চকোলেট, চিপস, আইসক্রিম কিংবা ফাস্টফুডের প্রতি শিশুদের বাড়তি আগ্রহকে অনেক অভিভাবক স্বাভাবিক আবদার হিসেবে দেখেন। কিন্তু টেলিভিশন, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন যখন বারবার এসব পণ্যের প্রতি শিশুদের মনোযোগ টেনে নেয়, তখন বিষয়টি আর নিছক পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভোগের এই সংস্কৃতি প্রভাব ফেলতে পারে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস, মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস ও পারিবারিক সম্পর্কেও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের মনস্তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে তৈরি বিজ্ঞাপন তাদের চাহিদা বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রচার শিশুদের পুষ্টিকর খাবার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। একই সঙ্গে দামি খেলনা, পোশাক ও ডিজিটাল গ্যাজেটের বিজ্ঞাপন তাদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা ও প্রত্যাশার জন্ম দিতে পারে।
- চিপস-চকোলেট থেকে দামি গ্যাজেট, শিশুদের মনস্তত্ত্বকে পুঁজি করে বাড়ছে পণ্যের চাহিদা
- স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পারিবারিক দ্বন্দ্ব ঠেকাতে কঠোর নীতিমালার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
- সুরক্ষায় পরিবার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
বিজ্ঞাপনের আকর্ষণ, চাহিদার নতুন চক্র
শিশুরা বিজ্ঞাপনে দেখানো রং, সংগীত, চরিত্র ও আনন্দময় দৃশ্যের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়। কোনো পণ্যকে আনন্দ, জনপ্রিয়তা কিংবা বন্ধুদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সেটি পাওয়ার আগ্রহ আরও বাড়তে পারে। বিপণনকারীরা এই মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে পণ্যের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করেন।
কাঙ্ক্ষিত পণ্য না পেলে কিছু শিশু কান্নাকাটি, রাগ কিংবা জেদের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানায়। তবে এসব আচরণকে শুধু বিজ্ঞাপনের ফল হিসেবে দেখা ঠিক নয়। শিশুর বয়স, পারিবারিক পরিবেশ, আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ও অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়াও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সমস্যা তৈরি হয় যখন শিশুর কাছে আনন্দ ও তৃপ্তির প্রধান উৎস হয়ে ওঠে নতুন পণ্য কেনা। এতে প্রয়োজন আর ইচ্ছার পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা এবং হতাশা সামলানোর অভ্যাস গড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
জাঙ্ক ফুডের প্রচার, পুষ্টির ঘাটতির আশঙ্কা
খাবারের বিজ্ঞাপনে আকর্ষণীয় পরিবেশনা শিশুদের খাদ্যপছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে। চিপস, মিষ্টিজাতীয় খাবার, কোমল পানীয় ও ফাস্টফুডের প্রতি আগ্রহ বাড়লে ঘরে তৈরি সুষম খাবারের গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও সিনিয়র পুষ্টিবিদ শারমিন আকতার বলেন, চিপস, চকোলেট, আইসক্রিম ও ফাস্টফুডজাতীয় খাবারে ক্ষতিকর চর্বি থাকতে পারে। এসব খাবার অতিরিক্ত খেলে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ফাস্টফুড ও মিষ্টি পানীয়ের অতিরিক্ত গ্রহণ শিশুদের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি মনে করেন, প্যাকেটের আকর্ষণীয় নকশা এবং দোকানে শিশুদের চোখে পড়ে এমন স্থানে পণ্য সাজিয়ে রাখাও তাদের আগ্রহ বাড়ায়। তাই পরিবারের পাশাপাশি বিদ্যালয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং পণ্যের বিজ্ঞাপন ও বিপণনে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।
অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়ার সঙ্গে শৈশবের স্থূলতা, দাঁতের ক্ষয় ও ভবিষ্যতে বিপাকজনিত রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে পুষ্টিকর খাবারের পরিবর্তে এসব পণ্য বেশি খেলে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।
তুলনার চাপ থেকে আত্মবিশ্বাসের সংকট
বিজ্ঞাপনে দামি পোশাক, অত্যাধুনিক খেলনা কিংবা নির্দিষ্ট শারীরিক গঠনকে আকর্ষণীয় জীবনযাপনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। শিশুরা এসব দৃশ্যের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করতে শুরু করলে হীনম্মন্যতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কৈশোরে শরীর ও চেহারা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার মনে করেন, শিশুদের আকৃষ্ট করার মতো উপস্থাপনায় ফাস্টফুডের বিজ্ঞাপন তাদের আগ্রহ বাড়ায়। এসব খাবারের প্রতি অভ্যাস গড়ে উঠলে না পেলে রাগ ও জেদের মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাঁর মতে, বিজ্ঞাপনে নৈতিকতা বজায় রাখা এবং শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের প্রচার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। অভিভাবকেরা আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো পণ্য কিনে দিতে না পারলে শিশুর সঙ্গে বিরোধও তৈরি হতে পারে। তাই শুধু নিষেধ না করে কেন সব পণ্য প্রয়োজনীয় নয়, তা বয়স অনুযায়ী বুঝিয়ে বলা দরকার।
পর্দার সময় বাড়লে কমে খেলাধুলা
ডিজিটাল গেম ও গ্যাজেটের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ শিশুদের মাঠে খেলাধুলা, ঘুম এবং সরাসরি সামাজিক যোগাযোগের সময় কমিয়ে দিতে পারে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা ও শারীরিক সক্রিয়তার অভাব ওজন বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সব ডিজিটাল ব্যবহারই ক্ষতিকর নয়। বয়সোপযোগী কনটেন্ট, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং পড়াশোনা, বিশ্রাম ও খেলাধুলার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
সচেতন পরিবার ও দায়িত্বশীল বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির মহাসচিব ডা. শাহজাদা সেলিমের মতে, শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় খাদ্যপণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারে নীতিমালা প্রয়োজন। শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহও শিশুদের বিকাশে পুষ্টিকর খাবারের গুরুত্ব তুলে ধরে অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দেন।
সমাধানের জন্য বিজ্ঞাপনে পণ্যের স্বাস্থ্যগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য, শিশুদের লক্ষ্য করে বিপণনে উপযুক্ত বিধিনিষেধ এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক পুষ্টিশিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অভিভাবকদেরও শিশুদের সামনে নিজেরা স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় সীমা নির্ধারণ এবং বিকল্প হিসেবে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন।
শিশুদের পণ্য কেনার আকাঙ্ক্ষাকে অপরাধ হিসেবে না দেখে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও বাস্তবতা বোঝার দক্ষতা গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। মুনাফার প্রতিযোগিতায় শিশুদের মনস্তত্ত্ব যেন অসহায় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপনদাতা ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
কালের আলো/টিইকে/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]