খুঁজুন
                               
, ,
           

গ্যাসের চাপে থমকে যাচ্ছে শিল্পের চাকা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১০ পূর্বাহ্ণ
গ্যাসের চাপে থমকে যাচ্ছে শিল্পের চাকা

দেশের শিল্প খাত যেন একসঙ্গে কয়েকটি সংকটের ভারে নুয়ে পড়েছে। ডলার সংকট, উচ্চ সুদহার, কাঁচামাল আমদানিতে বাধা, রপ্তানি অর্ডার কমে যাওয়া—এসবের সঙ্গে নতুন করে সবচেয়ে বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। জ্বালানির অনিশ্চয়তায় শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, কমছে রপ্তানি সক্ষমতা। ফলে বিনিয়োগের বদলে উদ্যোক্তাদের এখন টিকে থাকার লড়াই করতে হচ্ছে।

শিল্প মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিল্পাঞ্চলগুলোতে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে অনেক কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, সিরামিক, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। উৎপাদন সচল রাখতে উদ্যোক্তাদের জেনারেটর ও এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।

শিল্পের জন্য সংকটটি শুধু বাড়তি খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গ্যাসের সরবরাহ অনিয়মিত হওয়ায় উৎপাদন পরিকল্পনা ভেঙে পড়ছে। একটি কারখানা নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন করতে না পারলে তার প্রভাব পড়ে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায়। কাঁচামাল থেকে শুরু করে শ্রম, পরিবহন, শিপমেন্ট—সবকিছুর সময়সূচি বদলে যায়। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে জরিমানা গুনতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের, আবার ভবিষ্যৎ অর্ডার পাওয়ার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হচ্ছে।

টেক্সটাইল খাতের পরিস্থিতি এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, স্পিনিং মিলগুলোর একটি বড় অংশ কাঁচামালের সংকটে অর্ধেক সক্ষমতায় চলছে। অর্থাৎ কারখানা আছে, যন্ত্রপাতি আছে, শ্রমিক আছে—কিন্তু উৎপাদন করার মতো পর্যাপ্ত কাঁচামাল ও জ্বালানি নেই। শিল্পের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অপচয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলার সংকট। কাঁচামাল, রাসায়নিক, তুলা, সুতা ও মেশিনারিজ আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় এলসি খুলতে অনেক উদ্যোক্তাই সমস্যায় পড়ছেন। ফলে গ্যাস সংকটের কারণে যে উৎপাদন কমছে, ডলার সংকট সেই উৎপাদন পুনরুদ্ধারের পথও সংকুচিত করছে। অর্থাৎ শিল্পের একটি সংকট আরেকটি সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।

এই পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে উচ্চ সুদহার। বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছানোয় শিল্প উদ্যোক্তাদের ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি চাপে পড়েছেন। উৎপাদন কমলেও ঋণের সুদ ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় কমে না। ফলে আয় কমার বিপরীতে ব্যয় বাড়তে থাকায় অনেক উদ্যোক্তা আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ছেন।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও স্বস্তি নেই। মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল চাহিদার কারণে তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে অর্ডার কমেছে। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, নতুন অর্ডার গত বছরের তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি সংকটে, অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের বাজারও সংকুচিত হচ্ছে। তার ওপর ডলারের উচ্চমূল্য, কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিপিং খরচের চাপ রয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, উৎপাদন কমে যাওয়ার এই প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত রপ্তানি আয়েও প্রভাব ফেলতে পারে। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমবে, উৎপাদন কমলে রপ্তানির জন্য পণ্য কম তৈরি হবে, রপ্তানি কমলে দেশে ডলারের প্রবাহও কমবে। আবার ডলারের সংকটের কারণে কাঁচামাল আমদানি কমলে উৎপাদন আরও কমবে। এভাবে গ্যাস, উৎপাদন, রপ্তানি ও ডলার সংকট একটি পারস্পরিক নির্ভরশীল চক্র তৈরি করছে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের বক্তব্যেও এই আন্তঃসম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। তাঁর মতে, শিল্প খাতের বর্তমান সংকটগুলো আলাদা নয়; একটি সংকট আরেকটিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমছে, উৎপাদন কমলে রপ্তানি কমছে, রপ্তানি কমলে ডলার আসা কমছে এবং ডলার সংকট আবার কাঁচামাল আমদানিতে বাধা তৈরি করছে।

ফলে বর্তমান সংকটকে শুধু ‘গ্যাসের সমস্যা’ হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি এখন শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান এবং বিনিয়োগের পরিবেশ—তিনটিকেই প্রভাবিত করছে। একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে অনিশ্চয়তা। কখন গ্যাস থাকবে, কখন বিদ্যুৎ থাকবে, কবে এলসি খোলা যাবে, কত সুদে ঋণ পাওয়া যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর অনিশ্চিত থাকলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিতে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হতে পারে। এতে শুধু শিল্প মালিক নয়, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট বিপুলসংখ্যক ছোট-বড় ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটি বড় কারখানার উৎপাদন বন্ধ হলে তার সঙ্গে যুক্ত কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন ব্যবসা, প্যাকেজিং, ব্যাংকিং ও অন্যান্য সেবা খাতেও এর প্রভাব পড়ে।

সরকার অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে দেশীয় উৎস থেকে নতুন গ্যাস পাওয়া দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। ফলে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও আমদানিনির্ভরতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে ডলার সরবরাহ, এলসি খোলা এবং শিল্পঋণের সুদহার নিয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বাস্তবতা হলো, শিল্প খাতকে এখন একদিকে উৎপাদন বাড়াতে হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তি ব্যয় সামলাতে হচ্ছে; আবার আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতাও ধরে রাখতে হচ্ছে। এই অবস্থায় জ্বালানি সংকটের সমাধান ছাড়া শিল্পের অন্যান্য সংকটও স্থায়ীভাবে কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি শিল্প ও রপ্তানি খাত। তাই শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া মানে শুধু কয়েকটি কারখানার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ব্যাংকঋণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। গ্যাস-বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা তাই এখন শিল্পের জন্য কোনো বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার মৌলিক শর্ত।

শিল্প উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশার জায়গায় যদি অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে, তাহলে বিনিয়োগের গতি থেমে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান শিল্প সক্ষমতাও ক্ষয়ে যেতে পারে। তাই গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধানের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এখন শিল্প খাতের সবচেয়ে জরুরি দাবি। নইলে গ্যাসের সংকট ধীরে ধীরে শুধু কারখানার উৎপাদন নয়, পুরো অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির চাকার গতিকেই থামিয়ে দিতে পারে।

কালের আলো/এম/এএইচ

চলচ্চিত্রকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন: জহির উদ্দিন স্বপন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৩ অপরাহ্ণ
চলচ্চিত্রকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন: জহির উদ্দিন স্বপন

চলচ্চিত্রকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতানীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন।

শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর মধুমিতা সিনেমা হলে চলচ্চিত্র উৎসব ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দেশের চলচ্চিত্রশিল্প এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় দেশে প্রায় ৮৪০ থেকে ৮৫০টি সিনেমা হল ছিল।

এখন দর্শক যায় এমন সিনেমা হলের সংখ্যা কমে প্রায় ১১৪টিতে নেমে এসেছে। মধুমিতা সিনেমা হলও এখন মূলত দুই ঈদে বেশি সক্রিয় থাকে বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন তিনি।

চলচ্চিত্রের এই সংকটের পেছনে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, রেডিও, ট্রানজিস্টর, ক্যামেরা, ক্যাসেট প্লেয়ার ও সিডির মতো একসময়কার জনপ্রিয় উপকরণ এখন অনেকটাই ইতিহাসের অংশ। একটি মোবাইল ফোনেই এখন সিনেমা দেখা, গান শোনা, ছবি তোলা ও ভিডিও করা যায়। এই পরিবর্তন মানুষের বিনোদনের ধরনমনোজগতেও পরিবর্তন এনেছে।

জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দর্শকের এই পরিবর্তিত মনোজগত বুঝতে না পারলে শুধু ঈদ বা কোরবানির সময় সিনেমা হলে দর্শক আসবে। তাই নির্মাতাদের নতুন দর্শক এবং ডিজিটাল বাজারকে বুঝতে হবে।

তিনি বলেন, এখন বিনোদন কনটেন্টের বড় বাজার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে চলচ্চিত্র ও অন্যান্য কনটেন্ট পৌঁছে দিতে পারলে দর্শক নিজের ডিজিটাল ডিভাইসে তা দেখতে পারবেন এবং ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে নির্মাতারাও অর্থ পাবেন। এতে চলচ্চিত্রের আয়ের সুযোগ প্রচলিত সিনেমা হলনির্ভর ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বাড়তে পারে।

চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা বলেন, উদ্যোক্তা, নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীদের দায়িত্ব শুধু তাঁদের নিজেদের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। এই খাতের জন্য রাষ্ট্রকে নীতিগত সহায়তা দিতে হবে।

তিনি বলেন, চলচ্চিত্র এমন একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম ও কল্যাণবোধ তৈরি করা সম্ভব। এ কারণে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ধরে রাখতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে।

অনুষ্ঠানে গুণী শিল্পীদের সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগের প্রশংসা করেন জহির উদ্দিন স্বপন। নিজের কৈশোর ও তারুণ্যের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, যাঁদের সিনেমা দেখে ও গান শুনে একটি প্রজন্মের রুচি ও সংস্কৃতিবোধ তৈরি হয়েছে, তাঁদের সামনে উপস্থিত হতে পারা এবং সম্মান জানাতে পারা তাঁর জন্য বিরল সুযোগ।

তিনি বিশেষভাবে কিংবদন্তি শিল্পীদের মধ্যে সুজাতা, আজিম ও সুচন্দার নাম উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে যেসব গুণী শিল্পী এরই মধ্যে প্রয়াত হয়েছেন, তাঁদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম। উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু, অভিনেতা আব্দুল আজিজ, অভিনেত্রী দিলারা জামান এবং সিনেমা হল মালিক সমিতির সভাপতি ও মধুমিতা হলের মালিক ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

বর্ষায় বাংলাদেশের যে ১০টি জায়গা সবচেয়ে সুন্দর,যেভাবে যেতে পারবেন

ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৯:১৯ অপরাহ্ণ
বর্ষায় বাংলাদেশের যে ১০টি জায়গা সবচেয়ে সুন্দর,যেভাবে যেতে পারবেন

বর্ষা এলেই বদলে যায় বাংলাদেশের প্রকৃতি। সবুজ পাহাড় আরও গাঢ় হয়ে ওঠে, নদী-খাল-হাওরে জমে স্বচ্ছ জল আর ঝরনাগুলো ফিরে পায় প্রাণ। কোথাও নৌকায় ভেসে দেখা যায় পানির রাজ্য, কোথাও মেঘে ঢাকা পাহাড়। তাই বৃষ্টিকে ঘরবন্দী থাকার কারণ না বানিয়ে বর্ষায় ঘুরে দেখা যেতে পারে দেশের কয়েকটি দারুণ গন্তব্য।

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বর্ষায় বাংলাদেশের ১০টি আকর্ষণীয় জায়গা তুলে ধরা হলো।

১. রাতারগুল, সিলেট

বর্ষায় রাতারগুল যেন পানির ওপর ভেসে থাকা এক বন। সিলেটের গোয়াইনঘাটের এই মিঠাপানির জলাবন বর্ষায় পানিতে ডুবে যায় এবং গাছের ফাঁক দিয়ে নৌকায় ঘোরার সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডও বর্ষাকালকে রাতারগুলের সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠার সময় হিসেবে উল্লেখ করেছে।

যাওয়ার উপায়: ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে সিলেট শহরে যেতে হবে। সিলেট শহর থেকে সিএনজি বা গাড়িতে গোয়াইনঘাটের কাছে গিয়ে নৌকা ভাড়া করে রাতারগুলে যেতে হয়।

২. টাঙ্গুয়ার হাওর, সুনামগঞ্জ

বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওর হয়ে ওঠে বিশাল জলরাশি। নৌকায় করে হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি ঘুরে দেখা, দূরের পাহাড় ও মেঘের দৃশ্য উপভোগ করা—সব মিলিয়ে এটি বর্ষার অন্যতম আকর্ষণ। টাঙ্গুয়ার হাওর একটি রামসার সাইটও।

যাওয়ার উপায়: ঢাকা থেকে বাসে সুনামগঞ্জ যেতে পারেন। সুনামগঞ্জ শহর থেকে তাহিরপুর বা মধ্যনগরের দিকে গিয়ে নৌকা ভাড়া করে হাওর ঘোরা যায়। বর্ষায় নৌকাই এখানকার প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম।

৩. জাফলং, সিলেট

পাহাড়, নদী আর পাথরের সমন্বয়ে জাফলংয়ের সৌন্দর্য বর্ষায় অন্য রকম হয়ে ওঠে। মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহ ও সবুজ প্রকৃতি ভ্রমণকারীদের আকর্ষণ করে। জাফলংকে বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড।

যাওয়ার উপায়: ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে সিলেট শহরে গিয়ে সেখান থেকে সিএনজি, বাস বা মাইক্রোবাসে জাফলং যেতে পারবেন। সিলেট শহর থেকে সড়কপথে জাফলং যেতে সাধারণত কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে।

৪. বিছনাকান্দি, সিলেট

পাথরের বিছানা, পাহাড়ি ঝরনার পানি আর চারপাশের সবুজ—বর্ষায় বিছনাকান্দির দৃশ্য বেশ মনোরম। বৃষ্টির সময় পানির প্রবাহ বাড়ায় এখানকার প্রকৃতিও আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সিলেটের জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোর তালিকায় বিছনাকান্দিও রয়েছে।

যাওয়ার উপায়: প্রথমে সিলেট শহরে যেতে হবে। সেখান থেকে গাড়ি বা সিএনজিতে হাদারবাজার/রুস্তমপুর এলাকায় গিয়ে স্থানীয় নৌকা বা অন্যান্য যানবাহনের মাধ্যমে বিছনাকান্দি যাওয়া যায়।

৫. মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, মৌলভীবাজার

বর্ষায় জলপ্রপাতের সৌন্দর্য দেখতে চাইলে মাধবকুণ্ড হতে পারে ভালো গন্তব্য। বৃষ্টির পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জলপ্রপাতের প্রবাহও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। মাধবকুণ্ডকে সিলেট অঞ্চলের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড।

যাওয়ার উপায়: ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে কুলাউড়া যেতে পারেন। কুলাউড়া থেকে গাড়ি বা সিএনজিতে বড়লেখা হয়ে মাধবকুণ্ডে যাওয়া যায়। মৌলভীবাজার বা সিলেট থেকেও সড়কপথে যাওয়া সম্ভব।

৬. লালাখাল, সিলেট

নীলচে-সবুজ পানির নদী, দুই পাশের সবুজ আর নৌভ্রমণ—লালাখাল বর্ষায় প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আকর্ষণীয় একটি জায়গা। সিলেটের পর্যটন গন্তব্যগুলোর সরকারি তালিকাতেও লালাখালের নাম রয়েছে।

যাওয়ার উপায়: সিলেট শহর থেকে গাড়ি বা সিএনজিতে সারিঘাট যেতে হয়। সারিঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করে লালাখালের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।

৭. নীলগিরি, বান্দরবান

বর্ষায় পাহাড়ি এলাকায় মেঘ ও কুয়াশার আনাগোনা বাড়ে। বান্দরবানের নীলগিরিতে পাহাড়ের ওপর থেকে মেঘে ঢাকা চারপাশের দৃশ্য তাই বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। বর্ষায় বান্দরবানের পাহাড়, ঝরনা ও সবুজ প্রকৃতি নতুন রূপ পায়।

যাওয়ার উপায়: ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান শহরে গিয়ে সেখান থেকে জিপ বা চাঁদের গাড়ি ভাড়া করে নীলগিরির দিকে যেতে হয়। পাহাড়ি রাস্তা হওয়ায় স্থানীয় চালক বা পরিচিত পরিবহন ব্যবহার করা ভালো।

৮. নাফাখুম, বান্দরবান

ঝরনা দেখতে যারা পছন্দ করেন, তাদের কাছে নাফাখুম অন্যতম আকর্ষণ। বর্ষায় পাহাড়ি পানির প্রবাহ বাড়লে ঝরনার দৃশ্য আরও শক্তিশালী ও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। তবে দুর্গম পাহাড়ি পথে যাতায়াতের কারণে এখানে যাওয়ার আগে আবহাওয়া ও স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া জরুরি।

যাওয়ার উপায়: ঢাকা থেকে বান্দরবান, এরপর রুমা হয়ে বগালেক ও থানচির দিকে যেতে হয়। থানচি থেকে স্থানীয় গাইডের সহায়তায় দুর্গম পাহাড়ি পথে নাফাখুম যেতে হয়। বর্ষায় যাওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি ও পথের বর্তমান পরিস্থিতি অবশ্যই জেনে নিতে হবে।

৯. নিকলী হাওর, কিশোরগঞ্জ

বর্ষায় নিকলী হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি যেন এক বিশাল জলভূমিতে পরিণত হয়। পানির মধ্যে ছোট ছোট গ্রাম ও চারপাশের আকাশের দৃশ্য নৌভ্রমণকে করে তুলতে পারে বেশ উপভোগ্য। বর্ষাকালে নিকলী হাওরকে ভ্রমণের আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

যাওয়ার উপায়: ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে কিশোরগঞ্জ যেতে পারেন। কিশোরগঞ্জ শহর থেকে সড়কপথে নিকলী গিয়ে স্থানীয়ভাবে নৌকা ভাড়া করে হাওর ঘোরা যায়।

১০. লাওয়াছড়া, মৌলভীবাজার

পাহাড়ি বন, সবুজ গাছপালা আর বৃষ্টিভেজা পরিবেশ—বর্ষায় লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রকৃতি বেশ সতেজ হয়ে ওঠে। সিলেট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণগুলোর মধ্যে লাওয়াছড়াও রয়েছে।

যাওয়ার উপায়: ঢাকা থেকে ট্রেন বা বাসে শ্রীমঙ্গল যেতে পারেন। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে যাওয়া যায়।

বর্ষায় ঘুরতে গেলে সতর্কতা

বর্ষায় প্রকৃতি সুন্দর হলেও অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসের ঝুঁকি থাকতে পারে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও ঝরনা এলাকায় যাওয়ার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা দেখে নেওয়া উচিত। নৌভ্রমণের সময় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার এবং দুর্গম এলাকায় স্থানীয় গাইডের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি।

কালের আলো/এসএ

দেশে ফিরল কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৬ বাংলাদেশির মরদেহ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬, ৯:১৪ অপরাহ্ণ
দেশে ফিরল কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৬ বাংলাদেশির মরদেহ

কলকাতার একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশির মধ্যে ছয়জনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

শনিবার (২২ আগস্ট) কলকাতা থেকে মরদেহগুলো বাংলাদেশে আনা হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এদিন সকালে সাতক্ষীরার এস এম আলীমুজ্জামানের মরদেহ ঘোজাডাঙ্গা-ভোমরা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়। পরে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

আর বিকেলে কুষ্টিয়ার দেবাশীষ দত্ত এবং একই পরিবারের তিন সদস্য আফসানা শারমিন, শর্ণশিষ দত্ত ও মো. আকরাম আলীর মরদেহ পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে আনা হয়।

এছাড়া ঢাকার আমিনবাজারের নিহত বাবু আহমেদের মরদেহও পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে আনা হয়।

গত বুধবার (১৯ আগস্ট) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশি নিহত হন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দুর্ঘটনার পর থেকেই কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও নিহতদের পরিবারের সঙ্গে সমন্বয় করে মরদেহ দেশে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করে।

কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন জানিয়েছে, মরদেহ সংরক্ষণ, পরিবহন ও দেশে ফেরত পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়ায় নিহতদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সাতক্ষীরার নিহত রেপতি সরকারের মরদেহ তার পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী গতকাল রাতে কলকাতায় সৎকার করা হয়েছে।

এক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উপহাইকমিশন আর্থিকসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিয়েছে বলে জানানো হয়।

কলকাতার হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশিদের নিহত হওয়ার ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ