বইয়ে রাজনৈতিক প্রতীক, বদলি ১৪ এনসিটিবি কর্মকর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ । ৪:০৭ অপরাহ্ণ

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে পরিচিত নৌকা ও দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহারের ঘটনায় বিতর্কের মুখে পড়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে দাঁড়িপাল্লার ছবি এবং প্রাথমিক স্তরের বিভিন্ন বইয়ে একাধিক নৌকার ছবি ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসার পর সংস্থাটিতে শুরু হয়েছে পর্যালোচনা। এ ঘটনায় দাঁড়িপাল্লার ছবি সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তাকে এবং নৌকার ছবি ব্যবহারের ঘটনায় ১৩ জনসহ মোট ১৪ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পাঠ্যবইয়ে এ ধরনের আরও কোনো অসংগতি রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখতে বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কমিটি দ্রুত বইগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ করবে।

যেভাবে শুরু হলো বিতর্ক
আগামী শিক্ষাবর্ষে বিতর্কমুক্ত পাঠ্যবই দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলার মধ্যেই ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের একটি ছবি নিয়ে প্রথম বিতর্ক তৈরি হয়। বইটির জ্ঞানের পিরামিডে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে মস্তিষ্কের পরিবর্তে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। দাঁড়িপাল্লা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রতীক হিসেবে পরিচিত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ঘটনাটি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ছাড়িয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়েও আলোচনার জন্ম দেয়। পরে ছবিটি সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা এনসিটিবির গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল যোবায়েরকে খাগড়াছড়িতে বদলি করা হয়। এরপরই প্রাথমিক স্তরের বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে নৌকার ছবি ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে পরিচিত নৌকার ছবি পাঠ্যবইয়ে এত বেশি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বই সম্পাদনা, ছবি নির্বাচন এবং তদারকির প্রক্রিয়া নিয়েও সমালোচনা শুরু হয়।

১২৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে নৌকার ছবি
এনসিটিবির হিসাব অনুযায়ী, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবইয়ে মোট ১২৮টি নৌকা বা নৌকার ছবি রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণিতে ৫২টি, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২৫টি, তৃতীয় শ্রেণিতে ২৫টি, চতুর্থ শ্রেণিতে ১৩টি এবং পঞ্চম শ্রেণিতে সাতটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণির ‘আমার বাংলা বই’-এ ৩৪টি, গণিত বইয়ে ১৪টি এবং ‘ইংলিশ ফর টুডে’ বইয়ে চারটি নৌকার ছবি রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ২০টি এবং ইংরেজি বইয়ে পাঁচটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ২০টি, গণিত বইয়ে একটি এবং ইংরেজি বইয়ে চারটি নৌকার ছবি রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাতটি ও ইংরেজি বইয়ে ছয়টি ছবি রয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে নৌকার ছবি রয়েছে সাতটি। এ ছাড়া দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি বইয়ে বর্ণ শেখানোর অংশে ‘বি ফর বোট’ লেখার সঙ্গে নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এনসিটিবির দাবি, এসব ছবি নতুন করে যুক্ত করা হয়নি। ২০২৫ ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বইয়েও ছবিগুলো ছিল। ইংরেজি বর্ণ শেখানোসহ পাঠ্যবস্তুর প্রয়োজনেই সেগুলো ব্যবহার করা হয়েছে বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ছাপা বই সংশোধনে বাড়তি খরচ দেবে না সরকার
ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের মোট ৩৯ লাখ কপির মধ্যে প্রায় ১৭ লাখ ছাপা হয়ে গেছে। ভুল শনাক্ত হওয়ার পর বাকি ১৮ লাখ কপি ছাপার কাজ স্থগিত করা হয়েছে। এনসিটিবি জানিয়েছে, ইতিমধ্যে ছাপা হওয়া বইগুলোর সংশোধনের জন্য সরকারের বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে না। সংশ্লিষ্ট ছাপাখানাগুলো নিজ নিজ খরচে ভুল থাকা পৃষ্ঠা বা ফর্মা নতুন করে ছাপাবে। এরপর বইগুলো পুনরায় বাঁধাই করে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হবে। বাকি বইয়ের মুদ্রণকাজও সংশোধিত পৃষ্ঠা যুক্ত করে শেষ করা হবে। এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠাটি সংশোধন করে নতুন করে ছাপানো হবে। এরপর বই পুনরায় বাঁধাই করে ছাপাখানাগুলোই মাঠপর্যায়ে পাঠাবে। এ কাজ তারা নিজেদের খরচে করে দেবে।

নৌকার ছবি নিয়ে বদলি ১৩ কর্মকর্তা
প্রাথমিক স্তরের বইয়ে নৌকার ছবি ব্যবহারের ঘটনায় ১৩ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরানো বা বদলি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রাথমিক উইংয়ের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হায়দারকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছেন প্রাথমিকের ঊর্ধ্বতন বিশেষজ্ঞ ড. সাফায়েত হোসেন এবং অধ্যাপক আব্দুল মুমিন মোছাব্বিরও।

এর আগে এনসিটিবিতে সাত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করা ড. মো. কামরুল হক ভূঁইয়াকেও বদলি করা হয়। তালিকায় আরও রয়েছেন হুমায়ুন কবির, আহসানুল আরেফিন চৌধুরী, ড. আবু হানিফ, রেজাউল করীম, মনির হোসেন মজুমদার, মাহমুদ বিন আমিন এবং আফসানা আইয়ুব দীপু। প্রতিবেদনে তাঁদের কয়েকজনের অতীতের পদায়ন বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার সূত্রের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতা এবং বদলির কারণের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মতো বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। উপসচিব সিরাজুল ইসলাম ও মাধ্যমিক শাখার গবেষণা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামানের বদলির সুনির্দিষ্ট কারণও জানা যায়নি।

আরও অসংগতি খুঁজতে বিশেষ কমিটি
পাঠ্যবইয়ে নৌকা ও দাঁড়িপাল্লার ছবি নিয়ে বিতর্কের পর অন্য বইগুলোতেও একই ধরনের অসংগতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি। এ জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কমিটি বইগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ করবে। এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, সব বইয়ে দাঁড়িপাল্লা বা নৌকার মতো বিষয় রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো বইয়ে অসংগতি পাওয়া গেলে তা সংশোধন করে স্কুলে পাঠানো হবে।

এনসিটিবির সূত্রগুলোর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর শেষে নতুন কারিকুলাম নিয়ে কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে পরিকল্পিতভাবে ভুল তৈরি করে সরকারকে বিব্রত করতে পারেন—এমন কর্মকর্তা রয়েছেন কি না, তা চিহ্নিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে পাঠ্যবইয়ের ভুল সংশোধন, পুনর্মুদ্রণ এবং বিতরণ নিশ্চিত করাই এখন এনসিটিবির সামনে বড় কাজ। বিশেষ কমিটির পর্যালোচনায় আরও কোনো অসংগতি উঠে আসে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন