ডলারের বাজারে অস্বাভাবিক বৈপরীত্য
দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে দেখা দিয়েছে এক অস্বাভাবিক বৈপরীত্য। ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দাম ধারাবাহিকভাবে কমলেও খোলা বাজারে ঠিক তার উল্টো চিত্র। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে যেখানে প্রতি ডলারের দাম নেমে এসেছে ১২২ টাকায়, সেখানে খোলা বাজারে ডলার বিক্রি হচ্ছে ১২৮ টাকা ৪০ পয়সা পর্যন্ত। অর্থাৎ ব্যাংক ও খোলা বাজারের মধ্যে প্রতি ডলারে দামের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ টাকা ৪০ পয়সা। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে এই বড় ব্যবধান শুধু বাজারের দুই অংশের ভিন্ন বাস্তবতাই তুলে ধরছে না, বরং ডলারের সরবরাহ, চাহিদা এবং বৈদেশিক লেনদেনের প্রবাহ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দর আরও পড়ে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যাংকাররা। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাজারে ডলারের দর স্থিতিশীল রাখতে আবারও ডলার কেনার চিন্তা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, বাজার থেকে অতিরিক্ত ডলার কেনার বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রয়োজন মনে করলে আগের মতো ব্যাংকগুলোর কাছে থাকা অতিরিক্ত ডলার নিলামের মাধ্যমে কিনতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রেমিট্যান্স বাড়ায় ব্যাংকে ডলারের ‘জোয়ার’
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যায়, আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের দর কমার প্রধান কারণ সরবরাহ বেড়ে যাওয়া। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সে বড় প্রবৃদ্ধির ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। একই সময়ে জ্বালানি তেল, সারসহ সরকারি বিভিন্ন আমদানি ও কেনাকাটার বিপরীতে ডলারের পরিশোধও তুলনামূলক কম হয়েছে। ফলে একদিকে ডলারের জোগান বেড়েছে, অন্যদিকে চাহিদা কমেছে। স্বাভাবিক বাজারনীতিতে এর প্রভাব পড়েছে দামে।
গত ৬ আগস্ট আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের গড় দাম ছিল ১২৩ টাকা ৮১ পয়সা। দুই সপ্তাহ পর বুধবার তা নেমে এসেছে ১২২ টাকায়। অর্থাৎ এই সময়ে ডলারের দাম কমেছে ১ টাকা ৮১ পয়সা বা ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তবে এই পতনকে নিছক ‘টাকার শক্তিশালী হওয়া’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। কারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হওয়ার পেছনে রেমিট্যান্সের উল্লম্ফন যেমন ভূমিকা রাখছে, তেমনি আমদানি ও সরকারি বৈদেশিক পরিশোধের সাময়িক কমে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
অথচ খোলা বাজারে কেন ১২৮ টাকা?
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই। ব্যাংকে ডলারের সরবরাহ বাড়লেও খোলা বাজারে তার উল্টো চিত্র কেন? বুধবার খোলা বাজারে ডলার বিক্রি হয়েছে ১২৮ টাকা ৪০ পয়সা পর্যন্ত। কেনা হয়েছে ১২৮ টাকায়। মতিঝিলের এক ডলার ব্যবসায়ীর ভাষ্য, খোলা বাজারে ডলারের সরবরাহ কমে গেছে। বিক্রেতা কম, কিন্তু ক্রেতার চাপ রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ছে। এর অর্থ হলো, দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে এখন একক একটি বাজার হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে।
ব্যাংকিং চ্যানেলে যে ডলার প্রবাহিত হচ্ছে, তার সবটা খোলা বাজারে যাচ্ছে না। আবার খোলা বাজারে যে চাহিদা তৈরি হচ্ছে, সেটিও আন্তঃব্যাংক বাজারের চাহিদার সঙ্গে সরাসরি মিলে যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রও মনে করেন, আন্তঃব্যাংক বাজারের সঙ্গে খোলা বাজারের দর সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ খোলা বাজারে ডলারের দাম ব্যবসায়ীদের নিজস্ব চাহিদা-জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
বড় ব্যবধানের অর্থ কী?
দুই বাজারে ডলারের দামের ব্যবধান যত বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে তত বেশি বিকৃতির ঝুঁকি তৈরি হয়। ব্যাংকে ১২২ টাকায় পাওয়া ডলার খোলা বাজারে প্রায় ১২৮ টাকা—এই ব্যবধান বাজারে মধ্যস্থতাকারী ও অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের জন্য প্রণোদনা তৈরি করতে পারে। আর এখানেই রেমিট্যান্সের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রবাসীরা সাধারণত বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে যে বিনিময় হার পান, সেটি যদি খোলা বাজারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়, তাহলে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর আকর্ষণ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। একইভাবে রপ্তানিকারকরাও তাদের রপ্তানি আয়ের বিপরীতে তুলনামূলক কম টাকা পেলে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রও স্বীকার করেছেন, ডলারের দাম অতিরিক্ত কমে গেলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন কঠিন ভারসাম্য
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য পরিস্থিতিটি তাই কিছুটা ‘দুই দিকের চাপ’-এর মতো। একদিকে রেমিট্যান্স বাড়ায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। এর ফলে ডলারের দাম কমছে এবং টাকার মূল্য তুলনামূলক শক্তিশালী হচ্ছে। অন্যদিকে ডলারের দাম অতিরিক্ত কমে গেলে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই জায়গাতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনার পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সবশেষ গত ৮ জুন ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ১ কোটি ডলার কিনেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ বিলিয়ন ডলার কিনেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত কোনো ডলার কেনেনি। এখন বাজারে আবার ডলার কেনা হলে এর মূল উদ্দেশ্য হবে শুধু রিজার্ভ বাড়ানো নয়; বরং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ শোষণ করে ডলারের দরকে একটি সহনীয় পর্যায়ে ধরে রাখা।
ডলারের দরপতন কি টাকার শক্তি, নাকি সাময়িক ভারসাম্য?
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আন্তঃব্যাংক বাজারে ১২২ টাকার ডলার কি নতুন স্থায়ী বাস্তবতা, নাকি এটি সাময়িক সরবরাহজনিত পতন? বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ৩০ জুন ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ১৩ আগস্ট, এই হার ছিল ১২১ টাকা ৪৯ পয়সা। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি চিত্রে টাকার মূল্য খুব বেশি শক্তিশালী হয়েছে—এমন দাবি করার সুযোগ সীমিত। বরং সাম্প্রতিক দরপতনকে রেমিট্যান্সের বাড়তি প্রবাহ, আমদানি ও সরকারি পরিশোধের সাময়িক পরিবর্তন এবং বাজারের চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যের ফল হিসেবে দেখাই বেশি যৌক্তিক।
ব্যাংক বনাম খোলা বাজার—দুই দামের বার্তা
বুধবার রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক স্পট মার্কেটে ডলার বিক্রি করেছে ১২৩ টাকা ৫৫ পয়সায় এবং কিনেছে ১২২ টাকা ৫০ পয়সায়। নগদ ডলার বিক্রি করেছে ১২৪ টাকায়। জনতা ব্যাংক স্পট মার্কেটে বিক্রি করেছে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সায় এবং কিনেছে ১২২ টাকা ৬০ পয়সায়। নগদ ডলার বিক্রির দর ছিল ১২৪ টাকা। অন্যদিকে, বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক স্পট মার্কেটে ডলার বিক্রি করেছে ১২২ টাকা ৭২ পয়সায় এবং কিনেছে ১২১ টাকা ৭২ পয়সায়। নগদ ডলার বিক্রি করেছে ১২৫ টাকা ২৫ পয়সায়। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর নগদ ও স্পট বাজারের মধ্যেও কিছুটা ব্যবধান রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যবধানটি তৈরি হয়েছে ব্যাংকিং চ্যানেল এবং খোলা বাজারের মধ্যে।
এখন নজর তিন জায়গায়
এই পরিস্থিতিতে আগামী দিনে তিনটি সূচকের দিকে নজর থাকবে—রেমিট্যান্সের প্রবাহ, রপ্তানি আয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনার নীতি। রেমিট্যান্সের প্রবাহ শক্তিশালী থাকলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। আবার আমদানি চাহিদা বাড়লে সেই অতিরিক্ত ডলার দ্রুত শোষিতও হতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কেনা শুরু করলে সরবরাহের একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে চলে যাবে এবং বাজারে ডলারের অতিরিক্ত চাপ কমবে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে একটি নতুন বৈপরীত্য সামনে এনেছে—ব্যাংকে ডলার যত সস্তা হচ্ছে, খোলা বাজারে ততই দাম বাড়ছে। এই দুই বাজারের ব্যবধান শেষ পর্যন্ত কতটা কমানো যায়, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা। কারণ ডলারের দাম শুধু একটি মুদ্রার বিনিময় হার নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে প্রবাসী আয়, রপ্তানি, আমদানি ব্যয়, রিজার্ভ এবং শেষ পর্যন্ত দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের স্থিতিশীলতা।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array