খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৪ আষাঢ়, ১৪৩৩
           

ডা. জাহেদ ইস্যুতে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ৪:১২ অপরাহ্ণ
ডা. জাহেদ ইস্যুতে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ দিল্লিতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. খলিলুর রহমান।

ওই ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং দুঃখজনক ব‌লেও মন্তব্য ক‌রে‌ছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সদ্য নির্বাচিত এই সভাপতি।

সোমবার (১৫ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণাল‌য়ে সাংবা‌দিক‌দের সঙ্গে আলাপকালে এ মন্তব্য ক‌রেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

খ‌লিলুর রহমান ব‌লেন, ‘এটা একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং দুঃখজনকও ব‌টে। এ বিষ‌য়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় য‌থোপযুক্ত ব্যবস্থা নি‌চ্ছে। আজ‌কের দিন শে‌ষে আমরা এ বিষ‌য়ে আপনা‌দের জানা‌বো।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পর মন্ত্রণালয়ে সাংবা‌দিক‌দের স‌ঙ্গে এ প্রস‌ঙ্গে কথা ব‌লেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবা‌য়েদ ইসলাম।

তিনি ব‌লেন, ‘নয়াদিল্লির বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমানের বিষয়ে পুরো ঘটনা জেনে যদি কোনো অ্যাকশন নেওয়ার থাকে, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব। এ বিষয়ে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।’

এর আগে রোববার (১৪ জুন) সন্ধ্যায় ভারতের ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। দিল্লিতে সোমবার শুরু হওয়া ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠকে অংশ নেওয়া ছিল তার উদ্দেশ্য। সেখানে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল ডা. জাহেদের।

কিন্তু কূটনৈতিক চিঠি দিয়ে আগে জানানোর পরও রোববার সন্ধ্যায় ভারতের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ডা. জাহেদকে দিল্লিতে ঢুকতে বাধা দেয়।

পরে উচ্চ মহলের নির্দেশে অনুমতি দেওয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দিল্লিতে না গিয়ে কলম্বো হয়ে ঢাকায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। সোমবার দুপু‌রে তিনি ঢাকায় ফি‌রেও এসেছেন। এই ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কালের আলো/এসআর/এএএন

ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধানদের সামনে নিজেকে ‘বস’ দাবি ট্রাম্পের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৯:২১ পূর্বাহ্ণ
ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধানদের সামনে নিজেকে ‘বস’ দাবি ট্রাম্পের

ফ্রান্সে জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে বসে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করলেন, তিনিই ‘বস’। জি৭-এর সদস্য রাষ্ট্রগুলির প্রধানেরা সবাই সেখানে ছিলেন।

বিশ্ব অর্থনীতির নিরাপত্তা বিষয়ক একটি অধিবেশনের আয়োজন করা হয়েছিল অভ্য়াঁ-লে-ব্যাঁ শহরে। তাতে যোগ দিতে গিয়ে সাংবাদিক এবং রাষ্ট্রনেতাদের সামনে ট্রাম্প নিজেকে ‘বস’ বলে দাবি করেন।

তবে কিসের প্রেক্ষিতে তার এই মন্তব্য, তা খোলসা করেননি। উপস্থিত রাষ্ট্রনেতারাও কেউ তার কোনও প্রতিবাদ করেননি। বরং, ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সংঘাত এবং পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে এতদিন যে ইউরোপের নেতারা ট্রাম্পের সমালোচনা করছিলেন, তারাও এবার সুর নরম করেছেন।

জি৭ বৈঠকে যোগ দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। এ ছাড়া, ট্রাম্পের ঘোষণার সময় অধিবেশন কক্ষে ছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি।

গত সোমবার (১৫ জুন) থেকে ফ্রান্সে জি৭ সম্মেলন শুরু হয়েছে। তা চলে ১৭ জুন (বুধবার) পর্যন্ত। ইতিমধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে রাষ্ট্রনেতাদের বৈঠক হয়েছে।

জি৭ সদস্যরাষ্ট্রগুলি একটি যৌথ বিবৃতিও দিয়েছে। বুধবারের অধিবেশনের আলোচ্য বিষয় ছিল দুষ্প্রাপ্য খনিজ এবং অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা।

রাশিয়া এবং ইউক্রেনের যুদ্ধের বিষয়েও জি৭ বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তার পরেই নিজেকে ‘বস‌্’ বলে ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা এবং ইসরায়েলের যৌথ বাহিনী ইরান আক্রমণ করেছিল। তাতে মৃত্যু হয় সেদেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির। তার পর থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত তীব্র হয়েছে। ওই অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে গিয়েছে ইরান।

সেই সঙ্গে তারা হরমুজ প্রণালিতে পণ্য পরিবহণেও বাধা সৃষ্টি করে। পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকার এই আগ্রাসী নীতির তীব্র সমালোচনা করেছিল ইউরোপের একাধিক দেশ।

হরমুজ খোলার বিষয়ে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প তাদের সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপের বেশির ভাগ শক্তিধর দেশই পিছিয়ে গিয়েছিল।

ট্রাম্পও প্রকাশ্যে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন বার বার। জি৭ বৈঠকে তার বিপরীত চিত্র দেখা গেল। এমনকি, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎজ মঙ্গলবার ট্রাম্পকে একটি ফুটবল জার্সি উপহার দেন। জার্সির নম্বর ছিল ৪৭।

ইউরোপের এই সুর বদলের নেপথ্যে রয়েছে ট্রাম্পের ইরান চুক্তি। সময় বদলেছে। ইরানের সঙ্গে আমেরিকা সমঝোতার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে রোববার গভীর রাতে।

আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে খাতায়কলমে সেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা। পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

রাশিয়া এবং ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধে আমেরিকার নীতি নিয়েও ইউরোপে ক্ষোভ ছিল। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলাদা করে ট্রাম্পের বৈঠক না-হলেও জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে তিনি ছিলেন। সেখানে অন্যতম আলোচ্য বিষয় ছিল রাশিয়া।

এই সংঘাতে আগের চেয়ে ইউক্রেনের অবস্থানের উন্নতি হয়েছে বলে মেনে নিয়েছেন ইউরোপীয় নেতারা। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রতিরোধ এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তারা।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বৈঠকের পর বলেন, আমেরিকা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান বদলেছে। রাশিয়ার প্রতি তাদের অবস্থান কঠোর হয়েছে। আমার মতে, তা যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

পুশইনের মতো অমানবিক আচরণের নজির পৃথিবীতে বিরল: মঞ্জু

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১০:০০ অপরাহ্ণ
পুশইনের মতো অমানবিক আচরণের নজির পৃথিবীতে বিরল: মঞ্জু

পুশইনের মাধ্যমে ভারত সরকার কূটনৈতিক সৌজন্য, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা উদ্যোগ না নেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর বিজয়নগরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সীমান্ত হত্যা, পুশইন ও কাঁটাতারের রাজনীতি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী তার অভিবাসী নাগরিককে অন্য দেশের মানুষ বলে জোরপূর্বক সীমান্তের শূন্যরেখায় দিনের পর দিন খোলা আকাশের নিচে বসিয়ে রেখে নির্যাতন করে ঠেলে পাশের দেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই। এর আগে মিয়ানমারের জান্তা সরকার তাদের নাগরিকদের ওপর নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কয়েক যুগ হতে যাচ্ছে, ২০ লাখের বেশি শরণার্থীর হৃদয়বিদারক জীবন চেয়ে চেয়ে দেখছে বিশ্ববাসী। তাদের পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেই।

মঞ্জু বলেন, ভারত সরকার বলেছিল নির্বাচিত সরকার এলে তারা আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। কিন্তু তাদের সহযোগিতার এই নৃশংস নমুনা অতীতের মতোই আমাদের দেখতে হচ্ছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে ভারতের কাঁটাতারের রাজনীতি, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইনের মতো শত্রুসুলভ কার্যক্রম তুলে ধরার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আলতাফ হোসাইন, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, সহকারী দপ্তর সম্পাদক আব্দুল হালিম নান্নু, মশিউর রহমান মিলু, প্রবাসী নেতা নুরুন্নবী নয়ন, যাত্রাবাড়ী থানার আহ্বায়ক মিয়া সুলতান আরিফ, বরিশালের নেতা জাকির হোসেন ও ইমরান সরদার উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এসআর/এএএন

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত একান্ত সরকারের

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৮:৫৬ অপরাহ্ণ
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত একান্ত সরকারের

আজকের আন্তঃনির্ভরশীল বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ওপর। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে নিছক দুটি রাষ্ট্র সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ, যা দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে এসেছে। আগামী দিনের লক্ষ্য উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। সফরের ক্রম, আলোচ্যসূচি এবং সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রতীকবাদের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি শুধু একটি অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের আধুনিক উন্নয়নের অন্যতম সফল মডেল। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো জনশক্তি। লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে কর্মরত রয়েছেন এবং তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আরও সম্প্রসারিত হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে বর্তমান বিশ্বে শুধু শ্রম রপ্তানি নয়, দক্ষ জনশক্তি গঠনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি এই সফরে কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে। কারণ আগামী দিনের প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা।

অন্যদিকে মালয়েশিয়ার শিল্প ও বিনিয়োগ খাতেও বাংলাদেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ইলেকট্রনিকস, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে তা দেশের শিল্পায়নকে নতুন গতি দিতে পারে। তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে চীনকে ঘিরে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশের বহু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সহায়তা রয়েছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নের ইতিহাসে সড়ক, সেতু, রেল, বিদ্যুৎ, বন্দর এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর বহু প্রকল্পের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বর্তমানে যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, তার মধ্যে অন্যতম হলো বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে চীনা বিনিয়োগ নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা তিস্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে নদীর নাব্যতা সংকট, ভাঙন, পানির স্বল্পতা এবং সেচ সমস্যার কারণে এ অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট উৎপাদন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো আগামী দিনের অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ যদি এসব খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা আকৃষ্ট করতে পারে, তাহলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে এই সফরগুলোর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্নও উঠে আসে। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেকেই লক্ষ্য করেছেন যে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রতিবেশী ভারতও সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র কোন দেশকে কখন অগ্রাধিকার দেবে, সেটি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

এখানে মনে রাখা দরকার, বিএনপির কূটনৈতিক দর্শন কোনো নতুন বিষয় নয়। স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে যে পররাষ্ট্রনীতি অনুসৃত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি ছিল জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক মর্যাদা এবং সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকেও একই ধরনের নীতিগত অবস্থান প্রত্যাশিত। কারণ একটি রাজনৈতিক দলের পররাষ্ট্রনীতি কেবল কোনো ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, আদর্শ এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সুতরাং বিএনপির কূটনৈতিক রেওয়াজে হঠাৎ করে মৌলিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা খুবই কম। দলটি ঐতিহাসিকভাবেই এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা নয়, আবার কোনো দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতাও নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পরিস্থিতি, কথিত পুশ-ইন, ভিসা ও কূটনৈতিক যোগাযোগসংক্রান্ত কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনাকে অনেকেই দুই দেশের সম্পর্কে বিদ্যমান কিছু অস্বস্তির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

তবে এ কথাও সত্য যে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল সরকার পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশ একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অংশীদার। সেই কারণেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বাস্তবতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কোনো রাষ্ট্র তার নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে—এটিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক নিয়ম। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মানদণ্ডে বিচার করা পরিপক্ব কূটনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভারতেরও উপলব্ধি করা উচিত যে আজকের বাংলাদেশ আর দুই দশক আগের বাংলাদেশ নয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এখন বাংলাদেশকে নতুন দৃষ্টিতে দেখছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান তাকে একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি এবং অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যার টেকসই সমাধানই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

বাংলাদেশ যেমন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তেমনি সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে। কারণ আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো সমতা, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থ।

আজকের বাংলাদেশ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা নয়, বরং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সাফল্যের চাবিকাঠি।

তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির সংখ্যা নয়, বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বহু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই এবার প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

বাংলাদেশের মানুষ এখন বড় বড় ঘোষণার চেয়ে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা দেখতে চায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে, শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে, কৃষি ও প্রযুক্তি খাত এগিয়ে যাচ্ছে এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যদি মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। যদি এই সফরের মাধ্যমে অর্জিত সমঝোতা ও সহযোগিতাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা দেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।