নেদারল্যান্ডসে তরুণদের সৃজনশীলতার গুরুত্ব তুলে ধরলেন অধ্যাপক ইউনূস
নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামে ডাচ পোস্টকোড লটারির আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মূল বক্তা হিসেবে অংশ নিয়েছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল সোমবার (১ জুন) আমস্টারডামে আয়োজিত ডাচ পোস্টকোড লটারির প্রধান বার্ষিক অনুষ্ঠানে ৮৫০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ছিলেন।
আশা ও পরিবর্তনের তাগিদ নিয়ে অধ্যাপক ইউনূস তিন শূন্যের পৃথিবীর তাঁর স্বপ্ন তুলে ধরেন—এমন একটি পৃথিবী যেখানে সম্পদের কেন্দ্রীকরণ রোধ করে দারিদ্র্য সম্পূর্ণরূপে দূর করা হবে, চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে বেকারত্ব শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনতে গড় কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। তিনি তরুণদের প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারাই সেই প্রজন্ম হয়ে ওঠে যারা এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে।
বক্তব্যে অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এ দেশের তরুণদের অসাধারণ সাহসিকতার কথা উল্লেখ করেন। বিশেষ করে তিনি সম্মুখসারিতে থাকা নারীদের সংগ্রাম ও অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, নারীরাই এই আন্দোলনের সম্মুখসারিতে ছিলেন এবং গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ডাচ পোস্টকোড লটারির এই আয়োজনে দাতব্য সংস্থাগুলোর অংশীদার, উদ্যোক্তা, সরকারি কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং ব্যবসায়িক নেতারা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে পোস্টকোড লটারির অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামাজিক প্রভাব উদযাপন করা হয় এবং বিভিন্ন খাতের অংশীজনদের মধ্যে অর্থবহ সংলাপের একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ‘ইয়াং প্রফেশনালস নেটওয়ার্কিং সেশন’-এর মাধ্যমে। এতে জেনারেশন জি-এর পক্ষ থেকে মূল বক্তব্য দেন নেদারল্যান্ডসের তরুণ অধিকারকর্মী, নাগরিক অংশগ্রহণ ও প্রজন্মগত ন্যায্যতার পক্ষে সক্রিয় কণ্ঠস্বর জাহকিনি বিসেলিঙ্ক। সেশনের শেষ পর্যায়ে অধ্যাপক ইউনূস মঞ্চে উপস্থিত হয়ে সম্মেলনে অংশ নেওয়া তরুণদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
অধ্যাপক ইউনূস তরুণ পেশাজীবীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ে অংশ নেন এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তোলার জন্য বাস্তবধর্মী প্রস্তাবনা তৈরিতে জোর দেন।
মূল পর্বে ডাচ পোস্টকোড লটারির পরিচালক সিগরিড ভ্যান আকেন এবং চেয়ারম্যান ইয়োনে আর্নল্ডুসেন বক্তব্য দেন। পরে বিভিন্ন সংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে সাজানো এই আয়োজনটি অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি প্রাণবন্ত ও অনুপ্রেরণামূলক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
৮৫০ জনের বেশি আন্তর্জাতিক সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্ব ছিল মঞ্চে অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে এক বিশেষ আলাপচারিতা। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন নেদারল্যান্ডসের সাবেক জাতিসংঘ তরুণ প্রতিনিধি হাযার ইয়াকুবি।
দুই বছরের দায়িত্ব পালনকালে হাযার ইয়াকুবি মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও জলবায়ু সংকট বিষয়ে তরুণদের মতামত সংগ্রহ করেন এবং সেই অভিজ্ঞতাকে জাতিসংঘে প্রদত্ত বক্তব্যের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় তুলে ধরেন। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে একটি প্রাণবন্ত ও গভীর আলোচনা করেন, যেখানে অধ্যাপক ইউনূস কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন এবং বলেন, ‘তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত উদ্যোগ শুধু কাম্য নয়, বরং একটি উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য অপরিহার্য।’
অনুষ্ঠানটি একটি নেটওয়ার্কিং রিসেপশনের মাধ্যমে শেষ হয়, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে পরষ্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সামাজিক উদ্ভাবন ও পরিবেশগত দায়িত্ববোধ নিয়ে আলোচনার জন্য Circa Amsterdam-এর আইকনিক জিওডেসিক ডোম একটি উপযুক্ত প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করে, যা এর টেকসই নকশা ও শক্তি-সাশ্রয়ী ব্যবস্থার জন্য সুপরিচিত।
ডাচ পোস্টকোড লটারি নেদারল্যান্ডসের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ফান্ডরেইজিং লটারি, যা সমাজ, পরিবেশ এবং মানবিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা বিস্তৃত দাতব্য সংস্থাগুলোতে এর আয় থেকে অর্থায়ন করে। “দ্যা পাওয়ার অব পোস্টকোডস” হলো এর বার্ষিক আয়োজন, যেখানে অংশীদার, নীতিনির্ধারক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের একত্র করে সম্মিলিত প্রভাব বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ হয়। -বিজ্ঞপ্তি
কালের আলো/এএএন


আপনার মতামত লিখুন
Array