সময় পেরিয়েছে, সৌন্দর্যের মুগ্ধতা রয়ে গেছে
রুপালি পর্দায় কয়েক দশক ধরে সৌন্দর্য, অভিনয় ও জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে আছেন চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা। সময়ের সঙ্গে বদলেছে চলচ্চিত্রের ভাষা, এসেছে নতুন প্রজন্ম, বদলেছে দর্শকের রুচি। তবে পূর্ণিমাকে ঘিরে দর্শকের মুগ্ধতায় যেন ভাটা পড়েনি।
পর্দায় নিয়মিত না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি এখনো ভক্তদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। নতুন কোনো ছবি প্রকাশ করলেই প্রশংসায় ভরে ওঠে মন্তব্যের ঘর। সময়ের সঙ্গে তাঁর সৌন্দর্যে যোগ হয়েছে পরিণত এক দীপ্তি।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা একটি ছবিকে ঘিরেও দেখা গেছে একই চিত্র। সাদা পোশাকের সঙ্গে কালো-সাদা চেক নকশার জ্যাকেট, খোলা সোজা চুল, স্বাভাবিক সাজ আর মুখের মিষ্টি হাসিতে পরিশীলিত এক লুকে ধরা দিয়েছেন এই অভিনেত্রী।

পরিপাটি সাজে মুগ্ধতা
ছবিতে সাদা ডিপ ভি-নেক টপের সঙ্গে সাদা প্যান্ট পরেছেন পূর্ণিমা। এর সঙ্গে কালো-সাদা নকশার ব্লেজার যোগ করেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। হাতে সোনালি রঙের রিস্টওয়াচ ও সূক্ষ্ম ব্রেসলেট, পায়ে স্ট্র্যাপি স্টিলেটো হিল—সব মিলিয়ে তাঁর সাজে ছিল আভিজাত্য, তবে ছিল না বাড়াবাড়ি।
তবে পোশাকের চেয়েও বেশি নজর কেড়েছে তাঁর স্বাভাবিক হাসি ও সাবলীল উপস্থিতি। ছবিটি প্রকাশের পরপরই ভক্তদের প্রশংসায় ভরে ওঠে মন্তব্যের ঘর।

‘নিজের ভেতরের আলোকে নিভতে দিও না’
ছবির সঙ্গে পূর্ণিমার লেখা ক্যাপশনও নজর কেড়েছে। জীবনের উত্থান-পতনকে আলোর সঙ্গে তুলনা করে অভিনেত্রী লিখেছেন, ‘জীবনে উত্থান-পতন আসবেই। তবে নিজের ভেতরের ঝড়গুলোকে কখনোই তোমার বয়ে চলা আলোর চেয়ে বেশি উজ্জ্বল হতে দিও না।’
পূর্ণিমার এই কথার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন তাঁর ভক্ত-অনুসারীরাও। একজন মন্তব্য করেছেন, ‘ঝড় আসবেই; কিন্তু নিজের ভেতরের আলোটা যেন কখনো নিভে না যায়, এটাই জীবনের আসল শক্তি।’
আরেকজন লিখেছেন, ‘ঠিক বলেছেন, জীবনে যা কিছু হোক থেমে থাকা যাবে না।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যগুলোই যেন বলে দেয়, পূর্ণিমার সঙ্গে দর্শকের সম্পর্ক কেবল তাঁর অভিনীত চরিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের ধরন বদলেছে, কিন্তু ভালোবাসা ও আগ্রহ এখনো রয়ে গেছে।
১৭ বছর বয়সে চলচ্চিত্রে অভিষেক
মাত্র ১৭ বছর বয়সে বড় পর্দায় অভিষেক হয় পূর্ণিমার। জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত ‘এ জীবন তোমার আমার’ সিনেমার মাধ্যমে নায়িকা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন তিনি। প্রথম সিনেমাতেই তাঁর সহশিল্পী ছিলেন রিয়াজ।
অভিষেকের পর থেকেই দর্শকের নজরে আসেন পূর্ণিমা। এরপর একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। মান্না, ফেরদৌস, আমিন খান, শাকিল খান থেকে শুরু করে শাকিব খানের মতো জনপ্রিয় নায়কদের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছেন এই অভিনেত্রী।
রিয়াজ-পূর্ণিমা জুটির আলাদা জনপ্রিয়তা
ঢালিউডে বেশ কিছু জনপ্রিয় জুটির মধ্যে রিয়াজ-পূর্ণিমা জুটির গ্রহণযোগ্যতা ছিল আলাদা। ‘মনের মাঝে তুমি’, ‘হৃদয়ের কথা’, ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’সহ বেশ কিছু সিনেমায় তাঁদের রসায়ন দর্শকের প্রশংসা পায়।
বিশেষ করে ‘মনের মাঝে তুমি’ সিনেমাটি বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি দর্শকের মনে দীর্ঘস্থায়ী জায়গা করে নেয়। সিনেমাটির জনপ্রিয়তা রিয়াজ-পূর্ণিমা জুটিকেও আরও শক্ত অবস্থান এনে দেয়।

ছোট পর্দাতেও ছিল সফল উপস্থিতি
শুধু চলচ্চিত্র নয়, ছোটবেলা থেকেই নাচ ও গানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পূর্ণিমা। ক্যারিয়ারের ব্যস্ত সময়েও টেলিভিশন নাটক ও টেলিফিল্মে অভিনয় করেছেন তিনি।
‘লাল নীল বেগুনী’ ধারাবাহিকের মাধ্যমে টেলিভিশন দর্শকের কাছেও পরিচিতি পান এই অভিনেত্রী। এরপর ‘ল্যাবরেটরি’, ‘নিলিমার প্রান্তে’, ‘অমানিশা’, ‘শঙ্খচিল’, ‘লাভ অ্যান্ড কোং’সহ বেশ কিছু নাটক ও টেলিফিল্মে অভিনয় করেছেন।
অভিনয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনেও ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। গ্রামীণফোন, সিটিসেল, মেরিল বেবি লোশন, বার্জার ঝিলিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে দেখা গেছে তাঁকে।
অভিনয়ের স্বীকৃতিও মিলেছে
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে দর্শকের ভালোবাসার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বীকৃতিও পেয়েছেন পূর্ণিমা। কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘ওরা আমাকে ভালো হতে দিল না’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ২০১০ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি।
এ ছাড়া ‘মনের মাঝে তুমি’ ও ‘হৃদয়ের কথা’ সিনেমার জন্য মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারও পেয়েছেন এই অভিনেত্রী।

পর্দায় অনিয়মিত, আলোচনায় নিয়মিত
বর্তমানে চলচ্চিত্রে নিয়মিত নন পূর্ণিমা। তবে অভিনয় থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যাননি তিনি। তাঁর অভিনীত ‘জ্যাম’ ও ‘গাঙচিল’ সিনেমা দুটি মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। সিনেমা দুটিতে তাঁর সঙ্গে জুটি বেঁধেছেন ফেরদৌস ও আরেফিন শুভ।
বড় পর্দায় নিয়মিত দেখা না গেলেও টেলিভিশনে মাঝেমধ্যে হাজির হন পূর্ণিমা। কখনো উপস্থাপনায়, কখনো কোনো অনুষ্ঠানের বিচারকের আসনে দেখা যায় তাঁকে। বিজ্ঞাপনেও রয়েছে তাঁর উপস্থিতি।
সময় বদলেছে, মুগ্ধতা নয়
পূর্ণিমার ক্যারিয়ারের গল্পটা যেন সময়ের সঙ্গে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের গল্প। ১৭ বছরের তরুণী থেকে আজকের পরিণত অভিনেত্রী—দীর্ঘ এই পথচলায় বদলেছে বয়স, বদলেছে সময়, বদলেছে চলচ্চিত্রের পরিবেশও।
তবে দর্শকের চোখে পূর্ণিমার সেই মুগ্ধতা এখনো অটুট। নতুন প্রজন্মের অনেক তারকা নিয়মিত পর্দায় থাকলেও পূর্ণিমা অনিয়মিত হয়েও আলোচনায় থাকেন।

সময়ের সঙ্গে তাঁর জীবনে যোগ হয়েছে অনেক বছর, কিন্তু দর্শকের ভালোবাসা কিংবা সৌন্দর্যের দীপ্তিতে যেন তার প্রভাব পড়েনি। তাই পূর্ণিমার ক্ষেত্রে বয়স হয়তো সত্যিই শুধুই একটি সংখ্যা—যে সংখ্যা তাঁর মুগ্ধতাকে মাপতে পারে না।
কালের আলো/জেএন













আপনার মতামত লিখুন
Array