খুঁজুন
                               
, ,
           

সেনাপ্রধানের হীরকদ্যুতিতে জ্বলজ্বল মুক্তিযুদ্ধ, দিনমান কর্মযজ্ঞ শৈশব ‘স্মৃতি জাগানিয়া’ নড়াইলে

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২২, ১০:১৮ অপরাহ্ণ
সেনাপ্রধানের হীরকদ্যুতিতে জ্বলজ্বল মুক্তিযুদ্ধ, দিনমান কর্মযজ্ঞ শৈশব ‘স্মৃতি জাগানিয়া’ নড়াইলে

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :

রাজা-জমিদারদের তীর্থ ভূমি নড়াইলে কেটেছে সেনাপ্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদের দুরন্ত উচ্ছ্বাসে ভরপুর শৈশব। ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি’, আত্নসমর্পণে বাধ্য পাকবাহিনীকে ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর বীর মুক্তিযোদ্ধা বাবা শেখ রোকন উদ্দিন আহমেদ। জাতির একজন সূর্য সন্তানের আত্নজ হিসেবেই স্বচোখে তিনিও দেখেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্ত-অশ্রু।

সেই রুদ্ধশ্বাস সমরের দিনলিপি গভীরভাবে আন্দোলিত করেছিল তাঁর শিশুমনকেও। হৃদয়ের মনিকোঠরে দাগকাটা সেই সময়ে তাঁর বয়স ৭ কী ৮ বছর। তখন মহাবিজয়ের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বজ্রকন্ঠের আহ্বানে তাঁর বাবার মতোই অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা অসামান্য শৌর্য আর বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করে হটিয়েছিলেন পাকিদের।

জেনেছেন নিশ্চিত মৃত্যু; কিন্তু দ্বিধার একটি পলকও ফেলেননি ওইসব চোখ। শৈশবের সোনার খাঁচায় খসে যাওয়া দিনগুলো আজও যেন মনে পড়ে সেনাপ্রধানের। জ্বলজ্বল করে মনের হীরকদ্যুতিতে! পরম সম্পদ মেনে এই দিনগুলোর স্মৃতিকেই যেন জীবনভর আগলে রেখেছেন। অত:পর মঙ্গলবার (০৪ জানুয়ারি) ছুটে গেছেন নিজের পৈতৃক ভিটা নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার করফা গ্রামে।

কেবল-ই কী তাই? নিভৃত মানবিকতার মুক্তদানার বিচ্ছুরণে জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন দাঁড়িয়েছেন নড়াইলের গরিব ও অসহায় মানুষের পাশেও। স্থানীয় মল্লিকপুর করফা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রায় দু’হাজার মানুষের হাতে তিনি তুলে দিয়েছেন দেশপ্রেমী বাহিনীর ভালোবাসার শীতবস্ত্র।

প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শীতকালীন প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দেশজুড়ে অসহায় ও দু:স্থ মানুষের শরীরে জড়িয়ে দিচ্ছে উষ্ণতার উপহার। ত্রাণ আর চিকিৎসা সেবাসহ নানামুখী জনকল্যাণমুখী কর্মযজ্ঞে সম্পৃক্ত রেখেছেন নিজেদের, উদ্ভাসিত করেছেন কালজয়ী চেহারায়।

প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে চলা শীতার্ত মানুষ দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর এমন অনির্বাণ মানবিকতায় খুশি। এবার তাদের পরম মমতার পরশে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসেই অনিন্দ্য সুন্দর একটি দিন পার করেছেন শীতের সঙ্কটে বেদনাবৃত্তে নিমজ্জিত নড়াইলের অসহায় মানুষেরাও।

অতীতের কাছে জমা রেখে আসা নিজের সোনালী শৈশবের সঙ্গে নিবিড়ভাবে অঙ্কিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদের নড়াইল অধ্যায়। জীবনের পূর্ণতার এই সময়ে অতীত স্মৃতি হৃদয়ে উঁকি দেয়া মাত্রই যেন ভালো লাগারই এক মুগ্ধতা ছড়ায়।

শাশ্বত আত্মার অন্তর্নিহিত মর্মরধ্বনিতে চির মাধুর্যের সুরে সতত বহমান তাঁর শৈশব জীবনের নড়াইলের গল্পগাঁথা। নিজের জবানীতে তুলে আনলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বহ্নিশিখাকে। স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের এক প্রশ্নের উত্তরে অতীতের হীরন্ময় প্রকোষ্ঠে হারিয়ে গিয়ে জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বলতে থাকলেন- ‘নড়াইল আমার জন্মভিটা নয়, আমার জন্ম খুলনায়; আমি বড় হয়েছি খুলনায়। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমি নড়াইলে ছিলাম। কারণ এটা হলো আমার বাপ-দাদার জন্মস্থান।’

সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথরেখায় দীর্ঘ ৩৮ বছরের বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনে তাঁর শ্রেষ্ঠ অর্জন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হওয়া। নড়াইলের স্মৃতির গ্রামেও সম্ভবত মঙ্গলবার (০৪ জানুয়ারি) তিনি খুঁজে ফিরেছেন সেই ধূলোমাখা পথচিহ্ন আর স্মৃতির সরণি। স্মৃতি-সত্ত্বা-ভবিষ্যতকে সঙ্গী করেই এগিয়ে গেছেন জীবনের অনিবার্যপথে, যেখানে সাফল্যে রাঙিয়েছেন নিজেকে।

হয়তো এদিন নিজের গ্রামে চোখে পড়েনি সেই পুরনো কাঠামো বা বিন্যাস। গ্রামীণ জীবনের পাশাপাশি ল্যান্ডস্কেপও হয়েছে পরিবর্তিত। বদলেছে জীবনের সীমা-পরিসীমা। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় নিজের স্মৃতির গ্রামের সুন্দর প্রতিচ্ছবিই যেন ভেসে উঠলো সেনাপ্রধানের দু’নয়নজুড়ে।

অযুত নিযুত পালাবদল সত্ত্বেও শৈশবের উজ্জ্বল দিনগুলো নিয়ে তাঁর স্মৃতিচিত্র মলিন হয়নি মোটেও। শান-শওকতে ভরা জমিদার বাড়ির আবছায়া আর নেই। কালের গর্ভে অনেক কিছুই হয়েছে বিলীন। হারিয়েছে নিজের বাপ-দাদা’র বাড়ির প্রাচীন ইমরাত বা সাংস্কৃতিক দ্যোতনা।

মানুষগুলোও চলে গেছেন জীবনের চেয়ে বহুদূরের ঠিকানায়। আবেগমথিত কন্ঠেই তাই সেনাপ্রধানের উচ্চারণ-‘এই নড়াইলে আমাদের বাড়ি ছিল। এখানে একটি বড় জমিদারবাড়ি ছিল আমাদের। সেই বাড়িটি দেখলাম এখন অনেকটাই ভেঙে গেছে নদী ভাঙনে। কিন্তু এখানে এসে একটি আলাদা অনুভূতি কাজ করছে আমার ভেতর। স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা, অনেক স্মৃতিই আজ মনে পড়ছে।’

সেনাবাহিনীতে প্রথমবারের মতো লজিস্টিক এফটিএক্স অনুশীলন
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে প্রশিক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন সেনাপ্রধান। প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মান বিশ্ব পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ারও দৃঢ় অঙ্গীকার করে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে ৫০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আর্মি লেভেল লজিস্টিক এফটিক্স (ফিল্ড ট্রেনিং এক্সারসাইজ) পরিচালিত হচ্ছে।’

জেনারেল শফিউদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন শীতকালীন প্রশিক্ষণে সারাদেশে মোতায়েন রয়েছে। আমরা যখন প্রশিক্ষণে জনগনের কাছে যাই তখন আমরা এই সুযোগটা গ্রহণ করি; তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। এই প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে আমরা আজকে এখানে শীতবস্ত্র বিতরণ করছি।

শুধু এখানেই নয়, আমরা বাংলাদেশের সব জায়গায়, যেখানেই সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণের জন্য মোতায়েন করেছি সেখানেই শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কিছু কম্বল বা অন্যান্য সাহায্য দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা কম্বল বিতরণের বাইরেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী বিতরণ এবং চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রীর প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে যুগোপযোগী বাংলাদেশ সেনাবাহিনী
সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমাদের মাননীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যুগোপযোগী এক বাহিনী হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বে শান্তিরক্ষায় সেনা প্রেরণকারী দেশ হিসেবেও শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ সেনবাহিনী।

পেশাদারিত্বের কারণেই আমরা এটি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও যাতে আমরা আরও সুনাম ছড়িয়ে দিতে পারি এজন্য প্রশিক্ষণকেই মূল ফোকাস রেখেছি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার সক্ষমতার জায়গায় পৌঁছতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।’

আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, এর আগে সেনাপ্রধান লোহাগড়ায় এসে পৌঁছালে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়ক মেজর জেনারেল এফ এম জাহিদ হোসেন ও ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং যশোরের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মো. নূরুল অনোয়ার তাকে অভ্যর্থনা জানান।

মধুমতি নদীর উপর নির্মিতব্য রেল সেতু পরিদর্শন
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ পরে মধুমতি নদীর উপর নির্মিতব্য রেল সেতু প্রজেক্ট ও মধুমতি আর্মি ক্যাম্প পরির্দশন করেন। এ সময় পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়ক এবং ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি উপস্থিত ছিলেন।

আইএসপিআর জানিয়েছে, দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোর সাথে রাজধানী ঢাকার রেল সড়ক সংযুক্তি বর্তমান সরকারের একটি অন্যতম সংযুক্তি প্রকল্প। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ১৭২ কিলোমিটার রেল পথের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় নয়টি জেলা রাজধানী ঢাকার সাথে সরাসরি সংযুক্ত হবে। এই রেলপথ ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইল, যশোর এবং খুলনা জেলাকে রেলপথ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করবে।

প্রকল্পটি ২০১৮ সালে জুলাই মাসে শুরু হয় এবং ২০২৪ সালের জুলাই মধ্যে সমাপ্ত হবে। প্রকল্প সমাপ্তির পর জাতীয় অর্থনীতিতে আনুমানিক ১.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটবে বলে আশা করা যায়। সরকারের জি টু জি প্রকল্পের আওতায় চীনের এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে রেল মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পে ‘চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানী’ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কর্মরত রয়েছে।

প্রকল্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রকল্প সুপারভিশন এবং পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করছে। এই প্রকল্পে ১৭২ কিলোমিটার রেলপথে মোট ৫৯ টি রেল সেতু, ১২৪ টি কালভার্ট ও ১৩২ টি আন্ডারপাসসহ মোট ২০ টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। বর্তমানে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৪৫.৭৮ শতাংশ।

কালের আলো/এমএএএমকে

খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ
খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

খাদ্যশস্য রাখার জায়গা বাড়াতে একের পর এক প্রকল্প। বরাদ্দ হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়, তবু বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত সংরক্ষণ সক্ষমতা। কোথাও তিন বছরেও কাজ এগিয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ, কোথাও এক যুগ পেরিয়েও শেষ হয়নি নির্মাণ। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া একটি প্রকল্পে মাটি খোঁড়ার পরই থেমে গেছে কাজ। পরে যৌক্তিকতা না পাওয়ায় সেটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি খাদ্যগুদামের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে নেওয়া চার প্রকল্পে মোট ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, দফায় দফায় সংশোধন, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং কোথাও কোথাও স্থান পরিবর্তনের কারণে এসব বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি কাটাতে গিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও এখন সামনে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য এবং পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

তিন বছরেও এক-চতুর্থাংশ কাজ
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩ জেলায় নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ১৪৫টি স্থাপনায় মোট ১৯৫টি গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক ব্যয় ৮১৪ কোটি টাকা থাকলেও পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫৫ কোটি টাকা। শুধু ব্যয়ই বাড়েনি, বেড়েছে সময়ও। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। আইএমইডির হিসাবে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২১ দশমিক ১১ শতাংশ। এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১৭৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে মাদারীপুরের কালকিনি ও বাগেরহাট প্যাকেজে ধীরগতি দেখা গেছে। গাছ ও পুরোনো অবকাঠামো সরাতেও সময় লেগেছে। শরীয়তপুরের আঙ্গারিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ও বিরল এবং মোংলা এলএসডিতে জায়গার সংকট রয়েছে। এ ছাড়া লে-আউট জটিলতা, প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন, প্রশাসনিক অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়াতেও বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. সোহেলুর রহমান খান বলেন, সময়মতো পরিচালক নিয়োগ না হওয়া, নির্ধারিত স্থানে কাজ করতে না পারা, স্থান পরিবর্তন এবং রেট শিডিউলের কারণে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রকল্প পরিচালক টেন্ডারের উদ্যোগ নিলেও কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা তিনি দাবি করেন, আগের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম এখন সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে।

এক যুগেও শেষ হয়নি ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার প্রকল্প
সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ লাখ ৮৭ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাতটি আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনার মহেশ্বরপাশা, চট্টগ্রাম ও মধুপুরে এসব সাইলো নির্মাণের কথা। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। চার দফা সংশোধনের পর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও পুরো কাজ শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৯৫ দশমিক ০৫ শতাংশই খরচ হয়ে গেছে। তারপরও বাকি কাজ শেষ করতে আবারও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রকল্পের মূল কার্যালয় ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।

রাজনৈতিক প্রকল্প, শেষ পর্যন্ত বাতিল
খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের নির্বাচনি এলাকা নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার চালের সাইলো নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটি পর্যালোচনায় আসে। এরপর দেখা যায়, ভূমি অধিগ্রহণ ও মাটি খোঁড়া ছাড়া বাস্তবে আর কোনো কাজ এগোয়নি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল শূন্য। প্রকল্প পরিচালক মোস্তাক আহমেদ জানান, নতুন ফিজিবিলিটি স্টাডিতে মহাদেবপুরে প্রকল্পটি নেওয়ার যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি। ফলে অসমাপ্ত অবস্থায় রেখেই প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যে প্রকল্পের যৌক্তিকতাই শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল না, সেটির পেছনে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন কেন হয়েছিল?

মেরামতের প্রকল্পেও ধীরগতি
ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যগুদাম ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো মেরামতে ২৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি শেষ করার কথা। লক্ষ্য ছিল সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, খাদ্যশস্যের অপচয় কমানো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ৩২ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক এ টি এম কাউছার হোসেন জানান, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। ঠিকাদারদের বিলও আটকে রয়েছে।

সরকারি গুদাম বনাম বেসরকারি সক্ষমতা
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সরকারি গুদামে বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য রাখা যায়। বিপরীতে বেসরকারি খাতের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ কোটি টন। অর্থাৎ বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পরও সংরক্ষণ সক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় গুদাম নির্মাণ টেকসই সমাধান নয়। সহজ শর্তে ঋণ, কর অবকাশ ও ভর্তুকির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে খাদ্য সংরক্ষণে যুক্ত করা যেতে পারে। তার মতে, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়তে থাকলে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কাও তৈরি হয়। তাই ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র, নির্মাণকাজের মান এবং অর্থ ব্যয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি কতটা?
খাদ্যশস্যের সরবরাহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম কিংবা গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। সম্প্রতি মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুর্যোগ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখতে হবে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হলো, একদিকে খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ, অন্যদিকে সেই লক্ষ্যেই নেওয়া প্রকল্পের ধীরগতি। কোথাও ব্যয় বাড়ছে, কোথাও মেয়াদ; কোথাও আবার প্রকল্পের যৌক্তিকতাই প্রশ্নের মুখে। ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার এই চার প্রকল্প তাই শুধু গুদাম নির্মাণের হিসাব নয়—এটি সরকারি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা। খাদ্য নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর খাতে জনগণের অর্থ খরচ করে যদি সময়মতো গুদামই না হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের সুফল শেষ পর্যন্ত যাবে কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে।

কালের আলো/এম/এএইচ

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ: ত্রিশালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ঈশ্বরগঞ্জ

ময়মনসিংহ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:০৮ অপরাহ্ণ
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ: ত্রিশালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ঈশ্বরগঞ্জ

ময়মনসিংহ থেকে ১৪ দলের দীর্ঘ লড়াই শেষে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা ঘরে তুলেছে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা দল। রোমাঞ্চকর ফাইনালে ত্রিশাল উপজেলা দলকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ঈশ্বরগঞ্জ।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচে দর্শকদের করতালি ও সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
ঈশ্বরগঞ্জের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন ১১ নম্বর জার্সিধারী রাব্বুল। তাঁর জোড়া গোলেই শিরোপা নিশ্চিত করে ঈশ্বরগঞ্জ। ত্রিশাল একটি গোল শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত সমতায় ফিরতে পারেনি। ফলে ২-১ গোলের জয় নিয়ে গোল্ডকাপ নিজেদের করে নেয় ঈশ্বরগঞ্জ।
ফাইনালের আগে ও ম্যাচ চলাকালে ঈশ্বরগঞ্জ দলের খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। তাঁর উপস্থিতি ও অনুপ্রেরণা খেলোয়াড়দের বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ঈশ্বরগঞ্জের রাব্বুল। অন্যদিকে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ত্রিশালের ১০ নম্বর জার্সিধারী ফাহাদ। ফেয়ার প্লে ট্রফি পেয়েছে হালুয়াঘাট উপজেলা দল।
৭০ মিনিটের ফাইনাল দেখতে বিকেল থেকেই ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে ভিড় করেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। ম্যাচ শুরুর পর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় গ্যালারি। দুই দলের সমর্থকদের স্লোগান, উল্লাস ও করতালিতে পুরো স্টেডিয়ামে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ।
ফাইনাল শেষে বিজয়ী ঈশ্বরগঞ্জ ও রানার্সআপ ত্রিশাল দলের হাতে ট্রফি তুলে দেওয়া হয়। দুই দলের মধ্যে মোট এক লাখ ৫০ হাজার টাকার পুরস্কারও বিতরণ করা হয়।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. মাহাবুবুর রহমান এবং ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু।

এ সময় বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা, খেলোয়াড়, কোচ, ম্যানেজার, ক্রীড়াপ্রেমী দর্শক ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় গত ২৫ আগস্ট শুরু হয় এবারের জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলাসহ জেলার ১৪টি দল এতে অংশ নেয়। দীর্ঘ প্রতিযোগিতার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ফাইনালে ত্রিশালকে হারিয়ে শেষ হাসি হাসে ঈশ্বরগঞ্জ। রাব্বুলের জোড়া গোল ও দলের লড়াকু পারফরম্যান্সে গোল্ডকাপ এখন ঈশ্বরগঞ্জের ঘরে। শিরোপা জয়ের পথে খেলোয়াড়দের পাশে থেকে উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জোগানো এমপি মাজেদ বাবুর ভূমিকাও প্রশংসা পেয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে দৃঢ় অঙ্গীকার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৬ অপরাহ্ণ
ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে দৃঢ় অঙ্গীকার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নির্ভয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা পুনরায় উচ্চারণ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং সাংবাদিকরা যেন কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই নির্বিঘ্নে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সরকার সেই পরিবেশ নিশ্চিত করেছে।’ একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ গণমাধ্যমবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের অগ্রাধিকারকে আরও স্পষ্ট করেছে।

শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলা পাবলিক হলে ‘রফিক হিলালী ইংলিশ এক্সিলেন্স প্রোগ্রাম-২০২৬’-এর ওরিয়েন্টেশন ক্লাস এবং এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

  • সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ
  • সাংবাদিক কল্যাণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ—গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করার প্রত্যাশা

একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের কোন বিকল্প নেই। জনগণের কথা বলা, অনিয়ম তুলে ধরা, রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে সরকার কাজ করছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর এমন পরিস্কার অবস্থানকে দেশের সাংবাদিকতার বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য গণমাধ্যম অঙ্গনেও একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

সাংবাদিক কল্যাণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ
সাংবাদিকদের পেশাগত ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণ ও বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের নির্ধারিত বাজেট বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে সাংবাদিক সমাজের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে সাংবাদিকতা পেশা নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও পেশাগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকদের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কল্যাণমূলক কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে অসচ্ছল ও সংকটে থাকা সাংবাদিকদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের জন্যও তা বাস্তব সহায়তা তৈরি করতে পারে।

হলুদ সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ
প্রতিমন্ত্রী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধের কথাও বলেছেন। বিষয়টি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্যের দিকটি সামনে আনে। তিনি বলেছেন, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ ও অপসাংবাদিকতা রোধে পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখার কাজ চলছে।’

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি সংবাদ প্রকাশে তথ্যের যথার্থতা, নিরপেক্ষতা, পেশাগত নৈতিকতা ও জনস্বার্থের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন সাংবাদিকতা কখনোই দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার সমার্থক নয়। বরং স্বাধীনতা যত বেশি থাকবে, সাংবাদিকদের পেশাগত মান ও নৈতিকতার চর্চাও তত বেশি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এতে করে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়াতে পারে।

হাওর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ভাবনা
এ সময় হাওর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সুবিধা ও আলাদা একাডেমি ক্যালেন্ডার প্রণয়নের বিষয়ে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি একটি জাতীয় বিষয়। হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও পড়ালেখার সুবিধার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে এবং শিগগিরই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর এই বক্তব্য প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের বাস্তবতাভিত্তিক চিন্তার ইঙ্গিত দেয়। প্রতিমন্ত্রী বিষয়টিকে ‘জাতীয় বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সমস্যাকে শুধু স্থানীয় সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে বিবেচনার বার্তা মিলেছে।

শিক্ষার্থীদের মানবিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু জিপিএ-৫ বা ভালো ফলাফল অর্জন করলেই চলবে না, শিক্ষার্থীদের মানবিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। পরিবার, শিক্ষক ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নৈতিকতার চর্চা করলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভালো ফলাফলের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের চর্চার ওপর প্রতিমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ শিক্ষার বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে সামনে এনেছে। পরিবার, শিক্ষক ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক না রেখে চরিত্র ও মূল্যবোধ গঠনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি দৃষ্টিভঙ্গি বলে মনে করছেন অনেকেই।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, তৃণমূলের যুবসমাজকে খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করতে মাঠের আধুনিকায়ন করা হচ্ছে এবং অনলাইনে ও টিভিতে চাইনিজ ও অ্যারাবিক ভাষা শিক্ষার বিশেষ কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে।

নেত্রকোণা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা, কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা চৌধুরী এবং জেলা প্রেসক্লাবের সম্পাদক মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম।

কালের আলো/এম/এএইচ