জয়পুরহাটে কলা চাষ করে এবার বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বৈরী আবহাওয়ায় জমিতে কলা নষ্ট হওয়া, অপরিপক্ব অবস্থায় ফল পেকে যাওয়া, গাছের পাতা মরে যাওয়া এবং কলায় কালো দাগ দেখা দেওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। অন্যদিকে উৎপাদিত কলা বিক্রি করতে গিয়েও মিলছে না প্রত্যাশিত দাম। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় কলার বাজার দুর্গাদহ হাটে ক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়া ও যানজটের কারণে বেচাকেনায় ভাটা পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের।
কৃষকদের অভিযোগ, কলা চাষে ক্ষতির মুখে পড়লেও স্থানীয় কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা তাঁরা পাচ্ছেন না। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, নিরাপদ কলা উৎপাদন এবং রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় মাঠপর্যায়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বাজার সম্প্রসারণ ও যানজট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
পরিপক্ব হওয়ার আগেই পাকছে কলা, গাছের পাতাও মরে যাচ্ছে
জয়পুরহাট সদর উপজেলার আউশগাড়া মহল্লার বাসিন্দা গোলাম ফারুক। পুলিশের চাকরি শেষ করে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি এবার দেড় বিঘা জমিতে সাগর কলার আবাদ করেছিলেন তিনি। কিন্তু বাগানে কলা পুরোপুরি পরিপক্ব হওয়ার আগেই পাকতে শুরু করেছে। পাশাপাশি গাছের পাতা মরে যাওয়ায় ব্যাপক লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন তিনি।
গোলাম ফারুক বলেন, এবার দেড় বিঘা জমিতে সাগর কলা চাষ করেছিলেন। কিন্তু কলা পুরোপুরি পরিপক্ব হওয়ার আগেই পাকতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে গাছের পাতা মরে যাওয়ায় ব্যাপক লোকসানে পড়েছেন তিনি। একই এলাকার কৃষক সাজ্জাদ হোসেন ও আব্দুল হামিদ ধারদেনা করে কয়েক বিঘা জমিতে চিনি চম্পা জাতের কলা চাষ করেছেন। তাঁদের বাগানে ফলন ভালো হলেও কলায় কালো দাগ দেখা দিয়েছে। কোথাও কোথাও কলাসহ গাছ ভেঙে পড়ায় আরও ক্ষতির মুখে পড়েছেন তাঁরা। এই দুই কৃষকের অভিযোগ, এবার কলা চাষ করে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ না পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
দুর্গাদহ হাটে দুই ঘাউড় কলার দাম মাত্র ৬০০ টাকা
জয়পুরহাট সদর উপজেলার ভাদসা ইউনিয়নের দুর্গাদহ বাজার উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় কলার হাট হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, পাইকার ও ব্যবসায়ীরা এখানে কলা কেনাবেচা করতে আসেন। তবে এবার বাজারে প্রত্যাশিত ক্রেতা না থাকায় কলার দাম নিয়ে হতাশায় পড়েছেন চাষিরা।
ছাওয়ালপাড়া গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল হোসেন সাইকেলে করে দুই ঘাউড় কলা নিয়ে এসেছিলেন দুর্গাদহ বাজারে। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রেতা না থাকায় তাঁর দুই ঘাউড় কলার দাম উঠেছে মাত্র ৬০০ টাকা। অথচ অন্য সময়ে একই পরিমাণ কলার দাম অন্তত এক হাজার টাকা হতো বলে জানান তিনি। মোজাম্মেল হোসেনের মতো বাজারে আসা অন্যান্য কলাচাষি, পাইকার, আড়তদার, ইজারাদার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, বাজারটি ছোট পরিসরে পরিচালিত হওয়ায় দূরদূরান্তের জেলা থেকে আগের মতো পাইকাররা আসছেন না। ফলে ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি কলা বিক্রি করতেও সমস্যায় পড়ছেন তাঁরা।
অপরিকল্পিত দোকানপাটে যানজট, সংকুচিত বাজারের পরিসর
দুর্গাদহ বাজারে বেচাকেনার সমস্যার পাশাপাশি যানজটও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারের আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে দোকানপাট গড়ে ওঠায় প্রায়ই তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এতে বাজারে আসা ক্রেতা-বিক্রেতাদের চলাচল ব্যাহত হয় এবং পণ্য আনা-নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারের পরিসর বাড়ানো গেলে দূরবর্তী এলাকা থেকে পাইকারদের আসা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে যানজট কমানো গেলে কলা পরিবহন ও কেনাবেচার পরিবেশও উন্নত হবে। বাজার সম্প্রসারণের অভাবে সম্ভাবনাময় এই হাটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
চলতি অর্থবছরে কলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ৮১৭ হেক্টর
জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজু আলম সরকার জানান, চলতি অর্থবছরে জেলায় ৮১৭ হেক্টর জমিতে কলা চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত ৭০৫ হেক্টর জমিতে কলার আবাদ হয়েছে।
জেলার মধ্যে জয়পুরহাট সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৫১৭ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়। এ ছাড়া পাঁচবিবি, ক্ষেতলাল ও কালাই উপজেলাতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে কলার আবাদ করা হয়ে থাকে। কৃষকরা যেন মানসম্মত ও নিরাপদ কলা উৎপাদন করতে পারেন, সে জন্য নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মনজু আলম সরকার। কলার অন্যতম ক্ষতিকর শত্রু ফ্রুট ফ্লাই বা পোকার আক্রমণ থেকে ফল রক্ষায় ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সিগাটোকা ও পানামা রোগের মতো ক্ষতিকর রোগবালাই থেকে বাগান সুরক্ষায় উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
দুর্গাদহ বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা প্রশাসনের
দুর্গাদহ বাজারের সমস্যা সমাধান ও পরিসর বাড়ানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপরিকল্পিত দোকানপাটের কারণে বাজারটিতে প্রায়ই যানজট তৈরি হয়। এ সমস্যা নিরসনের পাশাপাশি বাজারটিকে আরও আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা প্রশাসকের অনুমোদন সাপেক্ষে স্থানীয় চান্দিনা ভিটি ও তোহা বাজার অক্ষুণ্ণ রেখে আশপাশের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করে হাট সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে এবং বেচাকেনা আরও সহজ হবে বলে আশা করছে প্রশাসন।
প্রতি হেক্টরে গড় ফলন ৫৩.২৫ মেট্রিক টন
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জয়পুরহাটে প্রতি হেক্টর জমিতে কলার গড় ফলন প্রায় ৫৩ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও কলা সরবরাহের মাধ্যমে এ ফসল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখছে। তবে জমিতে রোগবালাই ও আবহাওয়াজনিত ক্ষতি এবং বাজারে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ার সমস্যা অব্যাহত থাকলে চাষিদের আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই উৎপাদন পর্যায়ে কৃষি পরামর্শ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কলার বাজার সম্প্রসারণ, পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করা এবং দূরবর্তী পাইকারদের আকৃষ্ট করার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]