সম্প্রতি গৃহপালিত বিড়ালের শরীরেও এইচ৫এন১ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। পাখির পাশাপাশি অন্য প্রাণীর মধ্যেও ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) যৌথ আয়োজনে ‘অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভিল্যান্স অ্যান্ড রিসার্চ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে ছিল অসুস্থ পোলট্রির সংস্পর্শ
সেমিনারে জানানো হয়, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে দেশে এইচ৫এন১ বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত আটজন শনাক্ত হয়েছেন। আক্রান্ত শিশুদের কয়েকজনের অসুস্থ পোলট্রির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছিল। পোলট্রি ও মানুষের নমুনায় একই ধরনের ভাইরাসের স্ট্রেইন শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। গবেষকদের মতে, অসুস্থ পাখির সংস্পর্শে আসার বিষয়টি সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। বিশেষ করে শিশুদের পোলট্রি খামার, অসুস্থ পাখি এবং মৃত পাখির কাছাকাছি যাওয়া থেকে বিরত রাখার বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন।

শুধু শীতকালে নয়, বছরজুড়েই সংক্রমণের ঝুঁকি
গবেষকেরা জানান, দেশে বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা শুধু শীত মৌসুমে সীমাবদ্ধ নয়। এপ্রিল, মে ও আগস্ট মাসেও সংক্রমণের ঘটনা পাওয়া গেছে। ফলে নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমকে কেন্দ্র করে নয়, সারা বছর নজরদারি ও সতর্কতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

সেমিনারে উপস্থাপিত নজরদারির তথ্য অনুযায়ী, জীবন্ত পাখির বাজার থেকে সংগ্রহ করা মৃত পোলট্রির নমুনার ৬১ শতাংশে ইনফ্লুয়েঞ্জা এ ভাইরাস এবং ৪৯ শতাংশে এইচ৫ ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পোলট্রি খামার ও জীবন্ত পাখির বাজারে জীবাণুনিরাপত্তা জোরদার, অসুস্থ ও মৃত পাখি দ্রুত শনাক্ত এবং মৃত পাখির নিরাপদ অপসারণ নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিড়ালের শরীরে ভাইরাস শনাক্তে নতুন উদ্বেগ
গৃহপালিত বিড়ালের মধ্যে এইচ৫এন১ ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি সেমিনারে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনা ভাইরাসটি পাখির বাইরেও অন্য প্রাণী প্রজাতিতে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এনেছে। এ কারণে শুধু পোলট্রি নয়, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যেও সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ এবং নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত গবেষণা ও তথ্য আদান-প্রদানের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

নজরদারি ও গবেষণা জোরদারের আহ্বান
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান। তিনি অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা মোকাবিলায় নজরদারি ও গবেষণা আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আইসিডিডিআর,বির ওয়ান হেলথ রিসার্চ ইউনিটের বিজ্ঞানী ও টিম লিড ডা. সুকান্ত চৌধুরী পোলট্রি ও মানুষের মধ্যে অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির ইনফ্লুয়েঞ্জা রিজিওনাল প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ডা. মার্থা মন্টগোমারি বিশ্বব্যাপী বার্ড ফ্লুর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন।

আইসিডিডিআর,বির অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট ডা. মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সিডিআইএলের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ডা. মো. গোলাম আজম চৌধুরী গৃহপালিত বিড়ালের মধ্যে এইচ৫এন১ শনাক্তের বিষয়টি তুলে ধরেন।

‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতিতে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
প্যানেল আলোচনায় অধ্যাপক ডা. নীতিশ চন্দ্র দেবনাথ, ডা. এ এস এম আলমগীর এবং অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম ভাইরাসের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, দ্রুত সংক্রমণ শনাক্তকরণ, তথ্য বিনিময় এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রস্তুতি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসির ডা. মুহাম্মদ মনোয়ার মোরশেদ সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষজ্ঞরা বার্ড ফ্লু মোকাবিলায় ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন। এ পদ্ধতিতে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁদের মতে, নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত সংক্রমণ শনাক্তকরণ, তথ্য আদান-প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করা গেলে ভাইরাসের বিস্তার মোকাবিলা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা আরও কার্যকর হবে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন