প্রধানমন্ত্রীর সফরে বাংলাদেশ-চীন কি কি চুক্তি হয়েছে, জানালেন মাহদী আমিন
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে বাংলাদেশ ও চীনের বহুমাত্রিক সম্পর্ক এখন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারত্বে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, চীনে প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরের মাধ্যমে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পেরিয়ে একটি অনন্য বহুমাত্রিক রূপ লাভ করেছে।
শুক্রবার(২৬ জুন) চীনের স্থানীয় সময় দুপুর দুইটায় (বাংলাদেশ সময় বেলা ১২টা) সেন্ট্রাল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন এসব তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, এই স্বল্প সময়ের সফরে প্রধানমন্ত্রী চীনের সবচেয়ে ক্ষমতাধর তিনজন ব্যক্তিত্ব—প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং ও ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনপিসি) স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন। অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের এই প্রতিনিধিদলের আলোচনায় নির্ধারিত হয়েছে যে দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হবে পারস্পরিক আস্থা, শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও দুই দেশের নিজস্ব স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদি।
মাহদী আমিন জানান, দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সম্মতির ভিত্তিতে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি মিনিস্ট্রি-টু-মিনিস্ট্রি, ৩টি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে চীনের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের এবং ১টি দুই দেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া এই সফরের সফলতার ওপর ভিত্তি করে একটি ১৬ দফার যৌথ ইশতেহার প্রণয়ন করা হচ্ছে।
মুখপাত্র আরও বলেন, চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ৫০ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনবদ্য ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধানদের ইতিবাচক নীতি ও বারবার চীন সফরের অবদানকে তারা গভীরভাবে মূল্যায়ন করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী আবারও ‘ওয়ান চায়না পলিসি’র প্রতি দেশের সুসংহত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে বর্তমান সরকারের জন-কেন্দ্রিক নীতিগুলোকে চীন গভীরভাবে প্রশংসা করেছে এবং বিভিন্ন খাতে সর্বোচ্চ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশের উৎপাদন ও পোশাক খাতের কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। চীন থেকে বাংলাদেশে কারখানা স্থানান্তর (রিলোকেশন) এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে চীন বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেবে।
উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে উপদেষ্টা বলেন, সড়ক, সেতু ও রেলওয়ের মতো মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থায় চীন সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। চট্টগ্রামের আনোয়ারা ইকোনমিক জোন ও মোংলা ইকোনমিক জোনের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি গ্রিন এনার্জি ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণে জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিএনপির নির্বানি ইশতেহারে থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পানি ব্যবস্থাপনার প্ল্যানিং থেকে শুরু করে কারিগরি সব স্তরে চীন সরকার যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠা, চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিকায়ন করে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে চীন কাজ করবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ম্যান্ডারিন ভাষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় চীন সহযোগিতা করবে। স্বাস্থ্য খাতে রোবটিক সার্জারিসহ আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশিদের জন্য চিকিৎসাজনিত ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মাহদী আমিন বলেন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে চীন স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে যেকোনো আলোচনায় চীন মধ্যস্থতা করবে। এছাড়া প্রথমবারের মতো দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘টু প্লাস টু’ ডায়ালগ মেকানিজম নিয়ে আলোচনা হয়েছে। চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্রিকসের সদস্যপদের জন্য বাংলাদেশ আবেদন করলে চীন তাকে স্বাগত জানাবে বলেও জানানো হয়।
মাহদী আমিন বলেন, ‘চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার পর এটি পরিষ্কার যে, দীর্ঘমেয়াদি ও বিশ্বাসী সম্পর্কের জন্য আমাদের একটি নতুন রূপরেখা (নিউ ব্লুপ্রিন্ট) তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি ও সুজন মাহমুদ, সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হকসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা।
কালের আলো/এসএকে


আপনার মতামত লিখুন
Array