খুঁজুন
                               
, ,
           

মাঠ থেকে সমুদ্র—অর্থনীতির বিস্তৃত নকশা প্রধানমন্ত্রীর

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০০ অপরাহ্ণ
মাঠ থেকে সমুদ্র—অর্থনীতির বিস্তৃত নকশা প্রধানমন্ত্রীর

কৃষকের মাঠ থেকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, গ্রামের উদ্যোক্তা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় দক্ষ তরুণ, খাল-পানিপথ থেকে বঙ্গোপসাগরের বন্দর—বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের সম্ভাবনাকে একই সূত্রে বাঁধার একটি বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর বক্তব্যে কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত নয়; গ্রামীণ অর্থনীতি, শিল্প, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি। একইভাবে শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের বিষয় নয়; দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যম। আর বঙ্গোপসাগর শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; বাণিজ্য, জ্বালানি, মৎস্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

শনিবার (০৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সংলাপ ৩ থেকে ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

  • কৃষি ও গ্রামীণ উদ্যোক্তা থেকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ
  • দক্ষ তরুণ, সামাজিক সুরক্ষা ও নীল অর্থনীতিকে উন্নয়নের সঙ্গী করার পরিকল্পনা
  • বঙ্গোপসাগর ঘিরে বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর বার্তা

কৃষির মাঠেই অর্থনীতির প্রথম ভিত্তি

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের শুরুতেই উঠে আসে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি। তিনি বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষিখাত।’ প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ সহজ করার পাশাপাশি মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা বাড়ানোর কথা জানান তিনি। কৃষির পরবর্তী ধাপ হিসেবে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন।

তারেক রহমান বলেন, ‘একটি শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতিই গড়ে তুলতে পারে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশ।’ এখানে কৃষিকে কেবল উৎপাদনের জায়গায় না রেখে মূল্য সংযোজন, বাজার ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাই স্পষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ মাঠের উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চেইন তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বিনিয়োগের জন্য নীতির নিশ্চয়তা

গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি শিল্প ও বিনিয়োগকে প্রবৃদ্ধির দ্বিতীয় স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য এবং শক্তিশালী উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা জানান তিনি। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানির সব খাতে কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের জন্য নীতিগত নিশ্চয়তা অপরিহার্য, আর আমাদের দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালার ধারাবাহিকতাই সেই নিশ্চয়তা প্রদান করবে।’ এই বক্তব্যে বিনিয়োগ আকর্ষণের সঙ্গে নীতির পূর্বানুমেয়তা ও ধারাবাহিকতাকে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু বিনিয়োগ আহ্বান নয়, বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবেশ তৈরির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কার্ডে সামাজিক সুরক্ষা, মায়ের হাতে সহায়তা

অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষাকে লক্ষ্যভিত্তিক করার কথাও বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর পরিকল্পনায় ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা পৌঁছানোর কথা রয়েছে। একই কাঠামোর মধ্যে কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবার জন্য হেলথ কার্ড এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা এক জায়গায় পাওয়ার জন্য ইউনিভার্সাল কার্ডের কথা তুলে ধরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য হবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ফলে সামাজিক সুরক্ষাকে একাধিক বিচ্ছিন্ন কর্মসূচির বদলে সমন্বিত কাঠামোয় নেওয়ার পরিকল্পনার ইঙ্গিত মিলেছে।

ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা, নিয়োগে নারী অগ্রাধিকার

স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূলকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তারেক রহমান। তিনি জানান, প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের কাজ চলছে; তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। এই কর্মীরা স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রেফারেল সেবা দেবেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। পরিকল্পনাটির তাৎপর্য হলো—চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে রোগী যাওয়ার অপেক্ষার পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় নেওয়ার একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা।

সনদের বাইরে শিক্ষার নতুন লক্ষ্য

শিক্ষাকে কর্মজীবন ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর পরিকল্পনায় সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিস্তারের কথা রয়েছে। প্রথম শ্রেণি থেকেই বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, স্কুলব্যাগ, মিড-ডে মিল ও বৃত্তির কথা জানান তিনি। মেয়েদের জন্য স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার পরিধি সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন। তরুণদের প্রসঙ্গে এসে পরিকল্পনাটি আরও ভবিষ্যতমুখী হয়ে ওঠে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপে সহায়তার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি চান তরুণেরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাক এবং ‘ব্রেইন ড্রেনকে ব্রেইন সার্কুলেশনে’ রূপান্তরিত করা হোক।

২০ হাজার কিলোমিটার খাল, ২৫ কোটি গাছ

উন্নয়ন পরিকল্পনায় পানি ও পরিবেশকে একই কাঠামোয় এনেছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও পানিপথ পুনঃখননের পরিকল্পনা জানান তিনি। পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও বলেন। তাঁর বক্তব্যে কৃষি ও জলবায়ু—দুই দিকের প্রয়োজনই উঠে এসেছে। খাল ও জলপথ পুনঃখননের পরিকল্পনাকে কৃষির সহায়তা এবং জলবায়ু সহনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করেছেন তিনি।

পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যও জানান প্রধানমন্ত্রী। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং গ্রিন ফ্যাক্টরি সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি লিড-সার্টিফায়েড কারখানার ৫৩টি রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

উন্নয়নের ভিত শক্ত করবে প্রতিষ্ঠান

অর্থনীতির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও জবাবদিহিকেও উন্নয়নের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ‘উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য।’ প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সুদৃঢ় করার কথা জানিয়ে তিনি মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। আইনের শাসন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথাও বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা হবে, যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থেই জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। অর্থাৎ তাঁর উপস্থাপিত উন্নয়ন-ভাবনায় অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার বিষয়টিকেও ভিত্তি হিসেবে রাখা হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান

বাংলাদেশের বৈশ্বিক দায়িত্বের প্রসঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটকে গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। বাংলাদেশ এখনও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তাঁদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন প্রয়োজন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য, সংকটের উৎপত্তি যেহেতু মিয়ানমারে, স্থায়ী সমাধানও সেখানেই হতে হবে।

বঙ্গোপসাগর হবে অর্থনীতির নতুন দরজা?

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের শেষভাগে উঠে আসে বঙ্গোপসাগর ও আঞ্চলিক সহযোগিতা। সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতিকে বিশ্বের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার সম্ভাবনার কথা বলেন তিনি। জাহাজ চলাচল, মৎস্যসম্পদ, পর্যটন, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরে বাণিজ্য, জথ সমৃদ্ধির ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সামুদ্রিক সহযোগিতা বাড়ানোর কথা জানান।

তিনি বলেন, ‘ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের একত্রিত করেছে; আর আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জনগণের সাথে জনগণের নিবিড় সম্পর্ক আমাদের আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।’ বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলকে পারস্পরিক সুবিধা ও যৌথ সমৃদ্ধির ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

গ্রাম থেকে বৈশ্বিক সংযোগ

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বহুস্তরীয় চিত্র উঠে এসেছে—শুরুটা কৃষির মাঠে, পরের ধাপ শিল্প ও বিনিয়োগে; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষ তরুণ, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। পানি ও পরিবেশকে রাখা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে। আর বঙ্গোপসাগরকে দেখা হয়েছে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক সংযোগের সম্ভাব্য প্রবেশদ্বার হিসেবে। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তব ফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের সক্ষমতা, অর্থায়ন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার ওপর। পাঁচ বছরের পরিকল্পনার এই রূপরেখা তাই এখন বাস্তবায়নের পরীক্ষার সামনে।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের বার্তা

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী এবং সিজিএসের সভাপতি ও বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান। ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স, ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন এ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত তিন দিনের এ আন্তর্জাতিক সংলাপ ৩ অক্টোবর শুরু হয়ে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এতে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, গবেষক, অর্থনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নিচ্ছেন। আলোচনায় বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য, নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জলবায়ু, প্রযুক্তি, গণতন্ত্র, সুশাসন এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের মতো বিষয় স্থান পেয়েছে।

কালের আলো/এমএএএমকে

আকাশে উঠল টেসলার রোডস্টার? উড়ন্ত গাড়ির দাবি নিয়ে যত প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
আকাশে উঠল টেসলার রোডস্টার? উড়ন্ত গাড়ির দাবি নিয়ে যত প্রশ্ন

বিজ্ঞানের কল্পকাহিনিতে দেখা উড়ন্ত গাড়ি কি এবার বাস্তবে আসতে চলেছে? টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের নতুন রোডস্টার স্পোর্টস কারের প্রদর্শনী ঘিরে এমন প্রশ্নই উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে স্পেসএক্সের একটি স্থাপনায় গাড়িটির বিশেষ প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে থ্রাস্টার ব্যবহার করে গাড়িটিকে সাময়িকভাবে শূন্যে তোলা, মাঝআকাশে ঘোরানো এবং মাটিতে অবতরণের কৌশল দেখানোর কথা বলা হয়েছে। তবে এই প্রদর্শনীকে পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ির আত্মপ্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, কোনো গাড়ি অল্প সময়ের জন্য মাটি ছেড়ে উঠতে পারা আর সেটিকে ব্যবহার করে নিয়মিত আকাশপথে যাতায়াত করা এক বিষয় নয়। গাড়িটির বাস্তব কার্যক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

প্রদর্শনীতে কী দেখালেন ইলন মাস্ক?

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আয়োজিত প্রদর্শনীতে মাস্ক বলেন, ‘আজ রাতে আপনারা কিছু অবিশ্বাস্য বিষয় দেখতে যাচ্ছেন।’ গাড়িটির প্রদর্শনী এআই দিয়ে তৈরি কোনো দৃশ্য নয়, তা প্রমাণ করার জন্যই দর্শকদের সামনে এটি দেখানোর প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। টেসলার দাবি, নতুন রোডস্টারে স্পেসএক্সের মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত বিশেষ থ্রাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রচলিত গাড়ির বাইরে নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। প্রদর্শনীতে দেখানো প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর এবং গাড়িটির কোন সংস্করণে এসব সুবিধা থাকবে, তা স্পষ্টভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু আকর্ষণীয় প্রদর্শনী দিয়ে কোনো প্রযুক্তির দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করা যায় না।

কীভাবে শূন্যে উঠবে গাড়ি?

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটিতে উচ্চচাপে সংরক্ষিত বাতাস দ্রুত নির্গত করে থ্রাস্ট বা ধাক্কা তৈরির ব্যবস্থা ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। বাতাস দ্রুত বেরিয়ে গেলে বিপরীত দিকে বল সৃষ্টি হয়। এই বল কাজে লাগিয়ে গাড়িটিকে সাময়িকভাবে শূন্যে তোলা বা ঘোরানোর মতো কৌশল দেখানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে থ্রাস্টের পরিমাণ, গাড়ির ওজন, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ এবং বাতাসের চাপ ব্যবস্থাপনার ওপর। দীর্ঘ সময় বাতাসে থাকা কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আকাশপথে চলাচলের জন্য আরও জটিল প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োজন। তাই থ্রাস্টার ব্যবহার করে সাময়িকভাবে শূন্যে ওঠার প্রদর্শনীকে পূর্ণাঙ্গ উড্ডয়নক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

উড়ন্ত গাড়ি হতে হলে যেসব চ্যালেঞ্জ পেরোতে হবে

একটি পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়িকে একই সঙ্গে সড়ক ও আকাশপথে নিরাপদে চলাচলের উপযোগী হতে হবে। এর জন্য শুধু শক্তিশালী থ্রাস্টার থাকলেই চলবে না; প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রযুক্তি। এর পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তা, শক্তির ব্যবহার, শব্দদূষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব পরিবেশে এসব শর্ত পূরণ না হলে প্রযুক্তিটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে ব্যবহার করা কঠিন হবে।

২০২৮ সালে উৎপাদনের পরিকল্পনা

মাস্ক জানিয়েছেন, নতুন রোডস্টারের উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উৎপাদন শুরুর নির্দিষ্ট সময়, গাড়ি সরবরাহের সূচি, চূড়ান্ত মূল্য এবং বিশেষ প্রযুক্তির বাস্তব কার্যক্ষমতা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিকল্পিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন শুরু হলেও গাড়িটির কোন সংস্করণে থ্রাস্টার প্রযুক্তি থাকবে এবং সেটি ক্রেতাদের জন্য কতটা ব্যবহারযোগ্য হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে। উৎপাদনের ঘোষণা আর বাজারে পরীক্ষিত, অনুমোদিত ও ব্যবহারযোগ্য গাড়ি সরবরাহ—দুটি আলাদা বিষয়।

টেসলার প্রদর্শনী উড়ন্ত গাড়ির ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। কিন্তু গাড়িটি দীর্ঘ সময় উড়তে পারে, আকাশপথে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে কিংবা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তাশর্ত পূরণ করেছে—এমন প্রমাণ এই বর্ণনায় নেই। অতএব, এখনই টেসলার নতুন রোডস্টারকে পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ি বলা ঠিক হবে না। বরং এটিকে থ্রাস্টার প্রযুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি প্রদর্শনী হিসেবে দেখা যায়।

সূত্র: বিবিসি

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

পাঠ্যবইয়ে বাবুই, বাস্তবে নেই—তালগাছ কমে হারাচ্ছে বাংলার চিরচেনা দৃশ্য

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
পাঠ্যবইয়ে বাবুই, বাস্তবে নেই—তালগাছ কমে হারাচ্ছে বাংলার চিরচেনা দৃশ্য

‘বাবুই পাখিকে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই।’ কবি রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতার এই পঙ্‌ক্তি বাংলা পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থীর কাছে পরিচিত। নিজের হাতে তৈরি বাসার সৌন্দর্য আর আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে বাবুই পাখির পরিচয়ও পেয়েছে বিশেষ মাত্রা। কিন্তু কবিতায় পরিচিত সেই পাখি ও তার নিপুণ বুননের বাসা এখন বাস্তবে অনেকের কাছেই অচেনা হয়ে উঠছে।

একসময় গ্রামবাংলার তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলত বাবুই পাখির অসংখ্য বাসা। পাখির কিচিরমিচিরে মুখর থাকত গ্রামের পথঘাট। মৌলভীবাজারের বিভিন্ন গ্রাম ও হাওরাঞ্চলেও ছিল এমন দৃশ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কমেছে তালগাছ, সংকুচিত হয়েছে বাবুই পাখির আবাসস্থল। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, কীটনাশকের ব্যবহার, পাখি শিকার এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণের মতো নানা কারণে প্রকৃতির এই পরিচিত দৃশ্য এখন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দা, প্রবীণ শিক্ষক ও পাখিপ্রেমীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, মৌলভীবাজারের অনেক এলাকায় একসময় প্রচুর তালগাছ থাকলেও এখন সেগুলোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কোথাও কোথাও তালগাছের অস্তিত্ব থাকলেও সেখানে আর আগের মতো বাবুই পাখির বাসা দেখা যায় না।

তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলত শত বাসা

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ২ নম্বর উত্তরভাগ ইউনিয়নের উত্তরভাগ গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক মো. মুজিবুর রহমানের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল সেই সময়ের গ্রামবাংলা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় গ্রামের মেঠোপথের পাশে সারি সারি তালগাছ ছিল। গাছগুলোর পাতায় পাতায় বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা ঝুলত। পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকত পুরো গ্রাম। মুজিবুর রহমান বলেন, শুধু তাঁর গ্রামেই নয়, আবহমান বাংলার বহু গ্রামেই এমন দৃশ্য দেখা যেত। কিন্তু এখন মৌলভীবাজারের গ্রাম-গঞ্জে তালগাছ খুব একটা চোখে পড়ে না। সেই সঙ্গে কমে গেছে বাবুই পাখির উপস্থিতিও।

তাঁর স্মৃতিচারণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কীভাবে একটি পরিচিত প্রাকৃতিক দৃশ্য কয়েক দশকের ব্যবধানে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। যে পাখি ও বাসা একসময় গ্রামীণ পরিবেশের স্বাভাবিক অংশ ছিল, এখন তা দেখার জন্যও অনেক জায়গায় খোঁজ করতে হয়।

এক দশকেই বদলে গেছে গ্রামের চিত্র

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২ নম্বর ভুনবীর ইউনিয়নের সরকার বাজার এলাকার বাসিন্দা জনি দাসও দেখেছেন তালগাছ কমে যাওয়ার এমন পরিবর্তন। তাঁর মতে, প্রায় এক দশক আগেও তাঁদের এলাকায় যত তালগাছ ছিল, এখন তার চার ভাগের এক ভাগও নেই। জনি দাস জানান, ২০০১-২০০২ সালের দিকে শুধু তাঁদের গ্রামেই রাস্তার পাশে ও বিভিন্ন বাড়িতে অন্তত দুই শতাধিক তালগাছ ছিল। এসব গাছে বাবুই পাখির বাসাও দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে পুরো গ্রাম ঘুরেও একটি তালগাছ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তাঁর।

বাবুই পাখির বাসার অবস্থা আরও করুণ বলে মনে করেন তিনি। একসময় যা ছিল গ্রামের পরিচিত দৃশ্য, এখন তা দেখা যেন জাদুঘরে বিরল কোনো নিদর্শন দেখার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের এমন অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, তালগাছ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু গাছের সংখ্যা হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পাখিদের বসবাসের সুযোগও।

এখনো রয়েছে বাবুইয়ের বাসা দেখার বিরল সুযোগ

তবে মৌলভীবাজারের সব জায়গা থেকেই বাবুই পাখির বাসা হারিয়ে যায়নি। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের রূপসপুর বা ফুলবাড়ি এলাকায় পাশাপাশি থাকা দুটি তালগাছে এখনো অসংখ্য বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা দেখা যায়। এলাকার এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন বিকেলে সেখানে ভিড় করেন অনেকে। তালগাছের পাতায় ঝুলে থাকা বাসাগুলো এখনো প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। চারপাশে তালগাছ ও বাবুইয়ের বাসা কমে যাওয়ায় এমন জায়গাগুলো স্থানীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্বও পেয়েছে।

ওই এলাকার বাসিন্দা হাজী মো. ফজলুর রহমান মনে করেন, নির্বিচারে গাছ কাটা, কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার, পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য এবং অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের কারণে তালগাছ কমে যাচ্ছে। এতে বাবুই পাখির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে এবং পাখিটির টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষার বিষয়টি শুধু পাখি সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে গ্রামীণ পরিবেশের ভারসাম্যও জড়িত।

কুলাউড়ায় তালগাছ আছে, নেই বাবুইয়ের বাসা

কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর এলাকার সোলেমান হোসেনের স্মৃতিতেও রয়েছে ছোটবেলায় দেখা অসংখ্য তালগাছ ও বাবুই পাখির বাসার কথা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর এলাকার চিত্র বদলে গেছে। সোলেমান হোসেন জানান, বর্তমানে পুরো এলাকায় রাস্তার পাশে সরকারি জমিতে মাত্র একটি তালগাছ রয়েছে। আগে সেই গাছেও বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেখানে আর কোনো বাসা চোখে পড়ছে না।

এই অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু তালগাছের অস্তিত্ব থাকলেই বাবুই পাখির উপস্থিতি নিশ্চিত হয় না। গাছের পাশাপাশি পাখির উপযোগী পরিবেশ, নিরাপত্তা ও খাদ্যের প্রাপ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট এলাকায় বাবুই পাখি না থাকার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াছিন আরাফাত রবিনও তাঁর শৈশবের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। ছোটবেলায় তাঁদের এলাকায় অসংখ্য তালগাছ দেখেছেন তিনি। এসব গাছে বাসা বাঁধত বাবুই পাখি। এখন তালগাছ যেমন কম দেখা যায়, তেমনি চোখে পড়ে না পাখিটির শৈল্পিক বাসাও।

তিন প্রজাতির বাবুই নিয়ে উদ্বেগ

পাখিপ্রেমী খোকন সিং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে খোঁজখবর করেন এবং ফটোগ্রাফির মাধ্যমে পাখিদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় পাহাড়, টিলা ও হাওরসমৃদ্ধ মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দাগি, বাংলা ও দেশি—এই তিন প্রজাতির বাবুই পাখির আবাস ছিল। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলা ও দাগি বাবুইয়ের দেখা প্রায় মেলেই না। তাঁর পর্যবেক্ষণে, কোনোরকমে টিকে আছে কিছু দেশি বাবুই পাখি।

খোকন সিংয়ের মতে, বাবুই পাখির বাসা তৈরির জন্য তালগাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পাখিটির আবাসস্থলও সংকটের মুখে পড়েছে। বাবুই পাখিকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রচুর পরিমাণে তালগাছ রোপণ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তবে কোনো প্রজাতির বর্তমান সংখ্যা, বিস্তৃতি কিংবা বিলুপ্তির ঝুঁকি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে নিয়মিত মাঠপর্যায়ের জরিপ ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। পাখিপ্রেমীদের পর্যবেক্ষণ স্থানীয় পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিলেও তা দিয়ে পুরো জেলার প্রজাতিগত অবস্থা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

আবাসস্থল ধ্বংসে ঝুঁকিতে পাখি ও বন্যপ্রাণী

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক বলেন, নানা কারণে গ্রামাঞ্চলে তালগাছ কাটা এবং অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের ফলে বাবুই পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল নষ্ট হচ্ছে। তিনি পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তালগাছ সংরক্ষণ এবং বাবুই পাখিকে বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নাজমুল হকের সতর্কবার্তা হলো, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় বাবুই পাখি বাস্তব জীবনের পরিচিত দৃশ্য থেকে হারিয়ে গিয়ে কেবল পাঠ্যপুস্তকের কবিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

তালগাছ রক্ষা ও নতুন করে রোপণ জরুরি

বাবুই পাখির বাসা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি গ্রামবাংলার পরিবেশ ও স্মৃতিরও অংশ। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং পাখির বাসা বিরল হয়ে পড়ার যে চিত্র স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তা আবাসস্থল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে তালগাছ সংরক্ষণ, উপযুক্ত জায়গায় নতুন চারা রোপণ, নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ, পাখি শিকার প্রতিরোধ এবং কীটনাশকের দায়িত্বশীল ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যমান বাবুইয়ের বাসা থাকা গাছগুলো রক্ষা করা এবং পাখির উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের মরদেহ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৭ পূর্বাহ্ণ
অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের মরদেহ উদ্ধার

রাজধানীর রমনায় অবস্থিত অফিসার্স ক্লাবের ভেতরে নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বেলা পৌনে ১২টার দিকে ভবনটির নিচতলায় সিঁড়ির পাশের ফাঁকা জায়গা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনটির তৃতীয় তলা থেকে নিচতলার ফাঁকা অংশে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্যের বাইরে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায়নি।

মেয়েকে নিয়ে সকালে অফিসার্স ক্লাবে যান

অফিসার্স ক্লাব সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে মো. মোশাররফ হোসেন তাঁর ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাবে প্রবেশ করেন। পরে ক্লাবের সুইমিংপুলের সামনে মেয়েকে রেখে তিনি পাশের নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে যান। এরপর প্রায় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে ভবনটির নিচতলায় সিঁড়ির পাশের ফাঁকা অংশে তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন। মোশাররফ হোসেন অফিসার্স ক্লাবের সদস্য ছিলেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর বনানীর একটি বাড়িতে বসবাস করতেন।

তৃতীয় তলা থেকে পড়ে যাওয়ার কথা জানাল পুলিশ

ঘটনা সম্পর্কে রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, সকালে ছোট মেয়েকে নিয়ে অফিসার্স ক্লাবের সুইমিংপুলে গিয়েছিলেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেন। তাঁর চোখে কম দেখার সমস্যা ছিল। পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নির্মাণাধীন ভবনটির তৃতীয় তলা থেকে তিনি নিচতলার ফাঁকা অংশে পড়ে যান। ঘটনাস্থলে মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করেছে পুলিশ। তবে কীভাবে তিনি নিচে পড়ে যান, সে বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যের বাইরে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্ত করাতে চাননি। এ কারণে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা জানিয়েছেন রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মোশাররফ হোসেনের বড় মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তিনি দেশে ফেরার পর বাবার দাফন সম্পন্ন করা হবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি