পারমাণবিক বোমা ধ্বংস করতে পারে একটি শহর, যুদ্ধ বদলে দিতে পারে একটি ভূখণ্ডের মানচিত্র। কিন্তু মানুষের ভেতরের ভয়, অবিশ্বাস ও বিভাজন মুছে দিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা অস্ত্রের নেই। সেই জায়গা থেকেই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের বার্তা—‘পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হচ্ছে শান্তি।’ তাঁর মতে, শান্তিতে বিনিয়োগ এবং শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশের মধ্য দিয়েই সংঘাত থেকে বেরিয়ে টেকসই উন্নয়ন ও সুন্দর সমাজের পথে এগোনো সম্ভব।
শুক্রবার (০২ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় নাট্যশালা, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে লাল সবুজ সাংস্কৃতিক একাডেমি আয়োজিত বিশ্ব শান্তি দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ‘গ্ল্যামার এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড-২০২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
- শিল্প-সংস্কৃতির কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই
- শান্তিতে বিনিয়োগ এবং শিল্প-সংস্কৃতির প্রসারে জোর
- বাংলাদেশে সম্প্রীতির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব
ধ্বংস নয়, শান্তিই প্রকৃত শক্তি
নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের ছাত্র হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, পারমাণবিক বোমাকে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু তিনি মনে করেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো শান্তি।’ বক্তব্যটির তাৎপর্য কেবল যুদ্ধবিরোধী আহ্বানে সীমাবদ্ধ নয়। মন্ত্রীর বক্তব্যে শান্তিকে উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও উঠে আসে। তাঁর মতে, সংঘাতের পেছনে সম্পদ ব্যয়ের পরিবর্তে শান্তিতে বিনিয়োগ করা গেলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অস্থিরতা ও যুদ্ধ থেকে উত্তরণের পথ তৈরি হতে পারে।

সংস্কৃতি যেখানে সীমান্ত মানে না
শান্তির এই বিনিয়োগে শিল্প-সংস্কৃতিকে অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে দেখছেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘শিল্প-সংস্কৃতির কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই।’ ভাষা না বুঝেও মানুষ সংগীত, চিত্রকলা, নৃত্যসহ শিল্পের নানা মাধ্যমে অন্য মানুষের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এই সর্বজনীনতাই সংস্কৃতিকে সম্প্রীতির শক্তিতে পরিণত করে। ভিন্ন ভাষা, পরিচয় ও ভূগোলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের সেতু তৈরি করে শিল্প। ফলে সংস্কৃতিচর্চা শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; সামাজিক দূরত্ব কমানো, পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তৈরিরও কার্যকর মাধ্যম।
বাংলার সংস্কৃতিতেই সম্প্রীতির শক্তি
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী প্রয়াত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, শিল্পকলা একাডেমির প্রাঙ্গণে গ্রামবাংলার ভাটিয়ালি, বাউলসহ বিভিন্ন লোকসংগীতের শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের গান শুনতেন জিয়াউর রহমান। ড. আবদুল মঈন খান জানান, পরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহযোগিতায় শিল্পকলা একাডেমির অডিটোরিয়াম ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে আট কোটি টাকা অনুদানের ব্যবস্থা করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। এ সময় জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানান মন্ত্রী।
এক দিনের নয়, প্রতিদিনের শান্তি
জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতি বছর ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব শান্তি দিবস পালনের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, শান্তির পক্ষে কাজ শুধু একটি দিবসের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বছরের প্রতিটি দিন শান্তির পক্ষে কাজ করতে হবে। এখানেই তাঁর বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক—শান্তিকে আনুষ্ঠানিকতার বাইরে নিয়ে সামাজিক ও উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করা। কারণ সংঘাত ও অস্থিরতার পরিবেশে উন্নয়নের সুফল টেকসই হয় না। বিপরীতে শান্তিপূর্ণ সমাজ মানুষের নিরাপত্তা, সামাজিক সংহতি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি শক্ত করে।
শান্তির অবকাঠামো গড়তে সংস্কৃতির প্রসার
বাংলাদেশে শান্তি ও সম্প্রীতির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্বে একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ার উদাহরণ তৈরি করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন ড. আবদুল মঈন খান। এ জন্য শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা ও প্রসারে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আরফাতুর রহমান আপেল। শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/এমএএএমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array