বর্ষবরণে উৎসবে মাতোয়ারা দেশ
কেউ সেজেছেন কিষান-কিষানি, কেউ জেলে, কেউবা কুমার। কোথাও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রূপ, কোথাও গ্রামীণ জীবনের আবহ। রাখাল, ঘটক, বরযাত্রী, হালখাতা, বাউল, বেদে, কাকতাড়ুয়া, কামার, তাঁত, জারিগান ও লাঠিখেলার সাজ—সব মিলিয়ে যেন একখণ্ড বাংলাদেশ। বৈচিত্র্যময় এসব সাজে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তুলে ধরেছেন গ্রামবাংলার হারানো ও চেনা ঐতিহ্য। এমন দৃশ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের বৈশাখী শোভাযাত্রার। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বরণ করতে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকালে কলেজটির স্নাতক পর্যায়ের ১৭টি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অংশ নেন বর্ণিল এ আয়োজনে।
উৎসবের আমেজেই সারা দেশে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নতুন বছরকে বরণ কওে দেশের মানুষ। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে দেশজুড়ে ছিল বর্ণিল সব আয়োজন। বিভিন্ন সড়ক রাঙিয়ে তোলা হয় আলপনায়। এদিন ভোর থেকে উৎসবমুখর পরিবেশে এসব স্থানে নানা বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষ ভিড় করেন। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক দল গান ও নাচ পরিবেশন করে। আমাদের বিভিন্ন জেলা থেকে পাঠানো প্রতিবেদকদের খবরে বিস্তারিত।
আমাদের চট্টগ্রাম প্রতিবেদক জানান, নগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক অঙ্গন—সব খানেই লেগেছে বৈশাখের রঙ। বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার মিলনমেলায় রূপ নেয় পুরো নগরী। নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থানে পৃথক পৃথক আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম বৈশাখ উদযাপনের আয়োজন করে রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাব। সিআরবি শিরীষতলায় এ আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ডিসি হিল প্রাঙ্গণে এবং বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, চট্টগ্রাম জেলা সংসদের উদ্যোগে নন্দনকানন কাটাপাহাড় লেন এলাকায় বৈশাখের আয়োজন করা হয়। প্রতিটি আয়োজনেই আছে গান, নৃত্য, আবৃত্তি, নাট্য পরিবেশনা ও লোকজ সংস্কৃতির বহুমাত্রিক উপস্থাপন। সকাল থেকেই এসব অনুষ্ঠানে ভিড় জমাতে শুরু করেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণরাও অংশ নেন উৎসবে। দিনভর চলে লোকসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশনা। চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতেও নববর্ষ বরণ উপলক্ষে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেন স্থানীয় শিল্পীরা। সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ‘বোধন বর্ষবরণ উৎসব ১৪৩৩’। একইসঙ্গে কাজীর দেউড়িস্থ সিজেকেএস মুক্ত মঞ্চে (আউটার স্টেডিয়াম) অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নরেন আবৃত্তি একাডেমি। জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ, চট্টগ্রাম ৩১-শে চৈত্র রাতে বৌদ্ধ মন্দির সড়কে ‘আলপনার রঙে নববর্ষ আবাহন’ কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। পাশাপাশি পহেলা বৈশাখে চট্টগ্রাম মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর আগে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেয় চট্টগ্রামবাসী। সকাল সাড়ে ৮টায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শোভাযাত্রাটি নগরীর সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে কাজীর দেউড়ি, লাভ লেন মোড় হয়ে ডিসি হিলে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় অংশ নেন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সদস্যসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ।

আমাদের ময়মনসিংহ প্রতিবেদক জানান, ময়মনসিংহে বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রাসহ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হয়েছে। সকাল সাড়ে ৮টায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নগরীর ময়মনসিংহ মহাবিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বৈশাখী শোভাযাত্রা বের করা হয়। এর উদ্বোধন করেন ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ। এটি নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জয়নুল আবেদিন উদ্যানের বৈশাখী মঞ্চে গিয়ে শেষ হয়। নগরবাসীর নজর কাড়তে শোভাযাত্রায় আবহমান গ্রাম-বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের বিভিন্ন উপকরণ হাতে নিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেন। শোভাযাত্রায় বিভাগীয় কমিশনার ফারাহ শাম্মী, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন, অতিরিক্ত রেঞ্জ ডিআইজি আবু বকর সিদ্দিক, জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান, পুলিশ সুপার কামরুল হাসান, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আব্দুল করিম, জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মাহবুব আলম, মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট এম এ হান্নান খান, লিটন আকন্দসহ রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে বৈশাখী মঞ্চে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ সময় উদ্যানজুড়ে বসে রঙ বেরঙের বর্ণিল আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের গ্রামীণ মেলা। বিকেলে নগরীর সার্কিট হাউজ মাঠে বাংলার ঐতিহ্য ঘুড়ি উড়ানো, লাঠি খেলা, রশি টানাটানি ও হাডুডু প্রতিযোগিতা এবং পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়।
আমাদের বরিশাল প্রতিবেদক জানান, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ও নানা আয়োজন এবং উৎসবমুখর পরিবেশে বরিশালে উদযাপিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ। সকাল থেকে নগরজুড়ে শুরু হয় উৎসবের আবহ। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও বরিশাল নাটকের আয়োজনে নগরীর ব্রজমোহন (বিএম) স্কুল মাঠে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য প্রভাতী অনুষ্ঠান। ভোর থেকেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে রঙ-বেরঙের পোশাকে অনুষ্ঠানস্থলে ভিড় জমান। ছোট-বড় সবার অংশগ্রহণে পুরো প্রাঙ্গণ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে বৈশাখের চিরচেনা গান এসো হে বৈশাখ এসো এসো পরিবেশনের মধ্য দিয়ে প্রভাতী অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর একে একে গান, আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করেন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীরা। পরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এর পরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। রাখি বন্ধন ও ঢাকের বাদ্যে শুরু হয় শোভাযাত্রা। প্রভাতী অনুষ্ঠান শেষে চারুকলার আয়োজনে বিএম স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রাটি বরিশাল নগরীর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় বাঙালির লোকজ ঐতিহ্যের নানা বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়। রঙ-বেরঙের মুখোশ, মুকুট, টোপর, তালপাখা, টিয়া পাখি, টাট্টু ঘোড়াসহ গ্রামবাংলার নানা ঐতিহ্যবাহী উপকরণ শোভাযাত্রাকে করে তোলে দৃষ্টিনন্দন। এতে শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। নববর্ষ উপলক্ষে বরিশাল বিএম স্কুল মাঠে আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। সেটিকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে কেনাবেচা ও বিনোদনের আয়োজন। প্রভাতী অনুষ্ঠানে আগতরা জানান, পুরোনো সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে নতুন বছরকে বরণ করতে চান তারা। সবাই মিলে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন অংশগ্রহণকারীরা।

আমাদের খুলনা প্রতিবেদক জানান, নানা আয়োজনে খুলনায় বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয়। জেলা প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল বর্ষবরণ, বৈশাখী শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণ, লোকজ মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সকালে রেলওয়ে স্টেশন প্রাঙ্গণ থেকে বৈশাখী শোভাযাত্রা বের হয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শহীদ হাদিস পার্কে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় সরকারি-বেসরকারি দফতরের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেন। বৈশাখ উপলক্ষে শহীদ হাদিস পার্কে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পুরস্কার বিতরণ ও লোকজ মেলা বসে। অনুষ্ঠানে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য ও সর্বজনীন উৎসব। বাঙালির লোকসংস্কৃতির সঙ্গে বাংলা নববর্ষ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিগত বছরের যত গ্লানি মুছে ফেলে নতুন বর্ষে আমরা নতুন করে শুরু করি।’
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array