রিসোর্টকাণ্ডের ব্যাখ্যা দিলেন মামুনুল হক
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত রয়েল রিসোর্টকাণ্ড নিয়ে পাঁচ বছর পর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তিনি দাবি করেছেন, রিসোর্টে তার সঙ্গে থাকা জান্নাত আরা ঝর্ণা তার বৈধ স্ত্রী ছিলেন এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছিল।
শনিবার (২০ জুন) সকালে তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি এ ব্যাখ্যা দেন।
৫০১ ফ্যাসিবাদী হাসিনার ব্যর্থ প্রজেক্ট উল্লেখ্য করে মাওলানা মামুনুল হক লিখেছেন, ‘৩ এপ্রিল ২০২১। রাষ্ট্রীয় মবসন্ত্রাসের এক ঘৃণ্য কালো দিবস। সেদিন আমি আমার স্ত্রী জান্নাত আর (ঝর্ণা)কে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রয়েল রিসোর্টের ৫০১ নং কক্ষে অবস্থান করছিলাম। সেখানে পুলিশের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী সন্ত্রাসী, সাংবাদিক লীগ ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রায় শ খানেক সদস্য উপস্থিত হয়। রিসোর্টের রিসিপশন ডেস্ক থেকে ফোন করে আমাকে জানানো হয়, পুরো রিসোর্ট পুলিশ ঘেরাও করে ফেলেছে। আমি আমার কক্ষের দরজা খুলতেই তারা সবাই জোরপূর্বক আমার রুমে প্রবেশ করে। সময় টিভিসহ বেশ কয়েকটি চ্যানেলের সাংবাদিক এবং উপস্থিত প্রায় সকলেই তাদের ডিভাইসের মাধ্যমে একযোগে লাইভ প্রচার করতে থাকে।’
তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ নিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘তারা (আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা) নানাভাবে আমাদেরকে হেনস্তা করে। আমার উপর চড়াও হয়। আমার স্ত্রীকেও টেনে ধরে ধাক্কাধাক্কি করে। তাদের হিংস্রতা থেকে বাঁচানোর জন্য আমি আমার স্ত্রীকে ওয়াশরুমের দরজা খুলে সেখানে আটকে দেই। কিছুক্ষণের মধ্যে লেডি পুলিশের একটি টিম এসে উপস্থিত হয় এবং ওয়াশরুমে ঢুকে তারাও সেখান থেকে লাইভ সম্প্রচার করতে থাকে। উপর্যুপরি তাদের জিজ্ঞাসাবাদে আমি এবং আমার স্ত্রী আমরা উভয়েই স্পষ্ট ভাষায় আমাদের বৈবাহিক সম্পর্ক এবং আমরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সেখানে অবস্থান করার বিষয়টি ব্যক্ত করি এবং সেটি প্রচারিত সকল সংবাদে একযোগে প্রচার হতে থাকে।’
তিনি আরও লিখিছেন, ‘শুরুতেই পুলিশ কর্মকর্তা আমার হাত থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। পরে এডিশনাল এসপি আসার পর তিনি আমাদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য আমাকে ফোন ফিরিয়ে দেন এবং আমার পরিচিতজনদের সাথে কথা বলে আশ্বস্ত হয়ে আমাদেরকে নিরাপদে বাইরে নিয়ে আসতে চান। কিন্তু ততক্ষণে সেখানে উপস্থিত হন গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইর একাধিক কর্মকর্তা। তারা আমাদেরকে থানায় নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। আমরা তাদের সাথে রুম থেকে বের হয়ে লবিতে নেমে দেখি হুলস্থুল কাণ্ড। হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষ সেখানে ঢুকে পড়েছে। উপস্থিত পুলিশগুলো প্রাণ ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে তাদেরকে রক্ষা করার আবদার জানাতে থাকে। আমি পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে আমার মোবাইল ফেরত নিয়ে লাইভে কিছু বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু দেখি প্রযুক্তির সাহায্যে আমার ফেসবুক আইডির লাইভ অপশন বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তখন আমি বিক্ষুব্ধ জনতার সামনে গিয়ে তাদেরকে নিবৃত করি এবং পুলিশদেরকে রক্ষা করার ব্যবস্থা করি।’
জান্নাত আরা (ঝর্ণার) সাথে বিয়ের প্রসঙ্গে মামুনুল হক লিখেছেন, ‘জান্নাত আরা ইতোপূর্বে আমার ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হাফেজ শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ছিল এবং আ. রহমান জামি ও ওবায়দুর রহমান তামিম নামে তাদের দুজন সন্তান রয়েছে। বনিবনা না হওয়ায় তারা উভয়ে স্বেচ্ছায় বিচ্ছেদ ঘটায়। একটা সময় জান্নাত আরা স্বপ্রণোদিত হয়ে ফোনে আমার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং আমার সহযোগিতা কামনা করে। আমি তাকে আমার পরিবারের কথা বলে এই মর্মে প্রস্তাব দেই যে, সমতার ভিত্তিতে স্ত্রীদের যেই অধিকার দেয়ার বাধ্যবাধকতা ইসলামে রয়েছে, আমি সেটা দিতে পারব না। এতে যদি সে সম্মত থাকে তাহলে আমি তাকে আমার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করব। সে স্বেচ্ছায় প্রস্তাবে সম্মতি জানালে আমি তার কাছ থেকে সুস্পষ্ট শব্দে বিবাহের ইজিন গ্রহণ করি এবং শরীয়তের বিধান মোতাবেক আমার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। উল্লেখ্য ফকীহগণ কুরআন সুন্নাহর দলিলের আলোকে সাব্যস্ত করেছেন যে, স্ত্রীর যে অধিকার স্বামীর উপর ওয়াজিব, তা স্ত্রী স্বেচ্ছায় ত্যাগ করলে তা গ্রহণযোগ্য হবে।’
তিনি আরও লেখেন, ‘বিবাহের পর আমি তাকে ঢাকা মোহাম্মদপুরস্থ কুরআন শিক্ষার কেন্দ্র নুরানি কোর্সে ভর্তি করিয়ে দেই এবং সে কোর্স সুসম্পন্ন করে। এভাবে কিছুদিন থাকার পর নিজ আগ্রহে সেলাই প্রশিক্ষণসহ মেয়েলি কিছু কার্যক্রমের প্রশিক্ষণের একটি প্রতিষ্ঠানে সে কাজ শিখতে থাকে। প্রথমদিকে ঢাকায় তার এক বোনের বাসায় অবস্থান করত এরপর স্বেচ্ছায় অন্য বাসায় সাবলেট হিসাবে বসবাস করা শুরু করে। আমি প্রয়োজন মত তার সাথে সাক্ষাৎ করতাম এবং সময় দিতাম।’
বিবাহ গোপন রাখা প্রসঙ্গে মামুনুল হক বলেন, ‘এটা সবাই জানি, আমাদের উপমহাদেশে একাধিক বিবাহ একটা জটিল বিষয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারাই একাধিক বিবাহ করেন, তারা প্রথম পরিবার থেকে একটা সময় পর্যন্ত লুকিয়ে রাখেন। কারণ, পরিবার কোনোভাবেই তা মানতে চায় না। স্বাভাবিকভাবেই আমার সন্তান ও পরিবারে ওই মুহূর্তে আমি অস্থিরতা তৈরি করতে চাইনি। রাষ্ট্রীয় আইনে প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বাধ্যবাধকতার জটিলতায় কাবিন করাটাও সমস্যাপূর্ণ ছিল। আর ইসলামেও কাবিন করা বাধ্যতামূলক নয়। আমার প্রথম বিবাহেও স্ত্রী রাষ্ট্রীয় আইনে অপ্রাপ্তবয়স্কা হওয়ায় কাবিন করিনি। তবে একাধিক বিবাহের বিষয়টি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ জানত। আমিই সতর্কতামূলক জানিয়ে রেখেছিলাম। রয়েল রিসোর্ট থেকে পুলিশ কর্মকর্তা এএসপি মহোদয় আমার সেই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মধ্য থেকে একাধিক নির্ভরযোগ্য সুপরিচিত ব্যক্তির সাথে আলাপ করে আশ্বস্ত হয়েছিলেন এবং আমার পক্ষে কিছুটা ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফলে তাকে হাসিনা সরকারের দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হতে হয়েছে।’
রয়েল রিসোর্টে আরেকজনের নাম এন্ট্রি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার আইডি কার্ডের বিস্তারিত পরিচয়ে স্ত্রীর নাম আছে আমিনা তাইয়েবা। আর জান্নাত আরার আইডি কার্ডে তার নাম হলো শাহিদা ইসলাম এবং স্বামী হিসেবে শহিদুল ইসলামের নাম লেখা। যা তখনো পরিবর্তন করেনি। তাই আমরা দুজন কথা বলেই স্ত্রীর ঘরে আমার প্রথমার নাম বলেছিলাম।’
ফোন কলে প্রথম স্ত্রীর কাছে শহিদুল ইসলামের ওয়াইফ বলে পরিচয় দেওয়া প্রসঙ্গে মামুনুল বলেন, ‘আমার প্রথম স্ত্রীকে বিষয়টি যেভাবে শান্ত মাথায় বললে তার জন্য মেনে নেওয়া সহজ হতো সেটা করতে পারিনি, তাই আমি তার কাছে জান্নাত আরার সাবেক পরিচয় বলেছি। যেহেতু জান্নাত আরাকে আগে থেকে সে শহিদুল ইসলামের ওয়াইফ হিসেবেই চিনত।’
তিনি আরও লেখেন, ‘নারায়ণগঞ্জে রিসোর্ট কাণ্ডের পর পর তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এর তৎকালীন ডিজি মেজর জেনারেল টি এম জোবায়ের আমার সাথে বসেছিল। আমাকে অফার করেছিল, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে। আলহামদুলিল্লাহ! আমার বুঝে এসেছিল যে, আমাকে ট্র্যাপে ফেলে আমার দ্বারা ইসলামের বড় ক্ষতি করতে চায়। আমি তাদের অফার গ্রহণ করিনি। আল্লাহ আমাকে হেফাজত করেছেন।’
মুতা বিয়ে প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘ফ্যাসিবাদী হাসিনার লীগ প্রশাসন ও মিডিয়া নানা রকম মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ ছড়ায়। রিমান্ড জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে মিথ্যাচারগুলো অবলীলায় করে যায়। নানা ধরনের আজগুবি কথাবার্তা মিডিয়া লিখতে থাকে। চুক্তিভিত্তিক বিয়ে, সাময়িক বিয়ে এই জাতীয় ডাহা মিথ্যা কথা তারা একের পর এক প্রচার করে যায়। অথচ বাস্তবতা আদৌ এমন ছিল না। আমাদের বিয়ে ছিল সম্পূর্ণ শরীয়তসম্মত ইসলামী বিয়ে। সাময়িক অথবা মুতা বিয়ের কনসেপ্ট হাসিনার তৈরি মিথ্যা প্রোপাগান্ডা। একজন ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করা কি অপরাধ? এটাকে কোনো দেশের পরিভাষায় কটাক্ষ করা যায়?’
জান্নাত আরা ঝর্ণার সাথে নিজের বর্তমান সম্পর্ক নিয়ে লিখেছেন,‘ ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছর আমাদের বিবাহ বন্ধন টিকে ছিল। কিন্তু ২০২১ এর ঘটনার পর পরস্পর কিছু মনোমালিন্য সৃষ্টি হওয়ার প্রেক্ষিতে এক পর্যায়ে আমরা আলোচনার মাধ্যমে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।২০২৫ সালের মার্চ মাসে বিচ্ছেদের আগ পর্যন্ত এমনকি আমার কারাবাসকালীন সময়েও তার ভরণপোষণসহ প্রাপ্য অধিকার আদায় করি।’
আমার চরিত্র হননের ঘৃণ্য প্রয়াস ছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনার মন্তব্য করে তিনি লিখেছেন, ‘রাজনৈতিক কিংবা আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে অনেকেই ফ্যাসিস্ট হাসিনার এই নির্লজ্জ মবসন্ত্রাস ও মিথ্যাচারের ঘটনাকে পুঁজি করে আমাকে ঘায়েল করার অপপ্রয়াস চালায়। তারা মনে করে কটূক্তি বা কটাক্ষ করলেই সত্য ন্যায় ইসলাম ও দেশ জাতির পক্ষে কথা বলতে আমি কুণ্ঠিত হয়ে যাব।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘তাদের (হাসিনা ও সহযোগীদের) মনে রাখা উচিত, কুৎসা রটনা ও ঘায়েল করার ভয়াবহ অনেক পর্ব আমি আল্লাহর রহমতে পেছনে ফেলে এসেছি। নারায়ণগঞ্জের আদালতে এমনও দিন গিয়েছে যে, আমার পক্ষে একজন আইনজীবীকে পর্যন্ত উপস্থিত হতে দেওয়া হয়নি। অপরদিকে আওয়ামী লীগের সকল পান্ডা আইনজীবী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ডিজিএফআইয়ের নেতৃত্বে একত্রিত হয়ে আমাকে অশ্লীল গালিগালাজ করেছে, হেনস্তা করেছে। চরম অসহায় অবস্থায় আদালতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেলে রেখেছে।’
কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array