হোলি আর্টিজানে হামলায় নিহতদের স্মরণ
বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ যেন আর মাথাচাড়া না দেয়
রাজধানীর গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা ছিল দেশে ভয়, বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন গুলশানে ইতালির রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আগত অতিথিরা। ওই হামলায় প্রাণ হারানো সাহসী মানুষদের স্মৃতি ধরে রাখতে হবে এবং বাংলাদেশে যেন আর কখনও সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
মঙ্গলবার (১ জুলাই) গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারি জঙ্গি হামলায় নিহতদের স্মরণে ইতালির রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলা হয়।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে স্মরণানুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো জানান, এবার হোলি আর্টিজানের সামনে নয়, তার বাসভবনে অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, আগামী বছর হামলার এক দশক পূর্তি উপলক্ষে হোলি আর্টিজানের সামনেই স্মরণ ও শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হবে।
পরে হামলায় নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে একটি স্মারক ফলকের সামনে ইতালি, জাপান, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রর কূটনীতিকরা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে যারেফ আয়াত হোসেন এবং বাংলাদেশ পুলিশ ও বাংলাদেশে বসবাসরত ইতালীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরাও শ্রদ্ধা জানান।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, ২০১৬ সালের এই দিনে সংঘটিত নির্মম হামলা হোলি আর্টিজান বেকারির শান্ত পরিবেশকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। তিনি বলেন, এ আয়োজন শুধু নিহতদের স্মরণ নয়, বরং সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করারও প্রতীক।
তিনি আরও বলেন, হোলি আর্টিজান হামলা ছিল মানবতার বিরুদ্ধে নির্মম আঘাত এবং বাংলাদেশের সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজে ভয় ও বিভাজন ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা। তবে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশ দৃঢ়তা দেখিয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী সাহসিকতার সঙ্গে জঙ্গিদের মোকাবিলা করেছে। অভিযানে অংশ নিতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তা শহীদ হন।
পররাষ্ট্রসচিব বলেন, ওই ঘটনার পর বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদ দমনে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে এবং একটি বিশেষ সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনেছে। তিনি জানান, সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ অব্যাহত রাখবে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করবে।
ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো বলেন, বাংলাদেশে যেন আর কখনও সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, জঙ্গিরা স্থানীয় ও বিদেশি নাগরিক, মুসলিম ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের সম্পর্কের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চাইলেও তারা সফল হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যৌথ অঙ্গীকার আরও দৃঢ় হয়েছে।
ইতালির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক লুইগি ভিগনালি বলেন, যারা সেই ভয়াবহ হামলায় প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ যেন কখনও ভুলে না যাওয়া হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোথাও যাতে সন্ত্রাসবাদ আর মাথাচাড়া দিতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
স্মরণানুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইতালি ও জাপানের নিহত নাগরিকদের পরিবারের সদস্যরা, নিহত ফারাজ আইয়াজ হোসেন–এর মা ও ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন, ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা, জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচিসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিরা হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে। পরে তারা কুপিয়ে ও গুলি করে ২০ জনকে হত্যা করে। নিহতদের মধ্যে ইতালির ৯ জন, জাপানের ৭ জন, ভারতের ১ জন এবং বাংলাদেশের ৩ জন নাগরিক ছিলেন। জিম্মিদের উদ্ধারে অভিযান চালাতে গিয়ে জঙ্গিদের হামলায় পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হন। ভয়াবহ এ হামলা দেশজুড়ে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল।
কালের আলো/এসআর/এএএন


আপনার মতামত লিখুন
Array