খুঁজুন
                               
, ,
           

সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন সূর্যোদয়, নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:১৫ অপরাহ্ণ
সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন সূর্যোদয়, নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান

মো.শামসুল আলম খান, কালের আলো:

দলীয় রাজনীতির ভেতরের প্রথম পাঠ নিয়েছিলেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মমতাময়ী মা বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকেই। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী থেকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়ে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন। কৈশোরে পিতৃহত্যা, যৌবনে কারাবাস, সেখান থেকে দীর্ঘ নির্বাসন অত:পর দেশে ফেরা, মাকে হারানোর শোক বুকে চাপা দিয়ে দলকে নেতৃত্বে দিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়। এরপর দেশের হাল ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান আজ দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর অবস্থান। মায়ের পথ অনুসরণ করে, কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতার আলোয় গড়া এক ভিন্ন অধ্যায়ের সূচনা করলেন তিনি। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের এক নতুন সূর্যোদয় ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তারেক রহমানের যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত উত্থান-পতনের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিরই প্রতিচ্ছবি-যেখানে শোক শক্তিতে রূপ নেয়, নির্বাসন প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন জাগায়, আর ইতিহাস কখনও সরলরেখায় এগোয় না। নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার দোরগোড়ায়-এই পথচলা প্রমাণ করে, রাজনৈতিক জীবনে শেষ শব্দ বলে কিছু নেই। কখনও কখনও দীর্ঘতম রাতের পরই ভোর সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কোনো সিদ্ধান্ত বা পরিবর্তন সরাসরি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাম্প্রতিক অধ্যায় নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন পার করে দেশে ফেরার মাত্র ১ মাস ২৫ দিন পরই দলের চেয়ারপারসন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত হয়েছেন, যা রাজনৈতিক মহলের চোখে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার নতুন সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে মায়ের সঙ্গে রাজপথে সক্রিয় হন তারেক রহমান। ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিএনপির পুনরুত্থানের সময় তিনি সংগঠনের তৃণমূলে কাজ করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে স্থানীয় সমস্যা ও সুশাসন নিয়ে গবেষণার জন্য ঢাকায় একটি রাজনৈতিক অফিস স্থাপন করেন; যা পরে ‘হাওয়া ভবন’ নামে পরিচিত হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠনের পর আনুষ্ঠানিক পদে না থাকলেও তিনি হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী সংগঠক। ২০০২ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে উন্নীত হন। সমর্থকেরা বলেন, তিনি ছিলেন আধুনিক সাংগঠনিক রাজনীতির স্থপতি; সমালোচকেরা বলেন, ‘ক্ষমতার অদৃশ্য কেন্দ্র’। এই দ্বৈত ভাবমূর্তিই তার রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পরিচয় তৈরি করে।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার সময় দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান। একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাবন্দি হন। বিএনপি অভিযোগ করে, রিমান্ডে নির্যাতনে তার শারীরিক অবস্থা ভেঙে পড়ে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে জামিনে মুক্তি পেয়ে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমাকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান, যা পরিণত হয় প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসনে। এ সময়ে দেশে বিএনপি পড়ে ইতিহাসের অন্যতম দুঃসময়ে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে পরাজয়, আন্দোলনে দমন-পীড়ন, খালেদা জিয়ার কারাবাস; সব মিলিয়ে দলটি কার্যত নেতৃত্বহীন হয়ে পড়ে। সেই শূন্যতা পূরণ করেন লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমানই। ভিডিও কনফারেন্সে বৈঠক, নির্দেশনা ও বক্তব্য দিয়ে তিনি দূর থেকেই দল পরিচালনা করেন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। নির্বাসনেই থেকে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রাখেন; যা পরে তার প্রত্যাবর্তনের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়। মামলার সাজা বাতিল ও আইনি বাধা দূর হলে দেশে ফেরার পথ খুলে যায় তারেক রহমানের। ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন তিনি লাখো কর্মী-সমর্থকের অভ্যর্থনায়। সেদিন রাজধানীতে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি যেন জানিয়ে দেয়-নির্বাসনের অধ্যায় শেষ, শুরু নতুন পথচলা। কিন্তু নির্মম নিয়তি আবারও আঘাত হানে। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মারা যান খালেদা জিয়া। একদিকে মায়ের শোক, অন্যদিকে দলের পূর্ণ দায়িত্ব-দুইয়ের ভার কাঁধে নিয়ে তিনি সামনে এগিয়ে যান। শোক ও দায়িত্ব একসঙ্গে কাঁধে নিয়ে ৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান হন তিনি।

নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর বিএনপির সাংগঠনিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সিলেট থেকে তারেক রহমান জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। পরে তিনি বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় জনসভায় অংশ নেন। নির্বাচনের দুই দিন আগে রাজধানীতে ১৪টি পথসভায় অংশ নিয়ে সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রচারপর্বে তিনি ধর্ম, দল ও মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং স্থানীয় সমস্যা ও প্রত্যাশা শোনেন। দলীয় নেতারা দাবি করেন, এই সরাসরি যোগাযোগ ভোটারদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করে এবং নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯৭ আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয় পায়, যা দলটির জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে। এই প্রথম তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। তিনি ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে তিনিই প্রধানমন্ত্রী পদে বসছেন।

 

নির্বাচনের ফলাফলের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন ও গেজেট প্রকাশের পর মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে শপথ বাক্য পাঠ করান দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন। সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথ আয়োজন এই প্রথম। এর মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এক পরিবারের তিন সদস্য রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব নেওয়ার ঘটনাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের জন্য তিনি দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন। তার নেতৃত্বে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন জুলাই যোদ্ধাদের হাতে গড়ে উঠা নতুন বাংলাদেশকে। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, প্রবাসে নেতৃত্ব, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং নির্বাচনী বিজয়; সব মিলিয়ে তারেক রহমারের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেশের নজর থাকবে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তার নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হয়, তার দিকে।

নির্বাচন জয়ের পর প্রথম বক্তব্যে তারেক রহমান জানান, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে সরকারের মূল লক্ষ্য। প্রতিশোধের রাজনীতি নয়; ন্যায়পরায়ণতা ও জবাবদিহিতার রাষ্ট্র গড়ার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হবে। সরকারি-বিরোধী সব নাগরিকের জন্য আইন সমান। নির্বাচনকালীন বিরোধ যেন প্রতিহিংসায় না রূপ নেয়, এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, ‘প্রতিশোধ দিয়ে ভালো কিছু আসে না। এখন দেশের জন্য প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।’ তিনি ভিন্নমত ও ভিন্ন দলের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের মতোই এবার দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহিমূলক শাসন প্রতিষ্ঠায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’ দেশে ফেরার পর বাসের ভেতর থেকে সড়কজুড়ে ভিড় করা জনতার উদ্দেশে তারেক রহমানের হাত নাড়ার দৃশ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নেয় ।

নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় তারেক রহমানের এই যাত্রা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। কখনও কখনও দীর্ঘতম রাতের পরই সবচেয়ে উজ্জ্বল ভোর আসে। তিনিই এখন বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। যার শপথ হয়ে গেলো ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। ইতিহাসে অবিস্মরণীয় একদিন।

কালের আলো/এমএসএকে

 

খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ
খাদ্যগুদাম প্রকল্পে শুধু সময়ই বাড়ে

খাদ্যশস্য রাখার জায়গা বাড়াতে একের পর এক প্রকল্প। বরাদ্দ হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয়, তবু বাড়ছে না কাঙ্ক্ষিত সংরক্ষণ সক্ষমতা। কোথাও তিন বছরেও কাজ এগিয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ, কোথাও এক যুগ পেরিয়েও শেষ হয়নি নির্মাণ। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া একটি প্রকল্পে মাটি খোঁড়ার পরই থেমে গেছে কাজ। পরে যৌক্তিকতা না পাওয়ায় সেটি অসমাপ্ত রেখেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি খাদ্যগুদামের সক্ষমতা বাড়ানোর নামে নেওয়া চার প্রকল্পে মোট ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, দফায় দফায় সংশোধন, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং কোথাও কোথাও স্থান পরিবর্তনের কারণে এসব বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি কাটাতে গিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও এখন সামনে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য এবং পরিকল্পনা কমিশন ও বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষণে এসব চিত্র উঠে এসেছে।

তিন বছরেও এক-চতুর্থাংশ কাজ
২০২৩ সালের জুলাইয়ে ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩ জেলায় নতুন খাদ্যগুদাম নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। ১৪৫টি স্থাপনায় মোট ১৯৫টি গুদাম নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক ব্যয় ৮১৪ কোটি টাকা থাকলেও পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫৫ কোটি টাকা। শুধু ব্যয়ই বাড়েনি, বেড়েছে সময়ও। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। আইএমইডির হিসাবে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২১ দশমিক ১১ শতাংশ। এরই মধ্যে ব্যয় হয়েছে ১৭৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আইএমইডির পর্যবেক্ষণে মাদারীপুরের কালকিনি ও বাগেরহাট প্যাকেজে ধীরগতি দেখা গেছে। গাছ ও পুরোনো অবকাঠামো সরাতেও সময় লেগেছে। শরীয়তপুরের আঙ্গারিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ও বিরল এবং মোংলা এলএসডিতে জায়গার সংকট রয়েছে। এ ছাড়া লে-আউট জটিলতা, প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন, প্রশাসনিক অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়াতেও বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক মো. সোহেলুর রহমান খান বলেন, সময়মতো পরিচালক নিয়োগ না হওয়া, নির্ধারিত স্থানে কাজ করতে না পারা, স্থান পরিবর্তন এবং রেট শিডিউলের কারণে ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন প্রকল্প পরিচালক টেন্ডারের উদ্যোগ নিলেও কাজ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা তিনি দাবি করেন, আগের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রকল্পের কার্যক্রম এখন সন্তোষজনকভাবে এগোচ্ছে।

এক যুগেও শেষ হয়নি ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকার প্রকল্প
সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। ৩ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ লাখ ৮৭ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাতটি আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনার মহেশ্বরপাশা, চট্টগ্রাম ও মধুপুরে এসব সাইলো নির্মাণের কথা। প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। চার দফা সংশোধনের পর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও পুরো কাজ শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৯৫ দশমিক ০৫ শতাংশই খরচ হয়ে গেছে। তারপরও বাকি কাজ শেষ করতে আবারও মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, প্রকল্পের মূল কার্যালয় ঢাকার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।

রাজনৈতিক প্রকল্প, শেষ পর্যন্ত বাতিল
খাদ্য সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের নির্বাচনি এলাকা নওগাঁর মহাদেবপুরে ৩৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার চালের সাইলো নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটি পর্যালোচনায় আসে। এরপর দেখা যায়, ভূমি অধিগ্রহণ ও মাটি খোঁড়া ছাড়া বাস্তবে আর কোনো কাজ এগোয়নি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ছিল শূন্য। প্রকল্প পরিচালক মোস্তাক আহমেদ জানান, নতুন ফিজিবিলিটি স্টাডিতে মহাদেবপুরে প্রকল্পটি নেওয়ার যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি। ফলে অসমাপ্ত অবস্থায় রেখেই প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যে প্রকল্পের যৌক্তিকতাই শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল না, সেটির পেছনে প্রাথমিক পর্যায়ে ৩৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন কেন হয়েছিল?

মেরামতের প্রকল্পেও ধীরগতি
ক্ষতিগ্রস্ত খাদ্যগুদাম ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো মেরামতে ২৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি শেষ করার কথা। লক্ষ্য ছিল সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, খাদ্যশস্যের অপচয় কমানো, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি ৩২ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক এ টি এম কাউছার হোসেন জানান, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। ঠিকাদারদের বিলও আটকে রয়েছে।

সরকারি গুদাম বনাম বেসরকারি সক্ষমতা
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও সরকারি খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সরকারি গুদামে বর্তমানে প্রায় ২২ থেকে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য রাখা যায়। বিপরীতে বেসরকারি খাতের ধারণক্ষমতা প্রায় ১ কোটি টন। অর্থাৎ বিপুল সরকারি বিনিয়োগের পরও সংরক্ষণ সক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় গুদাম নির্মাণ টেকসই সমাধান নয়। সহজ শর্তে ঋণ, কর অবকাশ ও ভর্তুকির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে খাদ্য সংরক্ষণে যুক্ত করা যেতে পারে। তার মতে, প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়তে থাকলে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কাও তৈরি হয়। তাই ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্র, নির্মাণকাজের মান এবং অর্থ ব্যয়ে কঠোর নজরদারি জরুরি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারি কতটা?
খাদ্যশস্যের সরবরাহ ও মজুদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম কিংবা গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা। সম্প্রতি মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুর্যোগ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ রাখতে হবে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হলো, একদিকে খাদ্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ, অন্যদিকে সেই লক্ষ্যেই নেওয়া প্রকল্পের ধীরগতি। কোথাও ব্যয় বাড়ছে, কোথাও মেয়াদ; কোথাও আবার প্রকল্পের যৌক্তিকতাই প্রশ্নের মুখে। ৫ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার এই চার প্রকল্প তাই শুধু গুদাম নির্মাণের হিসাব নয়—এটি সরকারি প্রকল্প পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিরও পরীক্ষা। খাদ্য নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর খাতে জনগণের অর্থ খরচ করে যদি সময়মতো গুদামই না হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগের সুফল শেষ পর্যন্ত যাবে কোথায়—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্টদেরই দিতে হবে।

কালের আলো/এম/এএইচ

ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ: ত্রিশালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ঈশ্বরগঞ্জ

ময়মনসিংহ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:০৮ অপরাহ্ণ
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ: ত্রিশালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন ঈশ্বরগঞ্জ

ময়মনসিংহ থেকে ১৪ দলের দীর্ঘ লড়াই শেষে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের শিরোপা ঘরে তুলেছে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা দল। রোমাঞ্চকর ফাইনালে ত্রিশাল উপজেলা দলকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ঈশ্বরগঞ্জ।

শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টায় ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠা ম্যাচে দর্শকদের করতালি ও সমর্থকদের উচ্ছ্বাসে স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
ঈশ্বরগঞ্জের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন ১১ নম্বর জার্সিধারী রাব্বুল। তাঁর জোড়া গোলেই শিরোপা নিশ্চিত করে ঈশ্বরগঞ্জ। ত্রিশাল একটি গোল শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত সমতায় ফিরতে পারেনি। ফলে ২-১ গোলের জয় নিয়ে গোল্ডকাপ নিজেদের করে নেয় ঈশ্বরগঞ্জ।
ফাইনালের আগে ও ম্যাচ চলাকালে ঈশ্বরগঞ্জ দলের খেলোয়াড়দের উৎসাহ দিতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। তাঁর উপস্থিতি ও অনুপ্রেরণা খেলোয়াড়দের বাড়তি আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ঈশ্বরগঞ্জের রাব্বুল। অন্যদিকে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন ত্রিশালের ১০ নম্বর জার্সিধারী ফাহাদ। ফেয়ার প্লে ট্রফি পেয়েছে হালুয়াঘাট উপজেলা দল।
৭০ মিনিটের ফাইনাল দেখতে বিকেল থেকেই ময়মনসিংহ জেলা স্টেডিয়ামে ভিড় করেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। ম্যাচ শুরুর পর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় গ্যালারি। দুই দলের সমর্থকদের স্লোগান, উল্লাস ও করতালিতে পুরো স্টেডিয়ামে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ।
ফাইনাল শেষে বিজয়ী ঈশ্বরগঞ্জ ও রানার্সআপ ত্রিশাল দলের হাতে ট্রফি তুলে দেওয়া হয়। দুই দলের মধ্যে মোট এক লাখ ৫০ হাজার টাকার পুরস্কারও বিতরণ করা হয়।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনের সংসদ সদস্য ডা. মো. মাহাবুবুর রহমান এবং ঈশ্বরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু।

এ সময় বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা, খেলোয়াড়, কোচ, ম্যানেজার, ক্রীড়াপ্রেমী দর্শক ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহযোগিতায় গত ২৫ আগস্ট শুরু হয় এবারের জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট।

ময়মনসিংহ সদর উপজেলাসহ জেলার ১৪টি দল এতে অংশ নেয়। দীর্ঘ প্রতিযোগিতার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ফাইনালে ত্রিশালকে হারিয়ে শেষ হাসি হাসে ঈশ্বরগঞ্জ। রাব্বুলের জোড়া গোল ও দলের লড়াকু পারফরম্যান্সে গোল্ডকাপ এখন ঈশ্বরগঞ্জের ঘরে। শিরোপা জয়ের পথে খেলোয়াড়দের পাশে থেকে উৎসাহ-অনুপ্রেরণা জোগানো এমপি মাজেদ বাবুর ভূমিকাও প্রশংসা পেয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে দৃঢ় অঙ্গীকার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৬ অপরাহ্ণ
ভয়মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরিতে দৃঢ় অঙ্গীকার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর

সাংবাদিকদের স্বাধীন ও নির্ভয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকারের দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা পুনরায় উচ্চারণ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপি। তিনি বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং সাংবাদিকরা যেন কোনো ভয়ভীতি ছাড়াই নির্বিঘ্নে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সরকার সেই পরিবেশ নিশ্চিত করেছে।’ একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ গণমাধ্যমবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের অগ্রাধিকারকে আরও স্পষ্ট করেছে।

শুক্রবার (০৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলা পাবলিক হলে ‘রফিক হিলালী ইংলিশ এক্সিলেন্স প্রোগ্রাম-২০২৬’-এর ওরিয়েন্টেশন ক্লাস এবং এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

  • সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ
  • সাংবাদিক কল্যাণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ—গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করার প্রত্যাশা

একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিকাশে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের কোন বিকল্প নেই। জনগণের কথা বলা, অনিয়ম তুলে ধরা, রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই স্বাধীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে সরকার কাজ করছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর এমন পরিস্কার অবস্থানকে দেশের সাংবাদিকতার বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য গণমাধ্যম অঙ্গনেও একটি ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

সাংবাদিক কল্যাণে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ
সাংবাদিকদের পেশাগত ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণ ও বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের নির্ধারিত বাজেট বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে সাংবাদিক সমাজের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে সাংবাদিকতা পেশা নানা ধরনের অর্থনৈতিক ও পেশাগত চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকদের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কল্যাণমূলক কার্যক্রমে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে অসচ্ছল ও সংকটে থাকা সাংবাদিকদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের জন্যও তা বাস্তব সহায়তা তৈরি করতে পারে।

হলুদ সাংবাদিকতা ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধ
প্রতিমন্ত্রী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ ও অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধের কথাও বলেছেন। বিষয়টি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্যের দিকটি সামনে আনে। তিনি বলেছেন, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ ও অপসাংবাদিকতা রোধে পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখার কাজ চলছে।’

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি সংবাদ প্রকাশে তথ্যের যথার্থতা, নিরপেক্ষতা, পেশাগত নৈতিকতা ও জনস্বার্থের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীন সাংবাদিকতা কখনোই দায়িত্বহীন সাংবাদিকতার সমার্থক নয়। বরং স্বাধীনতা যত বেশি থাকবে, সাংবাদিকদের পেশাগত মান ও নৈতিকতার চর্চাও তত বেশি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। এতে করে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়াতে পারে।

হাওর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ভাবনা
এ সময় হাওর অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সুবিধা ও আলাদা একাডেমি ক্যালেন্ডার প্রণয়নের বিষয়ে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি একটি জাতীয় বিষয়। হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও পড়ালেখার সুবিধার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে এবং শিগগিরই ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তথ্য প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর এই বক্তব্য প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের বাস্তবতাভিত্তিক চিন্তার ইঙ্গিত দেয়। প্রতিমন্ত্রী বিষয়টিকে ‘জাতীয় বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন—এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সমস্যাকে শুধু স্থানীয় সমস্যা হিসেবে না দেখে জাতীয় শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে বিবেচনার বার্তা মিলেছে।

শিক্ষার্থীদের মানবিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু জিপিএ-৫ বা ভালো ফলাফল অর্জন করলেই চলবে না, শিক্ষার্থীদের মানবিক ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। পরিবার, শিক্ষক ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নৈতিকতার চর্চা করলেই প্রকৃত সাফল্য আসবে।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভালো ফলাফলের পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের চর্চার ওপর প্রতিমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ শিক্ষার বৃহত্তর উদ্দেশ্যকে সামনে এনেছে। পরিবার, শিক্ষক ও দেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক না রেখে চরিত্র ও মূল্যবোধ গঠনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি দৃষ্টিভঙ্গি বলে মনে করছেন অনেকেই।

তথ্য প্রতিমন্ত্রী জানান, তৃণমূলের যুবসমাজকে খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করতে মাঠের আধুনিকায়ন করা হচ্ছে এবং অনলাইনে ও টিভিতে চাইনিজ ও অ্যারাবিক ভাষা শিক্ষার বিশেষ কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে।

নেত্রকোণা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ময়মনসিংহ-৮ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা, কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা চৌধুরী এবং জেলা প্রেসক্লাবের সম্পাদক মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম।

কালের আলো/এম/এএইচ