খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৪ আষাঢ়, ১৪৩৩
           

প্রচলিত ধ্যান-ধারণা পাল্টে কালজয়ী মানবতার উজ্জ্বল আভায় সেনাবাহিনী

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: রবিবার, ১৭ মে, ২০২০, ১২:৫৭ অপরাহ্ণ
প্রচলিত ধ্যান-ধারণা পাল্টে কালজয়ী মানবতার উজ্জ্বল আভায় সেনাবাহিনী

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো :

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নামটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই চোখের সামনে ভেসে আসে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জীবনবাজি রাখা দেশপ্রেমিক এক বাহিনী। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা কিংবা ভোটের মাঠে সরকারি নির্দেশে ভয়-শঙ্কা দূর করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতেই তৎপরতা চালানোরও নজিরও রয়েছে জাতির এই সূর্য সন্তানদের।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আভিযানিক দক্ষতা ও সক্ষমতাতেও দু:সাহসী এ সেনারাই সেরাদের সেরা। দেশের সেবায় আত্ননিয়োগের সংকল্পে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ প্রশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল এই বাহিনী হাল সময়ে প্রচলিত সব ধারণা পাল্টে কালজয়ী নতুন চেহারায় নিজেদের উপস্থাপন করেছেন।

অতীতে বন্দুক উঁচিয়ে কঠোর মানসিকতার সেনাবাহিনী এবার করোনার মহাদুর্যোগে নিজেদের সম্পর্কিত প্রচলিত সব ধ্যান-ধারণাই আমুল বদলে দিয়েছেন। ‘মানবতার জননী’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই সৃজন-মননের সন্নিবেশে বহুমাত্রিক কাজের মাধ্যমেই মানবতার উজ্জ্বল আভায় বিনির্মাণ করেছেন নিজেদের।

সুবিশাল মহাসমুদ্রের ঔদার্য্যে সমাজ জীবনে পুরনো প্রচলিত রীতি ভেঙে নতুন নতুন কনসেপ্ট সামনে এনেছেন। হৃদয় দিয়েই যেন কিনেছেন দু:খ ভারাক্রান্ত, জীবন যুদ্ধে থমকে দাঁড়ানো অর্ধাহার-অনাহারে থাকা মানুষের হৃদয়।

মানবতা, মনুষ্যত্ব আর নিজেদের ঐক্যের মহান ঐতিহ্য ধারণ করেই নীরবে পথ চলেছেন ৫৬ হাজারের বর্গমাইলে। করোনা সঙ্কটেও মানবতার টানে অসহায়, দুস্থ ও কর্মহীন মানুষকে পরম মমতার চাদরে পরশ বুলিয়েছেন।

গরিব ও অভাবী মানুষের জীবনের কঠিন বিপদসংকুল সময়ে পাশে থেকে মানবতা ও মনুষ্যত্বের মহোত্তম সঙ্গীতে কন্ঠ মিলিয়ে মহাকালের বিশাল ক্যানভাস রাঙিয়েছেন।

দেশ-কালের গন্ডি পেরিয়ে নিজেদের কীর্তি ও কৃতিত্বে বিশ্ব মানবতার ইতিহাসের পাতায় কীভাবে ঠাঁই করে নিতে হয় সেটিও চোখ বরাবর আঙুল রেখেই যেন দেখিয়ে দিয়েছেন সবাইকে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের কূশলী-বিচক্ষণ নেতৃত্ব, নিবিড় মনিটরিং আর দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনায় মানবিক মূল্যবোধের অপূর্ব সমন্বয়ে করোনা দুর্যোগে নতুন নতুন ভাবনা চিন্তার সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তিকেও কাজে লাগিয়েছেন।

অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে সম্মিলিত প্রয়াসে সুরক্ষিত করেছেন সতের কোটির বাংলাদেশকে।

দেশজুড়ে সামাজিক দূরত্ব আর হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতের নিয়মতান্ত্রিক কাজের বাইরেও হুড়োহুড়ি বা বিশৃঙ্খলার যবনিকাপাত ঘটিয়ে ছেড়েছেন।

নির্জন রাতে দরজায় দরজায় গিয়ে খাবার পৌঁছে দেওয়ার নতুন প্রথাও চালু করেছেন দেশের প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্গত মানুষের আপদে-বিপদে পাশে দাঁড়ানো বাহিনীটির গর্বিত সদস্যরা।

নিজেদের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন নানা দিকে, নানা প্রান্তে।

শারীরিক দূরত্ব বজায়ে বৃত্তের মাধ্যমে দূরত্ব চিহ্নিত, বাজারে বা গুরুত্বপূর্ণ সড়কে জীবাণুনাশক ট্যানেল, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেটিফিকেশনের (আরএফআইডি) মাধ্যমে খাবার সহায়তা, বিনামূল্যে পছন্দনীয় সব সবজির সমাহারে এক মিনিটের বাজার, প্রান্তিক কৃষকের লোকসান ঠেকাতে সবজি কিনে আবার দুস্থদের সরবরাহ করা ইত্যাকার থিউরিরও উদ্ভাবক সেনাবাহিনীই।

নিজেদের সৃষ্টিশীলতা, অদম্য মনোবল, সাহস, কর্মদক্ষতা, নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে প্রায় দেড় মাসে সুনামগঞ্জ থেকে সুন্দরবন, কুতুবদিয়া থেকে তেতুলিয়ায় সেনাবাহিনী জাতির প্রয়োজনে বেসামরিক প্রশাসনকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার পাশাপাশি কার্যকর ভূমিকারও সুনাম ছড়িয়েছে।

দেশমাতৃকার সার্বিক সেবায় মহান ব্রত নিয়েই করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে বীরদর্পেই।

গরিব, কর্মহীন ও অসহায় মানুষের মুখে আহার তুলে দিতে ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলাই যখন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল তখন এ মানবিক সহায়তা কার্যক্রমেও নতুন কর্মপদ্ধতি চালু করে সেনাবাহিনী। সুশৃঙ্খলভাবে ত্রাণ বিতরণের জন্য জেলায় জেলায় গ্রহণ করে পাইলট প্রকল্প।

মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেটিফিকেশনের (আরএফআইডি) কার্ডের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করে সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের পদ্মা সেতুর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড।

নিজেদের রেশনের টাকায় তালিকা অনুযায়ী নিত্যপণ্য সামগ্রী কখনও নদী পেরিয়ে আবার পিচঢালা সড়ক বা গ্রামীণ আঁকাবাঁকা সড়ক মাড়িয়ে নীরবে-নিভৃতে দিনমান বা রাতে বাড়ির চৌহদ্দিতে পৌঁছে দিয়েও সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

মাত্র এক মাসেই কমপক্ষে ২০ হাজার অসহায় মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। ইতোমধ্যেই দুই দিনে প্রায় দুই হাজার গরিব অসহায় মানুষ ‘এক মিনিটের বাজার’ থেকে চাল, ডাল, সবজিসহ সবকিছুই পেয়েছেন উপহার হিসেবে।

বন্দর নগরী চট্টগ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষজনকে ডাটাবেইজের আওতায় আনা হচ্ছে প্রথমে। পরে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে টোকেন। সেই টোকেনের মাধ্যমেই মাত্র এক মিনিটেই পাচ্ছেন সবজিসহ রকমারি পণ্য। পরম মমতায় আপনজনের মতোই তাদের হাতে দেওয়া হচ্ছে এসব সামগ্রী।

অনন্য এ আয়োজন প্রকৃত অর্থেই জীবন বাস্তবতার কঠিন এই সময়ে বেঁচে থাকার নিয়ামক। হুইল চেয়ারে বন্দি জীবনের মানুষজনও পাচ্ছেন পেটের দায় মেটানোর পণ্য সামগ্রী।

সংক্রমণের ঝুঁকি এড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করা ও সামাজিক দূরত্বের কঠোর অনুশাসন মানার মডেলও হয়ে উঠেছে এক মিনিটের বাজার।

চট্টগ্রামের এ মডেল প্রশংসিত হওয়ার পর রাঙ্গামাটিতে সাড়া ফেলেছে অভিনব এ বাজার। এতে খুশি সেখানকার অসহায় মানুষও। এসব বাজারের মাধ্যমে আবার কৃষকদেরও স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। করোনায় সবজির বাজারে ধ্বস নামার ঘটনায় ক্ষোভের অনলে পুড়তে থাকা কৃষকদেরও স্বস্তির উপলক্ষ্য এনে দিয়েছে সেনা সদস্যরা।

কারণ, এক মিনিটের বাজারের কেজি কেজি সবজি কেনা হচ্ছে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকেই, ন্যায্যমূল্যে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ময়মনসিংহ, রংপুর, যশোরসহ প্রায় প্রতিটি জেলাতেই কৃষকদের বাঁচাতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে দেশের আস্থা ও গর্বের প্রতীক বাহিনীটির সদস্যরা।

সম্প্রতি সেনাবাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিংদের (জিওসি) সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও কনফারেন্সে গরিব, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে নিজেদের রেশনের একাংশ বাঁচিয়ে ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেন বাহিনীর প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ে ফসলের মাঠের নায়কদের আর্থিকভাবে লাভবান করতেই তাদের কাছ থেকে সবজি সংগ্রহ করে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে অসহায়ের হাতে তুলে দেওয়ারও ‘গাইড লাইন’ দিয়েছেন।

সময়োপযোগী এসব নির্দেশনার মাধ্যমে কৃষকের সঙ্গে অভাবী মানুষজনও উপকৃত হচ্ছে। যুগান্তকারী এমন পদক্ষেপ আরও একবার জনমানসে সেনাবাহিনীর তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকাকেই মোটা দাগে উপস্থাপন করেছে।

সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের মাধ্যমে করোনার দহন দিনে টালমাটাল দেশকে অন্ধকার সরিয়ে আলোর পথে নিয়ে যেতে ক্লান্তিহীনভাবেই কাজ করে যাচ্ছে আপোসহীন ও রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত মানুষকে সুরক্ষার এই যুদ্ধে সেনারা ঋজু ও অমল কন্ঠেই অবিচল রয়েছেন। দেশ ও দেশের মানুষের প্রশ্নে তাদের নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সততা প্রাণিত করেছে লাল-সবুজের বাংলাদেশকে।

আশা-নিরাশার সকাল, দোলাচলের দুপুর পেরিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর সোনালী সন্ধা বা গহীন রাতেও বাঙালির চিত্ত, মন ও মানসিকতায় গভীরভাবেই প্রোথিত হয়ে থাকবে দেশপ্রেমিক সেনাদের নাম।

কবির ভাষায় কন্ঠে কন্ঠেই যেন গুঞ্জণ-গুঞ্জরিত হবে- ‘বল বীর/বল উন্নত মম শির!’ চৌকস ও সুশৃঙ্খল সেনাদের জন্য ভালোবাসা অবিরাম।

কালের আলো/এমএএএমকে

পুশইনের মতো অমানবিক আচরণের নজির পৃথিবীতে বিরল: মঞ্জু

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১০:০০ অপরাহ্ণ
পুশইনের মতো অমানবিক আচরণের নজির পৃথিবীতে বিরল: মঞ্জু

পুশইনের মাধ্যমে ভারত সরকার কূটনৈতিক সৌজন্য, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা উদ্যোগ না নেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর বিজয়নগরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সীমান্ত হত্যা, পুশইন ও কাঁটাতারের রাজনীতি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী তার অভিবাসী নাগরিককে অন্য দেশের মানুষ বলে জোরপূর্বক সীমান্তের শূন্যরেখায় দিনের পর দিন খোলা আকাশের নিচে বসিয়ে রেখে নির্যাতন করে ঠেলে পাশের দেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই। এর আগে মিয়ানমারের জান্তা সরকার তাদের নাগরিকদের ওপর নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কয়েক যুগ হতে যাচ্ছে, ২০ লাখের বেশি শরণার্থীর হৃদয়বিদারক জীবন চেয়ে চেয়ে দেখছে বিশ্ববাসী। তাদের পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেই।

মঞ্জু বলেন, ভারত সরকার বলেছিল নির্বাচিত সরকার এলে তারা আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। কিন্তু তাদের সহযোগিতার এই নৃশংস নমুনা অতীতের মতোই আমাদের দেখতে হচ্ছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে ভারতের কাঁটাতারের রাজনীতি, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইনের মতো শত্রুসুলভ কার্যক্রম তুলে ধরার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আলতাফ হোসাইন, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, সহকারী দপ্তর সম্পাদক আব্দুল হালিম নান্নু, মশিউর রহমান মিলু, প্রবাসী নেতা নুরুন্নবী নয়ন, যাত্রাবাড়ী থানার আহ্বায়ক মিয়া সুলতান আরিফ, বরিশালের নেতা জাকির হোসেন ও ইমরান সরদার উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এসআর/এএএন

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত একান্ত সরকারের

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৮:৫৬ অপরাহ্ণ
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত একান্ত সরকারের

আজকের আন্তঃনির্ভরশীল বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ওপর। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে নিছক দুটি রাষ্ট্র সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ, যা দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে এসেছে। আগামী দিনের লক্ষ্য উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। সফরের ক্রম, আলোচ্যসূচি এবং সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রতীকবাদের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি শুধু একটি অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের আধুনিক উন্নয়নের অন্যতম সফল মডেল। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো জনশক্তি। লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে কর্মরত রয়েছেন এবং তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আরও সম্প্রসারিত হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে বর্তমান বিশ্বে শুধু শ্রম রপ্তানি নয়, দক্ষ জনশক্তি গঠনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি এই সফরে কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে। কারণ আগামী দিনের প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা।

অন্যদিকে মালয়েশিয়ার শিল্প ও বিনিয়োগ খাতেও বাংলাদেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ইলেকট্রনিকস, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে তা দেশের শিল্পায়নকে নতুন গতি দিতে পারে। তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে চীনকে ঘিরে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশের বহু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সহায়তা রয়েছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নের ইতিহাসে সড়ক, সেতু, রেল, বিদ্যুৎ, বন্দর এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর বহু প্রকল্পের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বর্তমানে যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, তার মধ্যে অন্যতম হলো বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে চীনা বিনিয়োগ নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা তিস্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে নদীর নাব্যতা সংকট, ভাঙন, পানির স্বল্পতা এবং সেচ সমস্যার কারণে এ অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট উৎপাদন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো আগামী দিনের অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ যদি এসব খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা আকৃষ্ট করতে পারে, তাহলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে এই সফরগুলোর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্নও উঠে আসে। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেকেই লক্ষ্য করেছেন যে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রতিবেশী ভারতও সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র কোন দেশকে কখন অগ্রাধিকার দেবে, সেটি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

এখানে মনে রাখা দরকার, বিএনপির কূটনৈতিক দর্শন কোনো নতুন বিষয় নয়। স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে যে পররাষ্ট্রনীতি অনুসৃত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি ছিল জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক মর্যাদা এবং সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকেও একই ধরনের নীতিগত অবস্থান প্রত্যাশিত। কারণ একটি রাজনৈতিক দলের পররাষ্ট্রনীতি কেবল কোনো ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, আদর্শ এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সুতরাং বিএনপির কূটনৈতিক রেওয়াজে হঠাৎ করে মৌলিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা খুবই কম। দলটি ঐতিহাসিকভাবেই এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা নয়, আবার কোনো দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতাও নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পরিস্থিতি, কথিত পুশ-ইন, ভিসা ও কূটনৈতিক যোগাযোগসংক্রান্ত কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনাকে অনেকেই দুই দেশের সম্পর্কে বিদ্যমান কিছু অস্বস্তির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

তবে এ কথাও সত্য যে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল সরকার পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশ একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অংশীদার। সেই কারণেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বাস্তবতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কোনো রাষ্ট্র তার নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে—এটিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক নিয়ম। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মানদণ্ডে বিচার করা পরিপক্ব কূটনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভারতেরও উপলব্ধি করা উচিত যে আজকের বাংলাদেশ আর দুই দশক আগের বাংলাদেশ নয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এখন বাংলাদেশকে নতুন দৃষ্টিতে দেখছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান তাকে একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি এবং অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যার টেকসই সমাধানই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

বাংলাদেশ যেমন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তেমনি সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে। কারণ আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো সমতা, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থ।

আজকের বাংলাদেশ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা নয়, বরং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সাফল্যের চাবিকাঠি।

তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির সংখ্যা নয়, বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বহু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই এবার প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

বাংলাদেশের মানুষ এখন বড় বড় ঘোষণার চেয়ে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা দেখতে চায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে, শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে, কৃষি ও প্রযুক্তি খাত এগিয়ে যাচ্ছে এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যদি মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। যদি এই সফরের মাধ্যমে অর্জিত সমঝোতা ও সহযোগিতাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা দেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙল ইরানের ৩ তেলবাহী জাহাজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৮:৫২ অপরাহ্ণ
মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙল ইরানের ৩ তেলবাহী জাহাজ

গত দুই মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজ মার্কিন নৌ অবরোধ অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইটগুলো। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম ট্যাংকার ট্র্যাকার্স জানিয়েছে, ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাংকার কোম্পানির (এনআইটিসি) মালিকানাধীন তিনটি ট্যাংকার তেলভর্তি অবস্থায় অবরোধরেখা অতিক্রম করে আরব সাগরে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- ‘হিরো ২’ ও ‘ডিওনা’ নামে দুটি সুপারট্যাংকার বা অত্যন্ত বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ। এই দুটি জাহাজ মিলে মোট ৩৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করছে এবং তারা ভারতের দক্ষিণ উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এছাড়াও সোনিয়া ১ নামে আরেকটি সুয়েজম্যাক্স শ্রেণির ট্যাংকার, যা প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে এগোচ্ছে বলে জানায় ট্যাংকার ট্র্যাকার্স।

এরআগে গতকাল ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ জানিয়েছে, অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ইরানের বন্দর থেকে ৩টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার এবং ২টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী কার্গো জাহাজসহ মোট ৫টি জাহাজ কোনো বাধা ছাড়াই আন্তর্জাতিক জলসীমার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় জাহাজগুলো যাত্রা শুরু করেছে, যা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সদ্য চূড়ান্ত হওয়া সমঝোতা স্মারকের প্রথম কার্যকরী বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করে তেহরান।

এদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি শুরু থেকেই তেহরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল। অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি আমরা শুরু থেকেই জোর দিয়েছিলাম। এখন তা শুরু হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগেই অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে’।

এর আগে রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে জানান, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরু হলে এর প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত তেল-গ্যাস পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। বিশ্বের মোট তেল-গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশই এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

জবাবে এপ্রিল মাসে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর এই নৌ-অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র, যা প্রায় তিন মাস ধরে কার্যকর ছিল। দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির ফলে এখন থেকে ইরানের তেল ট্যাঙ্কার ও পণ্যবাহী জাহাজগুলো ইরানি এবং আন্তর্জাতিক উভয় জলসীমায় সম্পূর্ণ অবাধে চলাচল করতে পারবে।

এদিকে ইরানি তেল পুনরায় বিশ্ববাজারে প্রবেশের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমার প্রবণতা দেখা গেছে। বুধবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭৮.৪২ ডলারে এবং মার্কিন বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই ক্রুড প্রতি ব্যারেল ৭৫.৩৪ ডলারে নেমে এসেছে।

সূত্র: বিবিসি, আলজাজিরা

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ