সেই অনাথ শিশুকন্যার দায়িত্ব নিয়ে পাহাড়িদের আস্থা-নির্ভরতায় বিজিবি
মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মমতাময়ী স্কুল শিক্ষিকা মা সুমতি চাকমাকে হারিয়ে অকূল পাথারে পড়েন শিশুকন্যা প্রাপ্তি চাকমা। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক-মাচলং সড়কে শনিবার (১৮ জুলাই) ঘটে এই দুর্ঘটনা। কোনো সান্ত্বনায় থামছিল না আট বছরের ছোট্ট শিশুটির চোখের পানি। এই শিশুর ভরণপোষণ, লেখাপড়া ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। অনন্য মানবিক মূল্যবোধে শিশুটির সুন্দর আগামী নিশ্চিতে গ্রহণ করা হয়েছে কার্যকর উদ্যোগ।
স্থানীয় মারিশ্যা ২৭ বিজিবি জোনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাহিদুল ইসলাম সোমবার (২০ জুলাই) সকালে বাবাসহ অনাথ শিশুটিকে স্থানীয় জোন কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানিয়ে স্নেহের পরশে বুকে টেনে নিয়েছেন। জাহিদুল ইসলাম শিশু প্রাপ্তিকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। তাঁর পড়ালেখা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। পাশাপাশি নিহত শিক্ষিকার ঋণের দায়ভার পর্যালোচনা করে তা পরিশোধে বিজিবির পক্ষ থেকে সর্বাত্মক আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেছেন।
জোন কমান্ডারের এই উদ্যোগ কেবলই মাত্র মানবিকতাকেই মুখ্য করে তুলেনি বরং একটি বিপদগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সীমান্ত শার্দুলদের নিত্যকার নি:স্বার্থ দায়িত্ববোধের বহি:প্রকাশ ঘটিয়েছে। যেখানে অশ্রু মুছে হাসি ফোটানোর এক অদম্য সংকল্পের বার্তা রয়েছে। স্থানীয় পাহাড়িদের বিজিবির অনন্য এই মেলবন্ধন যেন পারস্পরিক আস্থা-নির্ভরতার উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠেছে।
এর আগে গত শনিবার (১৮ জুলাই) বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর একটি গাড়ি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ যায় স্থানীয় স্কুল শিক্ষিকা সুমতি চাকমার। মূলত পাহাড়ি অটোরিকশা চালক হবেন্দ্র ত্রিপুরার (৪৪) অদক্ষতা ও বেপরোয়া গতি এই দুর্ঘটনার কারণ বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই অটোরিকশা চালকের লাইসেন্স ছিল না। গাড়িটিও মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেসের। সিএনজি মালিকের পরিচয় নিয়েও জনমনে রয়েছে বিভ্রান্তি।
সাজেকে যাতায়াত করা অনেক পর্যটক জানান, উঁচু পাহাড়ে সাধারণত ডিজেল বা পেট্রোলচালিত গাড়ি চলার কথা। কিন্তু সেখানে সিএনজিচালিত তিন চাকার গাড়ির বেপরোয়া গতিতে চলাচলের প্রবণতা সড়কগুলোতে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ, নি:স্ব করছে অনেক পরিবারকে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগের অভাবে এসব অবৈধ যানের দৌরাত্ম বেড়েছে।
শিশু প্রাপ্তি চাকমা চিরদিনের মতো হারিয়েছেন নিজের মাকে। বুকফাটা নি:শব্দ এক আর্তনাদ, ক্ষত ও গভীর শোকাতাপ বিজিবির হৃদয়-মস্তিষ্ককে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। অনাথ শিশুটিকে দেখভালের পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে একটি পরিবারের একটি শিশুর বেঁচে থাকার অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে জাগরূক রেখে সীমান্তরক্ষীরা ছড়িয়ে দিয়েছে মানবতার আলো।

এদিন অসহায় শিশু প্রাপ্তি চাকমার জীবনে আশার আলো হয়ে আসা বিজিবির জোন কমান্ডারের মানবিক মূল্যবোধের এই উদাহরণ আপ্লুত করেছে সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমাসহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরও। তাঁরাও বলছেন, মমতা ও সহমর্মিতার এই চর্চা শিশুটিকে সুন্দর, ইতিবাচক ও আলোকিত ভোর উপহার দিবে বলে আমরা প্রত্যাশা করি।
কালের আলো/এমএএএমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array