বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রস্তাবিত নতুন বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। তিনি মনে করেন, এই বাজেটের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। সতর্কবার্তা দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। অন্যদিকে, বাজেট নিয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন ব্যবসায়ীরাও।
অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার দৃঢ় সংকল্পের প্রতিফলন
ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু ভঙ্গুরই হয়ে পড়েনি, একই সঙ্গে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মাঝখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও দেশকে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছে। যার ফলে একটি অগোছালো প্রশাসন এবং চরম দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনীতির মধ্য দিয়ে বিএনপিকে সরকার গঠন করে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।’ এই কঠিন প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তাকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘এই বাজেটে সরকারের আন্তরিকতা ও অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার দৃঢ় সংকল্পের প্রতিফলন ঘটেছে। বাজেটের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সৃজনশীলতা। এতে এমন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আগে খুব কমই দেখা গেছে।’
বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আগামী অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ নারী পরিবারপ্রধান এই কর্মসূচির আওতায় আসবেন এবং প্রতি পরিবারকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। এজন্য ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’ কৃষিখাতে সহায়তার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে সেচব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণ এবং মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় বাজেটের পদক্ষেপের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, ‘দেশীয় উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। যেসব পণ্য দেশে উৎপাদিত হয়, সেগুলোর সুরক্ষায় বিদেশি আমদানির ওপর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর-সুবিধাও প্রদান করা হয়েছে।’
বাজেটে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ক্রীড়া খাতে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মাসিক সম্মানী দেওয়া হবে, ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো আয়োজন পুনরায় শুরু হবে এবং খেলাধুলার পরিবেশ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এছাড়া ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’
সংস্কৃতি খাতের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তিনি জানান, ‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় মৃৎশিল্প, বুননশিল্প, শীতলপাটিসহ ঐতিহ্যবাহী পণ্য বাজারজাত করা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে লোকজ ও হস্তশিল্পের প্রসারে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ঢাকার পূর্বাঞ্চলে ১৬০ একর জমির ওপর একটি বিশ্বমানের ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এসএমই খাতের বিকাশে সহজ শর্তে ঋণ, প্রবাসী কর্মীদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল ও ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করা হবে। হাইটেক পার্কে ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক নারীর কাজের সুযোগ তৈরি হবে।’
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধির তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১.৩৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ০.৫৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১.০১ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এটি মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।’ ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘ব্যবসা সহজ করতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও নিয়ন্ত্রণ কমানো হয়েছে। কর প্রদান ও রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় করা হবে। করের হার না বাড়িয়ে বরং করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসন আধুনিকীকরণের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে।’ আমদানি সুবিধার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রপ্তানিমুখী ও উৎপাদনমুখী খাতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।’ মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। উৎপাদন বাড়লে মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। সব মিলিয়ে এই বাজেট সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনবে।’
বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) বাজেটকে সামগ্রিকভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর হ্রাস, পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে কর সুবিধা এবং অনলাইন ভ্যাট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তিনি করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখার সমালোচনা করে বলেন, মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় এটি অন্তত ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন ছিল। ডিসিসিআইর মতে, ঘোষিত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতি নতুন গতি পাবে। তবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ অর্থনীতিবিদদের
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাজেটের নীতিগত দিককে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, মানবিক অর্থনীতি, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং যুব উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক কাঠামো এখনো দুর্বল। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বাস্তবায়ন সক্ষমতার তুলনায় বড় বাজেট ঘোষণার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। ফলে ঘোষিত বাজেটের পুরোটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, করের বোঝা না বাড়িয়ে কিছু ক্ষেত্রে কমানোর উদ্যোগ ইতিবাচক। এতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও সমন্বিত ও কৌশলগত পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।
আপনার মতামত লিখুন
Array