খুঁজুন
                               
, ,
           

চাকরি খোঁজার গণ্ডি পেরিয়ে উদ্যোক্তা : ৪০ হাজার তরুণের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন দরজা খুললেন মন্ত্রী

মো.শামসুল আলম খান, কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২৭ অপরাহ্ণ
চাকরি খোঁজার গণ্ডি পেরিয়ে উদ্যোক্তা : ৪০ হাজার তরুণের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন দরজা খুললেন মন্ত্রী

একটি চাকরি বদলে দিতে পারে একটি পরিবারের ভাগ্য। আর একজন সফল উদ্যোক্তা বদলে দিতে পারেন একটি এলাকার অর্থনৈতিক চিত্র। এই দুই সম্ভাবনাকে এক সুতোয় গেঁথে বিরামপুরে আয়োজিত হলো ‘জব ফেয়ার দিনাজপুর ২০২৬’। তবে এই আয়োজনের গুরুত্ব কেবল কতজন চাকরি পেলেন, তার হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে আরও বড় একটি প্রশ্ন—উত্তরাঞ্চলের তরুণেরা কি শুধু চাকরি খুঁজবেন, নাকি নিজেরাই হয়ে উঠবেন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির শক্তি?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যেন নতুনভাবে গুরুত্ব পেয়েছে দিনাজপুরের বিরামপুর সরকারি কলেজ মাঠে মঙ্গলবারের (২৭ অক্টোবর) চাকরি মেলা। নারী ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এমপির বক্তব্যে আরও স্পষ্ট। যেখানে সরকারের কর্মসংস্থান ভাবনায় তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে দেখার গণ্ডি পেরিয়ে তাঁদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে।

  • বিরামপুরে ‘জব ফেয়ার দিনাজপুর ২০২৬’-এ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ
  • তাৎক্ষণিক চাকরি শতাধিক, জমা পড়েছে লক্ষাধিক সিভি
  • তরুণদের আত্মনির্ভরশীল করে পিছিয়ে থাকা জনপদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলার প্রত্যয় মন্ত্রীর

মন্ত্রী বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার যুবসমাজকে কেবল চাকুরির সন্ধানে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও আধুনিক উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতেও বদ্ধপরিকর।’ তাঁর এই বক্তব্যের মধ্যেই চাকরি মেলার তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়। কারণ, চাকরির সুযোগ তৈরি করা জরুরি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য এমন একটি প্রজন্মও প্রয়োজন, যারা নিজের যোগ্যতায় কাজ খুঁজে নেওয়ার পাশাপাশি অন্যের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারবে। চাকরির বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা—দুই ক্ষেত্রেই তরুণদের এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছে অনন্য এই আয়োজন।

এক মাঠে ৪০ হাজারের বেশি চাকরিপ্রত্যাশী, স্বপ্নের পরিধি আরও বড়
বিরামপুরের মাঠে এদিন শুধু জীবনবৃত্তান্ত জমা পড়েনি। যেন জমা পড়েছে হাজারো তরুণের কর্মজীবন শুরুর প্রত্যাশা। কেউ এসেছিলেন একটি চাকরির আশায়। কেউ আবার নিজের যোগ্যতা তুলে ধরতে, কেউবা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা খুঁজতে। দেশি-বিদেশি শতাধিক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের স্টল ঘিরে চাকরিপ্রার্থীদের উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করেছে, সুযোগের দরজা খুলে দিলে তরুণেরা সেখানে পৌঁছাতে আগ্রহী।

আয়োজকদের তথ্য বলছে, মেলায় ২৫ হাজার নিবন্ধিত প্রার্থীসহ ৪০ হাজারের বেশি চাকরিপ্রত্যাশী অংশগ্রহণ করেন। তাৎক্ষণিকভাবে শতাধিক চাকরিপ্রত্যাশী চাকরি লাভ করেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জমা পড়ে লক্ষাধিক জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি। যাচাই-বাছাই শেষে এসব সিভি থেকে আনুষ্ঠানিক নিয়োগপ্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এখানে জব ফেয়ারকে সাধারণ নিয়োগ আয়োজনের চেয়ে বড় করে দেখার সুযোগ রয়েছে। একটি চাকরি একজনকে স্বাবলম্বী করতে পারে; আর একটি সফল উদ্যোগ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বহু মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে। এই দুই পথকে সামনে রেখেই তরুণদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের কথা বলেছেন মন্ত্রী।

‘মানুষকে ভুলিয়ে কথা বলে ভোট নেয়ার জন্য বিএনপি রাজনীতি করে না’
কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের প্রশ্নকে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে যুক্ত করে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘মানুষকে ভুলিয়ে কথা বলে ভোট নেয়ার জন্য বিএনপি রাজনীতি করে না। বিএনপি সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য এবং শ্রেণি ও ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য রাজনীতি করে। এটি যেমন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মূল নীতি, তেমনি এটি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক দিকদর্শন। সেই লক্ষ্যেই এই চাকরি মেলার আয়োজন করা হয়েছে।’ সাধারণত কর্মসংস্থান মানুষের আয়ের সুযোগ তৈরি করে, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ায় এবং অর্থনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের পথ খুলে দেয়। এখানে মন্ত্রীর বক্তব্যেও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নকে রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

চাকরি খোঁজার মানসিকতা থেকে চাকরি দেওয়ার সক্ষমতা
একজন তরুণ চাকরি পেলেন—এটি সাফল্য। কিন্তু সেই তরুণ ভবিষ্যতে আরও দশজনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারলেন—সেই সাফল্যের সামাজিক প্রভাব আরও বড়। উদ্যোক্তা তৈরির প্রসঙ্গে মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এই বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সরকারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো যুবসমাজকে জাগিয়ে তোলা এবং তাদের মেধা ও প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটিয়ে অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করা, যাতে করে তারা সফল উদ্যোক্তা হতে পারে।’

শুধু চাকরি খোঁজার মানসিকতার বাইরে এসে তরুণদের উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘যুবসমাজকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার লক্ষ্যে চিন্তা ও বাস্তবমুখী কাজ করতে হবে।’ মন্ত্রী আরও বলেন, ‘সরকারের মূল লক্ষ্য হলো তরুণদের মনোজগতে উদ্যোক্তা হওয়ার শক্তিশালী আকাঙ্ক্ষা ও অনুপ্রেরণা তৈরি করা। এই জব ফেয়ার তরুণদের মাঝে নতুন উদ্দীপনা জোগাবে এবং তাদের আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী হওয়ার বাস্তব পথ দেখাবে।’

যে জনপদকে জাগিয়ে তুলতে হবে তারুণ্যের শক্তিতে
বিরামপুরের প্রসঙ্গে মন্ত্রী যে ভৌগোলিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন, তা এ চাকরি মেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। উন্নয়নের আলোচনা অনেক সময় বড় শহর, শিল্পকেন্দ্র কিংবা সহজ যোগাযোগের এলাকাকে ঘিরে আবর্তিত হয়। কিন্তু তুলনামূলকভাবে দূরবর্তী জনপদের তরুণদের মেধা ও শ্রমও দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সমান গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। মন্ত্রী বলেন, ‘এলাকাটি একটি অবহেলিত অঞ্চল। কারণ এটি জয়পুরহাট, বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর বা দিনাজপুর কোনোটিরই একদম কাছে নয়। দিনাজপুর জেলা সদর থেকেও এর দূরত্ব ১১০ কিলোমিটার। এই অবস্থায় এলাকাটিকে জাগিয়ে তুলতে হলে তরুণ-তরুণীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো সবচেয়ে জরুরি।’

এখানে তাঁর বক্তব্যে একটি বাস্তব উন্নয়ন-চ্যালেঞ্জ উঠে এসেছে। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে কোনো অঞ্চলের তরুণেরা যদি বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ কিংবা নিয়োগের সুযোগ কম পান, তাহলে তাঁদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কর্মজীবনের পথ কঠিন হতে পারে। সেই ব্যবধান কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে বড় পরিসরের চাকরি মেলার আয়োজন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তরুণদের সামনে তিনটি দৃষ্টান্ত
উদ্যোক্তা হওয়ার অর্থ শুধু আর্থিক সাফল্য অর্জন নয়—সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়টিও সামনে এনেছেন মন্ত্রী। তরুণ প্রজন্মকে দেশের সফল উদ্যোক্তা ও সমাজসেবীদের আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, ‘দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা, জহুরুল ইসলাম ও স্যামসন এইচ চৌধুরীর মতো সফল উদ্যোক্তা ও মানবিক গুণসম্পন্ন আলোকিত মানুষ হতে হবে।’ এমন মানসিকতা তৈরি হলে উদ্যোক্তা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা শুধু নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা অন্য মানুষের জীবনে সুযোগ তৈরির পথও হয়ে উঠবে। একটি সফল উদ্যোগ তখনই বৃহত্তর অর্থে মূল্যবান হয়ে ওঠে, যখন তার সুফল উদ্যোক্তার পাশাপাশি কর্মী, পরিবার ও স্থানীয় সমাজের কাছেও পৌঁছায়।

মন্ত্রী বলেন, ‘তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতেই এ চাকরি মেলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তাদের মধ্যে যে জাগরণ তৈরি হবে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে কাজ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নতুন ও আগামী প্রজন্মের জন্য কেবল দিনাজপুর ছয়টি আসন নয়, বরং পুরো দিনাজপুর জেলাকে সামর্থ্যবান হিসেবে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে তারা কাজ করছেন।’

বিরামপুর থেকে যে বার্তা ছড়িয়ে পড়তে পারে
একটি মাঠে ৪০ হাজারের বেশি চাকরিপ্রত্যাশীর সমাগম একদিকে কর্মসংস্থানের চাহিদার ব্যাপকতা তুলে ধরে, অন্যদিকে সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে বড় পরিসরের উদ্যোগের গুরুত্বও সামনে আনে। তবে এই সমাবেশের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য সংখ্যার বাইরেও—তরুণদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে। মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের বক্তব্যে যে লক্ষ্য উঠে এসেছে, তা হলো তরুণদের চাকরির সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের মেধা, দক্ষতা ও উদ্যোগী মনোভাবকে কাজে লাগানো। এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে একজন চাকরিপ্রার্থী কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন, একজন উদ্যোক্তা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন, আর একটি পিছিয়ে থাকা জনপদ ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সক্ষমতার নতুন পরিচয় পেতে পারে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, দিনাজপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ জেড এম রেজওয়ানুল হক এবং দিনাজপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. মোফাজ্জল হোসেন দুলাল। আরও উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. জেদান আল মুসা, বিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

কালের আলো/এমএসএএকে/এমএএএমকে

গ্রিড বিপর্যয় কাটল, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিকের পথে

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:১৫ অপরাহ্ণ
গ্রিড বিপর্যয় কাটল, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিকের পথে

আকস্মিক বিপর্যয়ের প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা পর সচল হয়েছে জাতীয় গ্রিড। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুর ১২টা ৪৩ মিনিটে বিপর্যয়ের পর দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে গ্রিড পুনরুদ্ধারের কাজ শেষ হয়। বর্তমানে গ্রিড লাইন ও উপকেন্দ্রগুলো চালু করা হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে সচল হওয়ায় উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে জানিয়েছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি।

এর আগে দুপুরে গ্রিড বিপর্যয়ের কারণে সচিবালয়সহ রাজধানীর মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে ঢাকার পূর্বাঞ্চল ও চট্টগ্রামের একাংশেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়।

বিদ্যুৎ না থাকায় ভুলতা, হরিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, গুলশান, রামপুরা, উলন ও মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে অস্বস্তি তৈরি হয়। দুপুর ১টার দিকে সচিবালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সরকারি দপ্তরগুলোর দাপ্তরিক কার্যক্রমেও সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।

গ্রিড বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে প্রকৌশলীরা কাজ শুরু করেন। জাতীয় গ্রিডের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র এনএলডিসির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে দুপুর আড়াইটার মধ্যে গ্রিড সচল করা হয়।

কর্তৃপক্ষ জানায়, বিপর্যয়ের সময় দেশের উত্তরাঞ্চলসহ অন্যান্য এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে সাময়িক লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতিও দ্রুত কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অনাকাঙ্ক্ষিত এই বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে সৃষ্ট সাময়িক অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

যানজটমুক্ত ঢাকার পথে আরও এক ধাপ, মেট্রোরেলের চার প্যাকেজে চুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:০৪ অপরাহ্ণ
যানজটমুক্ত ঢাকার পথে আরও এক ধাপ, মেট্রোরেলের চার প্যাকেজে চুক্তি

রাজধানী ঢাকাকে আরও গতিশীল, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলার পথে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে যুক্ত হয়েছে নতুন গতি। যানজট কমানো, যাতায়াতের সময় সাশ্রয় এবং নগরবাসীর চলাচলকে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার লক্ষ্যে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশের চারটি গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণ প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে রাজধানীর গণপরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে এমআরটি লাইন-৬-এর ডিপো এলাকায় অবস্থিত মেট্রোরেল ভবনের সম্মেলনকক্ষে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প দুটির অবকাঠামো নির্মাণে এসব চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

  • ৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নতুন উড়াল স্টেশন, নির্মিত হবে ৫৪টি আধুনিক স্থাপনা ও ১১.৫০৭ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ
  • এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫-এর উত্তরাংশে চার প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষর, এগোবে ডিপো ও রেলপথ নির্মাণ

চুক্তির আওতায় এমআরটি লাইন-১-এ ৫.০০৭ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ ও তিনটি স্টেশন এবং এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশে ৬.৫০ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ ও পাঁচটি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি দুটি প্রকল্পের ডিপো, পরিচালনাকেন্দ্র, কর্মশালা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। এমআরটি লাইন-১-এর ডিপোতে নির্মিত হবে মোট ৪৯টি আধুনিক স্থাপনা।

এই অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মধ্যে গণপরিবহন সংযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে দ্রুত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি শক্তিশালী করবে। মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক যত বিস্তৃত হবে, তত বেশি মানুষের জন্য আধুনিক গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে মেট্রোরেলের এই সম্প্রসারণ রাজধানীকে আধুনিক, গতিশীল ও পরিবেশবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তোলার চলমান উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নাগরিকদের যাতায়াতের সুবিধাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ঢাকাবাসীর জন্য আরও স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ সুগম হবে।

আধুনিক গণপরিবহন গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাওগাতুল আলম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (ভারপ্রাপ্ত সচিব) কবির আহমদ। এ ছাড়া জাপান দূতাবাস, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, ‘রাজধানীর যানজট নিরসন ও যাতায়াতের সময় কমানো বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য অর্জনে আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।’ এসময় তিনি বলেন, ‘নির্মাণকাজে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা যাবে না। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভোগান্তি দীর্ঘায়িত না হয়।’

সড়ক সচিব আরও বলেন, ‘নির্মাণকাজের পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রকল্প এলাকার আশপাশে বসবাসকারী মানুষের কল্যাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও যোগাযোগ নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ঢাকাবাসীর জন্য আধুনিক, দক্ষ ও আরামদায়ক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’

আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা একটি নগরীর যোগাযোগব্যবস্থাকে গতিশীল করার পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, কর্মঘণ্টার ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সচিবের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে মেট্রোরেল সম্প্রসারণের পাশাপাশি জনবান্ধব উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও গুণগত মানের ওপর গুরুত্ব প্রতিফলিত হয়েছে।

চার প্যাকেজে বিস্তৃত হচ্ছে মেট্রোরেলের অবকাঠামো
এমআরটি লাইন-১-এর চুক্তি প্যাকেজ সিপি-০২-এর আওতায় ডিপোর পূর্ত ও ভবন নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হবে। এই প্যাকেজে কর্মশালা, রেলগাড়ি রাখার ছাউনি, পরিচালনা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রসহ মোট ৪৯টি আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। এ কাজের জন্য ‘সিনোহাইড্রো-এসইবিসিএল যৌথ উদ্যোগ’-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মেট্রোরেলের নিয়মিত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিপো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রেলগাড়ি সংরক্ষণ, কারিগরি পরীক্ষা, পরিচর্যা এবং পরিচালনাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন হবে। পরিকল্পিত এসব স্থাপনা ভবিষ্যতে নির্ভরযোগ্য রেলসেবা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করবে।

এমআরটি লাইন-১: ৫.০০৭ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ, তিনটি নতুন স্টেশন
এমআরটি লাইন-১-এর চুক্তি প্যাকেজ সিপি-০৭-এর আওতায় পাতালপথ থেকে উড়ালপথে উত্তরণের স্থান থেকে বালু নদীর শুরু পর্যন্ত ৫.০০৭ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ অংশে জোয়ার সাহারা, বোয়ালিয়া ও মস্তুল—এই তিনটি উড়াল স্টেশন নির্মিত হবে। এই কাজের জন্য ‘সিআরইসি-এমআইএল-এমবিইসি যৌথ উদ্যোগ’-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

নতুন এই অংশের অবকাঠামো রাজধানীর মেট্রোরেল নেটওয়ার্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করবে। পাশাপাশি স্টেশনগুলো চালু হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের আধুনিক গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য গন্তব্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে মেট্রোরেলকে আরও কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশ: গড়ে উঠবে আধুনিক ডিপো
এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশের চুক্তি প্যাকেজ সিপি-০২-এর আওতায় ডিপোর প্রশাসনিক ভবন, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, রেলগাড়ি রাখার প্রাঙ্গণ, গুদাম এবং কর্মশালার ছাউনিসহ বিভিন্ন পূর্তকাজ সম্পন্ন করা হবে। এ কাজের জন্য ‘সিপিসি-হানিল যৌথ উদ্যোগ’-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ডিপোর এসব অবকাঠামো প্রকল্পটির পরিচালনাগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রেলগাড়ি সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনা এবং দৈনন্দিন পরিচালনার জন্য পরিকল্পিত সুযোগ-সুবিধা তৈরি হলে ভবিষ্যৎ রেলসেবা আরও সুসংগঠিতভাবে পরিচালনার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশ: ৬.৫০ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ ও পাঁচটি স্টেশন
এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশের চুক্তি প্যাকেজ সিপি-০৩-এর আওতায় হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার এবং নতুন বাজার থেকে ভাটারা পর্যন্ত মোট ৬.৫০ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে হেমায়েতপুর, বালিয়াপুর, বিলামালিয়া, আমিনবাজার ও ভাটারা—এই পাঁচটি উড়াল স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এই কাজের জন্য ‘সিআরইসি-এমআইএল-এমবিইসি যৌথ উদ্যোগ’-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এই অংশের নির্মাণকাজ রাজধানীর গণপরিবহন নেটওয়ার্কের বিস্তারে নতুন মাত্রা যোগ করবে। একাধিক এলাকায় মেট্রোরেলের অবকাঠামো সম্প্রসারিত হলে বৃহত্তর নগরাঞ্চলের মানুষের জন্য আধুনিক গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর পথ তৈরি হবে। বিশেষ করে বাসসহ অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকর সংযোগ প্রতিষ্ঠা করা গেলে যাত্রীদের দৈনন্দিন যাতায়াত আরও সহজ ও সুশৃঙ্খল করার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

যাতায়াতে সময় সাশ্রয়, নগরজীবনে নতুন সম্ভাবনা
ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও যাতায়াতের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গণপরিবহন অবকাঠামো সম্প্রসারণ এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মেট্রোরেলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি নির্দিষ্ট পথে দ্রুতগতিতে বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি করে। ফলে সড়কনির্ভর যাতায়াতের বিকল্প হিসেবে এ ব্যবস্থা নগরবাসীর কাছে আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হলে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার যাত্রীদের যাতায়াতের সুযোগ বাড়বে। যাতায়াতে সময় সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হলে মানুষ কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, ব্যবসা ও পারিবারিক জীবনে সময় আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবেন। একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনব্যবস্থা নগরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল রাখতেও সহায়তা করতে পারে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, চারটি নির্মাণ প্যাকেজের চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫-এর উত্তরাংশের অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম আরও এগিয়ে গেল। দুটি প্রকল্পের আওতায় উড়াল রেলপথ, আটটি স্টেশন এবং আধুনিক ডিপো অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ রাজধানীর গণপরিবহনব্যবস্থাকে সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রকল্পগুলোর পরিকল্পিত বাস্তবায়ন ঢাকার যাতায়াতব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করবে। নতুন স্টেশন ও রেলপথের সঙ্গে বিদ্যমান পরিবহনব্যবস্থার সংযোগ বাড়ানো গেলে যাত্রীদের চলাচল আরও সহজ হবে।

কালের আলো/এমএএএমকে

স্থানীয় ভোটে উত্তাপ, সংঘাতের শঙ্কা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৩৮ অপরাহ্ণ
স্থানীয় ভোটে উত্তাপ, সংঘাতের শঙ্কা

স্থানীয় সরকার নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। দলীয় প্রতীক না থাকলেও ভোটের মাঠে দলীয় প্রভাব, মনোনয়ন ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং স্থানীয় নেতৃত্বের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই নির্বাচনী পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল। একই এলাকায় দলের একাধিক নেতা প্রার্থী হলে কিংবা কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ নির্বাচনে নামলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রূপ নিতে পারে সংঘাতে। এমন আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিরোধী দলের নেতারা। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নজরদারি চলছে; সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হলে নেওয়া হবে সাংগঠনিক ব্যবস্থা।

  • প্রতীকহীন নির্বাচনেও দলীয় প্রভাব
  • প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যস্ত রাজনৈতিক দলগুলো
  • বিএনপির কোন্দল নিয়ন্ত্রণ ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ

সরকারের পক্ষ থেকে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বিরোধীদের প্রশ্ন, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতটা হবে? নির্বাচনী প্রচারে বাধা, পোস্টার ছেঁড়ার অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। ফলে এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার লড়াই নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, সরকারের নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতারও পরীক্ষা হয়ে উঠছে।

একক প্রার্থী নিয়ে বিএনপির কঠোর অবস্থান
বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে চেয়ারম্যান, মেম্বার ও অন্যান্য পদে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় গঠন করা হয়েছে চার সদস্যের বিশেষ কমিটি। কমিটিতে রয়েছেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ এবং বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে কমিটির পরিধি বাড়ানো হতে পারে।

প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ে জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ, গোপন জরিপ এবং তৃণমূলের মতামত নেওয়ার উদ্যোগও চলছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জানিয়েছেন, তাঁর এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, যাতে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রার্থী নির্ধারণ করা যায়। তাঁর দাবি, একই এলাকায় একাধিক প্রার্থী রাখবে না দল।

সিরাজগঞ্জে ৮৩টি ইউনিয়নে তিন সদস্যের মনিটরিং কমিটি গঠন করেছে জেলা বিএনপি। জেলা সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু জানিয়েছেন, এসব কমিটি সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান যাচাই করে কেন্দ্রকে তথ্য দেবে। কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে তাঁকে সমর্থন না দেওয়ার পাশাপাশি সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় নেতাদের সবাইকে সন্তুষ্ট রেখে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হবে। কেন্দ্রের মনোনয়ন বা সমর্থন না পেয়ে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে দলীয় সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিরোধীদের শঙ্কা, ভোটের মাঠে উত্তাপ বাড়তে পারে
বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধকে সম্ভাব্য সংঘাতের কারণ হিসেবে দেখছে বিরোধী দলগুলো। তাদের আশঙ্কা, স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য ও প্রার্থী হওয়ার প্রতিযোগিতা থেকেই সহিংসতার সূত্রপাত হতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের প্রচার বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে নির্বাচনী পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রার্থী শেখ ফজলুল করীম মারুফ জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশনগুলোর পাশাপাশি ওয়ার্ড পর্যায়েও প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তাঁর অভিযোগ, কিছু এলাকায় তাঁদের পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং এ ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াতের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই অবশ্য প্রয়োজন।

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা সামনে এনেছেন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীনের আশঙ্কা, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধই নির্বাচনী সংঘাতের কারণ হতে পারে। এসব বক্তব্যে বিরোধীদের মূল উদ্বেগ স্পষ্ট—নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকলেই সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয় না; প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিরাপত্তা, প্রচারের স্বাধীনতা এবং ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট দেওয়ার পরিবেশও থাকতে হয়।

প্রতীক নেই, কিন্তু দলীয় প্রভাব থাকছেই
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এর ফলে আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী বাছাই ও সমর্থনের প্রস্তুতি বলছে, প্রতীক বাদ পড়লেও দলীয় প্রভাব নির্বাচনের বাইরে থাকছে না।

বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন দল নিজেদের প্রার্থী প্রস্তুত করছে। জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রার্থীও ঘোষণা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিএনপির রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যেও স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে পুরোপুরি অভিন্ন অবস্থান তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ জানিয়েছেন, নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে যৌথভাবে নাকি আলাদাভাবে অংশ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে আলোচনা বাকি রয়েছে। গণঅধিকার পরিষদ অবশ্য নিজস্ব অবস্থান থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। এতে জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সমঝোতা স্থানীয় নির্বাচনে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই জোটে থাকা দলগুলোর মধ্যে স্থানীয় আসন ও প্রার্থী নিয়ে প্রতিযোগিতা দেখা দিলে নির্বাচনী সমীকরণ আরও জটিল হতে পারে।

সরকারের আশ্বাস, নজরদারিতে বাস্তব পদক্ষেপ
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, নির্বাচনে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। ভোটাররা স্বাধীনভাবে পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে পারবেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের দলীয় পরিচয়ের কারণে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন সরকারের এই প্রতিনিধি। তবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তব পদক্ষেপই নির্বাচনী আস্থা তৈরিতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রচারে সমান সুযোগ, সংঘাতপ্রবণ এলাকায় আগাম নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা না গেলে সরকারের আশ্বাস প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগামী ২১ জানুয়ারি শুরু করে পাঁচ ধাপে সম্পন্ন করার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। এই সময়সূচি সামনে রেখে কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রতিটি এলাকায় সমান মানের নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন।

নির্ধারক হবে শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতা
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্পষ্ট দুটি প্রবণতা হলো—প্রার্থী বাছাইয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ। বিএনপি একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে পারবে কি না, কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত তৃণমূলে কতটা কার্যকর হবে এবং বিরোধীরা কতটা বাধাহীনভাবে প্রচার চালাতে পারবে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হলে বিএনপিসহ সব দলকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। একই সঙ্গে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে প্রমাণ করতে হবে, প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো পক্ষই প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে না। কারণ, দলীয় প্রতীক না থাকলেই নির্বাচন সংঘাতমুক্ত হয় না। বরং স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা, ব্যক্তিগত প্রভাব ও দলীয় সমর্থনের লড়াই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে প্রতীকহীন নির্বাচনেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হবে রাজনৈতিক দলগুলোর শৃঙ্খলা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং ভোটারদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার বাস্তব সুযোগ দিয়ে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমকে