খুঁজুন
                               
, ,
           

মনপুরার দু:খগাঁথা নিয়ে নৌপরিবহন উপদেষ্টার ক্ষোভ, লঞ্চঘাট আধুনিকায়নে একগুচ্ছ উদ্যোগ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: শনিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৫, ১০:০৫ অপরাহ্ণ
মনপুরার দু:খগাঁথা নিয়ে নৌপরিবহন উপদেষ্টার ক্ষোভ, লঞ্চঘাট আধুনিকায়নে একগুচ্ছ উদ্যোগ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:

সবুজ শ্যামল ঘেরা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি রূপালী দ্বীপ মনপুরা। ভোলা জেলার মূল ভুখণ্ড থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন! এখানে নদী আর সাগরের মিতালীর অপরূপ সৌন্দর্য মানুষকে মুগ্ধ করে। মাইলের পর মাইল বৃক্ষের সবুজের সমাহার যেন ক্যানভাসে আঁকা শিল্পীর নিপুণ হাতে ছোঁয়া। যেখান থেকে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের দৃশ্য উপভোগ করাসহ সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দেখতে পর্যটকেরা ভিড় জমায়। তবে আক্ষেপের বিষয় মনপুরায় মেঘনা নদীর ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হয়নি আজও। পতিত সরকারের সময়ে নদীর এক পাশে জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করলেও কাজের কাজ হয়নি কিছুই।

পুরো বিষয়টি নজরে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড.এম সাখাওয়াত হোসেন এর। শনিবার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে ভোলার মনপুরা উপজেলার হাজিরহাট ঘাট পরিদর্শনের পর স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ‘সাগর কন্যা’ খ্যাত এই উপজেলার দু:খগাঁথা নিয়ে রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা। মতবিনিময় সভায় তিনি বলেছেন, ‘বিগত সরকারের আমলে বিচ্ছিন্ন মনপুরা উপজেলায় নদীভাঙন বন্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পাস হয়েছে। কিন্তু এখনো মনপুরায় নদীভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি।…এই দেশের কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়ে গেছে। এই টাকাগুলো দেশে থাকলে দেশ অনেক উন্নত হতো। এখন কোনো উন্নয়ন করতে গেলে চিন্তা করতে হয়। দুর্নীতি তাদের রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে।’ এজন্য আগামী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন উপদেষ্টা।

জানা যায়, দু’দিনের সরকারি সফরে বর্তমানে ভোলায় রয়েছেন নৌপরিবহন ও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে আধুনিক লঞ্চ ঘাট ও জেটি প্রকল্পের স্থান পরিদর্শনে টানা দু’দিনই সেখানে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেন উপদেষ্টা। সফরের প্রথম দিন শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) বিকেলে ভোলার দৌলতখান উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল লঞ্চঘাট, তজুমদ্দিন উপজেলার চৌমুহনী লঞ্চঘাট ও লালমোহন উপজেলার বাত্তিরখাল লঞ্চঘাট পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় তিনি নৌপথে চাঁদাবাজি বন্ধের পাশাপাশি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ ও কোস্টগার্ডকে যৌথভাবে কাজ করার নির্দেশনা প্রদান করেন।

আগামী দিনে চোরদের নির্বাচিত না করার পরামর্শ
সফরের দ্বিতীয় দিনে শনিবার (১৮ জানুয়ারি) সকাল ১০টার দিকে মনপুরা উপজেলার কলাতলী ইউনিয়নের ঢালচরে নতুন একটি লঞ্চঘাটের উদ্বোধন করেন উপদেষ্টা ড.এম সাখাওয়াত হোসেন। পরিদর্শন করেন একই উপজেলার রামনেওয়াজ ঘাট। পরে উপজেলার হাজিরহাট ঘাট পরিদর্শনের পর স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা হয়তো আর বেশি দিন নেই। আগামী নির্বাচনে কোনো চোরদের নির্বাচন করিয়েন না। আপনারা সব দেখেছেন এবং জানেন। আমার দুঃখ লাগে, এই দেশের কোটি কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার হয়ে গেছে। এই টাকাগুলো দেশে থাকলে দেশ অনেক উন্নত হতো।’

একটি দেশে উন্নয়ন বলতে কেবল শহরের রূপান্তরকেই বুঝায় না। উন্নয়ন শব্দটি গ্রামের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ‘উন্নয়ন’ শব্দটিকে ব্যবহার করে কেবলই নিজেদের আখের গুছিয়েছে বিগত সরকার। উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রান্তিক অঞ্চল থেকেছে বঞ্চিত আর অবহেলিত। ভোলা সফরকালে এই বৈষম্য দৃষ্টিতে এসেছে নৌপরিবহন ও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন এর। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সার্বিক ব্যবস্থা ও সেবার মানে কোন উন্নতি পরিলক্ষিত না হওয়ায় প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন বলতে যেটা বোঝায়, সেটি হচ্ছে প্রান্তিক অঞ্চলের উন্নয়ন। বিগত দিনে প্রান্তিক অঞ্চলের উন্নয়ন হয়নি। বিগত সরকারে যারা ছিল, তারা নিজেদের মধ্যে টাকা লুটপাট করার জন্য বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তাই প্রান্তিক অঞ্চলের উন্নয়ন হয়নি। ফলে দেশেরও উন্নয়ন হয়নি।’

ভোলার লঞ্চঘাট আধুনিকায়নে একগুচ্ছ উদ্যোগ
ভোলার প্রধান সমস্যা নদী ভাঙন। বর্ষা মৌসুমে সমুদ্র উত্তাল থাকে। নদী পারাপারে স্থানীয় জনসাধারণের নানাবিধ সমস্যার মুখে পড়তে হয়। ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় নদী। এখানে যাত্রীসেবার মান নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন। সরকার গিয়ে সরকার এলেও লঞ্চঘাটগুলোর সমস্যা সমাধানে নেওয়া হয়নি কার্যকর কোন উদ্যোগ। ভোলার লঞ্চঘাটগুলোকে মানসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেছেন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি এসব লঞ্চঘাটে যাত্রী ছাউনি থেকে শুরু করে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘ভোলার চারপাশে নদী। এই দ্বীপ জেলা ভোলায় যে ঘাটগুলো আছে, তা মানসম্পন্ন ও পর্যাপ্ত নয়। ঘাটগুলোতে তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় না। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভোলায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বেশ কিছু ঘাটের পুন:নির্মাণ করা হচ্ছে। ভোলার লঞ্চঘাটগুলোতে যাত্রীছাউনিসহ আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে। যাতে ঝড়-বৃষ্টিতে লঞ্চের যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে না হয়।’

মতবিনিময় সভায় ও ঢালচরে লঞ্চঘাটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাবেক জ্বালানি সচিব মো. নাজিম উদ্দিন চৌধুরী, বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমডোর আরিফ আহমেদ মোস্তফা, ভোলার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আজাদ জাহান, মনপুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পাঠান মোহাম্মদ সাইদুজ্জামান, মনপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহসান কবির, উপজেলা বিএনপির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিন বাচ্চু চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

লঞ্চঘাটগুলোতে অরাজকতা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা
যাত্রীদের জিম্মি বানানোর ‘উৎকৃষ্ট’ উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে ওঠে এসেছে বিভিন্ন লঞ্চঘাট। দেশের লঞ্চঘাটগুলোতে ইজারা নিয়ে অনিয়মের ঘটনা, স্থানীয় রাজনীতির প্রভাব ও নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। ঘাটগুলো নিয়ন্ত্রণে ইজারাদার ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা মিলে গড়ে ওঠেছে একটি চক্র। এই চক্রই ঘাটগুলোকে ঘিরে অরাজকতা তৈরি করছে প্রতিনিয়ত। এমন সব অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলেছেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা। শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) বিকেলে ভোলার দৌলতখান উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল লঞ্চঘাট, তজুমদ্দিন উপজেলার চৌমুহনী লঞ্চঘাট ও লালমোহন উপজেলার বাত্তিরখাল লঞ্চঘাট পরিদর্শনকালে উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা যত দিন আছি, তত দিন লঞ্চঘাটগুলোতে অরাজকতা সৃষ্টি হতে দেব না। লঞ্চঘাটগুলোতে যে অরাজকতা হয়, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

‘ভবিষ্যতে যারা সরকারে ক্ষমতায় আসবে, আশা করি তারা অতীত থেকে শিক্ষা নেবে’- এমন মন্তব্য করে তিনি সেদিন আরও বলেন, ‘ঘাটের ইজারাদারদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাঁচ টাকার ঘাটের টিকিটের স্থানে ১০ টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ বিষয়ে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। কেননা এখন আর আগের সেই স্বৈরাচারী সরকার নেই। স্বৈরাচারী সরকারের সময় যা খুশি তা করেছে, সেটা যেন এখন আর না হয়।’

কালের আলো/এমএএএমকে

পাবনা-টেকনাফ-কলমাকান্দায় পানিতে ডুবে ৬ শিশুর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৪ অপরাহ্ণ
পাবনা-টেকনাফ-কলমাকান্দায় পানিতে ডুবে ৬ শিশুর মৃত্যু

দেশের তিন জেলায় পানিতে ডুবে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) পাবনা, কক্সবাজার ও নেত্রকোনায় পৃথক এসব দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে পাবনায় তিন শিশু, কক্সবাজারের টেকনাফে দুই শিশু এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

পাবনায় তিন শিশু

পাবনা সদর উপজেলার চরতারাপুর ইউনিয়নের নবীন বাজার এলাকার দাশপাড়া গ্রামে বাড়ির পাশের মাঠে জমে থাকা বর্ষার পানিতে গোসল করতে গিয়ে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার দুপুর ২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলো—দাশপাড়া গ্রামের শিমুল মল্লিকের মেয়ে সুমি খাতুন (৭) এবং একই গ্রামের আশরাফুল ইসলামের ছেলে খালিদ হোসেন (৮) ও মেয়ে আফিয়া খাতুন (৬)। তারা স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থী ছিল।

স্থানীয়রা জানান, দুপুরে শিশুরা মাঠের জমে থাকা পানিতে গোসল করতে নামে। একপর্যায়ে একজন পানিতে তলিয়ে গেলে তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে বাকি দুজনও পানিতে ডুবে যায়। পরে স্থানীয়রা তিন শিশুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলে পথেই তাদের মৃত্যু হয়।

টেকনাফে নাফ নদীতে দুই শিশু

কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপে নাফ নদীতে গোসল করতে নেমে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জেটিঘাট এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলো—শাহপরীরদ্বীপ উত্তরপাড়া এলাকার মোহাম্মদ উল্লাহর ছেলে মোহাম্মদ নিশান (১২) ও কেফায়েত উল্লাহর ছেলে আরজিন (১০)।

তারা গোসল করতে নেমে পানিতে তলিয়ে নিখোঁজ হয়। স্থানীয় বাসিন্দা, জেলে ও পরে কোস্টগার্ড সদস্যরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। প্রায় চার ঘণ্টা পর দুপুর ২টার দিকে তাদের উদ্ধার করা হয়। আরজিনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। নিশানকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

কলমাকান্দায় শিশুর মৃত্যু

নেত্রকোনার কলমাকান্দায় পুকুরের পানিতে ডুবে আব্দুল্লাহ নামে সাড়ে চার বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার উপজেলার চিনাহালা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

নিহত আব্দুল্লাহ ওই এলাকার কাজল মিয়ার ছেলে। পরিবারের লোকজনের অজান্তে খেলতে গিয়ে সে পুকুরে পড়ে যায়। পরে স্বজনরা উদ্ধার করে কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পৃথক এসব দুর্ঘটনায় তিন এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

ব্যাংক খাতে বাড়ছে ‘নীরব’ ঝুঁকি

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:২৫ অপরাহ্ণ
ব্যাংক খাতে বাড়ছে ‘নীরব’ ঝুঁকি

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ও শ্রেণিকৃত ঋণের চাপ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; এটি ক্রমেই পুরো আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। একদিকে বাড়ছে সমস্যাগ্রস্ত ঋণ, অন্যদিকে এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না অনেক ব্যাংক। ফলে কাগজে-কলমে ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার আড়ালে প্রকৃত ঝুঁকি আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুন ২০২৬ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন ও বাস্তবে সংরক্ষিত প্রভিশনের মধ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর মোট শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা।

শ্রেণিকৃত ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। জুনে তা বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন শ্রেণিকৃত। ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এত বড় অংশের ঋণ সমস্যাগ্রস্ত হয়ে পড়া শুধু ব্যাংকের মুনাফাকে চাপের মুখে ফেলছে না, বরং নতুন ঋণ বিতরণ, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

প্রভিশনের অর্ধেকও সংরক্ষণ হয়নি
খেলাপি বা শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে সম্ভাব্য ক্ষতি সামাল দিতে ব্যাংককে আগেই অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। এর উদ্দেশ্য হলো—ঋণ শেষ পর্যন্ত আদায় না হলে যেন একবারে বড় ধাক্কা না আসে। কিন্তু এখানেই বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। বিপরীতে বাস্তবে সংরক্ষণ করা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ফলে প্রয়োজনীয় ও প্রকৃত প্রভিশনের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সম্ভাব্য ঋণক্ষতির যে পরিমাণ অর্থ ব্যাংকগুলোর আলাদা করে রাখার কথা, তার অর্ধেকের কিছু বেশি সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে ব্যাংকগুলোর মুনাফার বড় অংশ ভবিষ্যৎ লোকসানের বিপরীতে আটকে রাখতে হবে। দুর্বল আয়, কম মূলধন ও বেশি খেলাপি ঋণের ব্যাংকগুলোর জন্য তা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

বড় ঘাটতিতে বেসরকারি ব্যাংক
প্রভিশন ঘাটতির সবচেয়ে বড় অংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে। এ খাতের ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় প্রভিশনের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। বিপরীতে প্রকৃত প্রভিশন সংরক্ষণ হয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। ফলে বেসরকারি ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। মার্চে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট প্রভিশন ঘাটতির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। ফলে বেসরকারি ব্যাংক খাতেই বর্তমানে সবচেয়ে বড় আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেশি এবং আয় কম, তাদের জন্য এই ঘাটতি পূরণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেও বড় চাপ
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ৭৪ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। মার্চ ২০২৬ শেষে এ ঘাটতি ছিল ৭৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খুব বেশি না বাড়লেও ঘাটতির পরিমাণ ইতোমধ্যে বিপুল।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে শেষ পর্যন্ত সরকারি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের দুর্বলতার বোঝা সরাসরি রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা ও জনগণের অর্থের ওপর পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল
একটি ব্যাংক যখন ঋণ দেয়, তখন সেটি ধরে নেয় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওই অর্থ ফেরত আসবে। কিন্তু কোনো ঋণ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেলে ব্যাংককে সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়। ধরা যাক, কোনো ব্যাংকের ১০০ কোটি টাকার ঋণের বড় অংশ আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে। ভবিষ্যতে ওই অর্থ ফেরত না এলে ব্যাংক যেন হঠাৎ বড় লোকসানে না পড়ে, সে জন্য আগেই অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়।

প্রয়োজনীয় প্রভিশন না থাকলে ব্যাংকের হিসাবের খাতায় মুনাফা তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য লোকসানও জমতে থাকে। ফলে প্রভিশন ঘাটতি মূলত ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপর একটি ‘স্থগিত চাপ’ তৈরি করে।

ছাড়ের নীতি সমস্যা আরও বাড়াচ্ছে
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, মূলধন ঘাটতির বড় কারণ খেলাপি ঋণ। তবে প্রকাশিত ঘাটতিও প্রকৃত চিত্রের পুরোটা তুলে ধরে না বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, অনেক ব্যাংক দেন-দরবারের মাধ্যমে মূলধন ঘাটতি শিথিল করে। একইভাবে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের নানা নীতিগত ছাড় দেওয়া হচ্ছে।ব্যাংকগুলোও ঋণগ্রহীতার তথ্য যথাযথভাবে যাচাই, তদারকি ও ঝুঁকি মূল্যায়নে প্রয়োজনীয় কঠোরতা দেখাচ্ছে না।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, এক দশকের বেশি সময় ধরে এ ধরনের শিথিলতার পথ অনুসরণ করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। বরং একসময় যে খেলাপি ঋণকে এক অঙ্কে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল, তা এখন স্বীকৃত হিসাবেই মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে। স্বীকৃত নয় এমন সমস্যাগ্রস্ত ঋণ বিবেচনায় নিলে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

আমদানি-রপ্তানিতেও প্রভাব
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা কমে গেলে আমদানি-রপ্তানি লেনদেনে ঝুঁকি ও ব্যয় দুটিই বাড়তে পারে। ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এমন পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে অনাস্থা তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের রিস্ক প্রিমিয়াম এমনিতেই বিশ্বের মধ্যে উচ্চ—ব্যাংক খাতের দুর্বলতা আরও প্রকট হলে সেই ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংস্কার না হলে ছড়িয়ে পড়বে ঝুঁকি
ব্যাংক খাতের বর্তমান চিত্রের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—সমস্যাটি শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নেই। ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রভিশন ঘাটতি বলছে, সম্ভাব্য ক্ষতির একটি বড় অংশ এখনো ব্যাংকের হিসাবের বাইরে চাপ হিসেবে জমে আছে। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমে যেতে পারে, মূলধন আরও দুর্বল হতে পারে এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে।

কালের আলো/এম/এএইচ

দেশের ভবিষ্যতের জন্য যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:২১ অপরাহ্ণ
দেশের ভবিষ্যতের জন্য যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে: তথ্যমন্ত্রী

দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে টেকসই করতে ভালো ও সৎ মানুষের রাজনীতিতে আসা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান।

তিনি বলেন, ভালো রাজনীতিবিদ তৈরি করতে না পারলে দেশের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে যত স্বপ্নই দেখা হোক, তা টেকসই হবে না। মানসম্মত উন্নয়নের জন্য যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব প্রয়োজন।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সংসদ ভবনের এলডি হলে বরিশাল ডিভিশনাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিডিজেএ) আয়োজিত ‘আগামীর বরিশাল বিভাগ: সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।

আন্দালিভ রহমান বলেন, ‘কোয়ালিটি ডেভেলপমেন্ট’ নিশ্চিত করতে হলে ভালো মানুষকে নেতৃত্বে আনতে হবে। গত ১৭ বছরে দেশে নেতৃত্বের বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ভালো ও মেধাবী তরুণরা রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেছে এবং রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এমনকি অনেক রাজনীতিবিদের সন্তানও রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী নয়।

তিনি বলেন, ভালো উপাদান থাকলেও দক্ষ বাবুর্চি ছাড়া যেমন ভালো খাবার তৈরি করা যায় না, তেমনি ভালো মানুষ নেতৃত্বে না এলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির সুফল টেকসই করা সম্ভব নয়।

বরিশালের ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, ফুটবল, রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বরিশাল ও এ অঞ্চলের মানুষ দেশের নেতৃত্ব দিয়েছে। পাকিস্তান আমল থেকে স্বাধীনতার পর পর্যন্ত এ অঞ্চল থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা উঠে এসেছেন।

তিনি বলেন, বরিশালকে সত্যিকার অর্থে স্বপ্নের নগরী ও স্বপ্নের শহরে পরিণত করতে হলে আগামী দিনে ভালো রাজনীতিবিদ তৈরি করতে হবে। এজন্য বরিশালসহ আশপাশের নির্বাচনি এলাকা ও জেলাগুলো থেকে মেধাবী তরুণ-তরুণীদের রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত করতে হবে এবং অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্যাস সরবরাহ ও শিল্পায়ন উন্নয়নের অংশ হলেও দেশের এখন প্রয়োজন মানসম্মত ও টেকসই উন্নয়ন। আর এ জন্য যোগ্য ও সৎ নেতৃত্ব অপরিহার্য।

তিনি বলেন, যারা বর্তমানে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছেন, তাদের দায়িত্ব হলো পরবর্তী প্রজন্মের যোগ্য ও মেধাবীদের রাজনীতিতে আসার পথ তৈরি করা। তরুণদের রাজনীতিতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাদের জন্য পরিবেশ সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ করতে হবে।

আন্দালিভ রহমান বলেন, আমরা হয়তো অনেক কিছু তৈরি করে যেতে পারব, কিন্তু ভালো নেতৃত্ব তৈরি করতে না পারলে সেগুলো ধরে রাখা সম্ভব হবে না। তাই ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

বরিশাল থেকে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকসহ অনেক বড় নেতা উঠে এসেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও এ অঞ্চল থেকে যোগ্য ও ভালো নেতৃত্ব সামনে আসতে হবে। দেশের মেধাবী ও শিক্ষিত তরুণদের কেউ চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী বা সফটওয়্যার প্রকৌশলী হওয়ার পাশাপাশি রাজনীতিতে এসে দেশ পরিবর্তনের প্রত্যয় ব্যক্ত করলে সেটিই হবে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি