প্রধানমন্ত্রী হয়েও জনতার কাতারে তারেক রহমান
কালের আলো রিপোর্ট:
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের ইতি টেনে দেশে ফিরেই রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের চিরায়ত সব রেওয়াজ ভাঙতে শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কখনও ইমামকে চেয়ার এগিয়ে দিয়েছেন নিজেই। জনসভায় বক্তব্যের মধ্যেই মঞ্চে ডেকে সাধারণ নাগরিকের মতামত জেনেছেন। তাদের সঙ্গে কথোপকথনের চমক এনেছিলেন। এলাকার সমস্যার কথা শুনেছেন, সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, প্রশ্ন করেছেন আবার উত্তরও দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন নেতা কেবল নিজেই কথা বলেন না সাধারণ মানুষের কথাও তিনি শোনেন। কেউ কেউ সম্ভবত মনেই করেছিলেন এসব ভোট টানার কৌশল। কিন্তু চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের পরও একের পর এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন দেশের ১১তম এই প্রধানমন্ত্রী। ভোটে বিএনপির কাছে পরাজিত জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শীর্ষ নেতাদের বাসায় গিয়ে রাজনীতিতে শিষ্টাচার ও সৌজন্যের এক ব্যতিক্রমী নজির স্থাপন করেছেন।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) নতুন সরকারের প্রথম সকালেই সরকারপ্রধান ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যকার দূরত্ব কমাতে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলার নতুন রীতি চালু করেন। প্রধানমন্ত্রী কিংবা কোনও ভিভিআইপি মুভমেন্টে বরাবর রাস্তাঘাট বন্ধ করে দুপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর প্রহরায় গাড়ি ছুটতে দেখার সংস্কৃতি বন্ধ করলেন। সরকারি বিলাসবহুল গাড়ির পরিবর্তে নিজের গাড়িতেই সাধারণ মানুষের মতোই চলাচল করছেন। ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি জ্বললেই থেমে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর। কোন কোন জায়গায় দীর্ঘ সময় সিগন্যালে বসে থাকছেন। কোন তড়িঘড়ি নেই। অতীতে প্রথা মোতাবেক প্রধানমন্ত্রীর বহরে ১৩ থেকে ১৪টি গাড়ি থাকতো। এখন সেটি মাত্র চারটিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। পরিবর্তন এসেছে নিরাপত্তা প্রটোকলেও। রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রীর যাত্রাপথে সড়কের দু’পাশে পোশাকধারী পুলিশের দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না। নেতিবাচক এই সংস্কৃতি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান। বৃহস্পতিবারের (১৯ ফেব্রুয়ারি) চিত্রও ছিল অভিন্ন। তারেক রহমান নিজের চালক এবং নিজস্ব অর্থে কেনা জ্বালানি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারির গণরায়ের পর দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক ও গুণগত পরিবর্তন আনতে আগে নিজে জনবান্ধব সব দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। সরকারপ্রধানের এই মানসিকতা অন্য সবার জন্যই বড় বার্তা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রশাসনে গতিশীলতা আনতে আগামীকাল শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) অফিস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারি ছুটির দিনেও তিনি দাপ্তরিক কাজ চালিয়ে যাবেন। প্রশাসনে কর্মচাঞ্চল্য বাড়াতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও তিনি কাজ করার এই নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছে দায়িত্বশীল সূত্র। এর আগে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই নতুন প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের (এমপি) জন্য শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট বরাদ্দ না নেওয়ার ব্যাপারে কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানান। একই সঙ্গে মন্ত্রীদের সরকারি কাজে বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বাহুল্য খরচ না করার কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন। তার এসব পদক্ষেপ সাধারণ মানুষকে আশান্বিত করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসিত হচ্ছে। সাধারণ পথচারীরাও এখন বলছেন, ‘দীর্ঘ দিন পর মনের মতো একজন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে বাংলাদেশ।’ অন্য একজন বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জনতার কাতারেই রয়েছেন। এটি ভালো দিক। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল এমনই।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় খরচে লাগাম টানা এবং জনদুর্ভোগ কমাতে প্রধানমন্ত্রীর এসব উদ্যোগ প্রশাসন ও রাজনীতিতে নতুন ধারার সূচনা করবে।
বৃহস্পতিবারের (১৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর গুলশান অ্যাভিনিউয়ের বাসা থেকে রওনা হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজ গাড়িতে সচিবালয়ে যান। সকাল ৮টা ৩৪ মিনিটে যাত্রা শুরু করে চারটি ট্রাফিক সিগন্যালে লালবাতি জ্বলে উঠলে গাড়ি নিয়ম মেনে থামে। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে তিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ে পৌঁছান। পুরো পথে সময় লাগে ৪১ মিনিট। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, সরকারপ্রধান সাধারণ নিয়মেই সড়কপথ ব্যবহার করেছেন। পথে সিগন্যালে গাড়ি থামলে পথচারীরা করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রী গাড়ি থেকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছার জবাব দেন। কেউ কেউ কাছ থেকে সেলফিও তোলেন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব ও বিশিষ্ট সাংবাদিক আতিকুর রহমানের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট তারেক রহমান তাঁর ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোন অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করতে চান না। প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকলের বাড়াবাড়ির লাগাম টেনে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তুলছেন। সাধারণ মানুষ তাঁর এই স্টাইলকে পছন্দ করেছেন। জনতার নেতা হিসেবে জনগণের কাছাকাছি থাকছেন। এটি নতুন ধারার রাজনীতির বহি:প্রকাশ। তিনি বিভিন্ন সময় বলেছিলেন-শান্তি, ঐক্য, সহনশীলতা ও জবাবদিহিমূলক রাজনীতির ওপর ভিত্তি করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করাই তার ‘প্ল্যান’। তিনি তাঁর কথা রেখেছেন।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array