যুক্তরাষ্ট্রের কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি ডলি পার্টন আর নেই
যুক্তরাষ্ট্রের কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি গায়িকা, গীতিকার, অভিনেত্রী ও মানবহিতৈষী ডলি পার্টন আর নেই। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ৮০ বছর বয়সে ন্যাশভিলে মারা গেছেন বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই শিল্পী। তার মৃত্যুর খবর পরিবার ও প্রতিনিধির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিনিধির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্যানসারের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত লড়াইয়ের পর ন্যাশভিলের ভ্যান্ডারবিল্ট-ইনগ্রাম ক্যানসার সেন্টারে প্রিয়জনদের উপস্থিতিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ডলি পার্টন। তার মৃত্যুতে কান্ট্রি সংগীতসহ বিশ্ব সংগীতাঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
ছয় দশকেরও বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ডলি পার্টন শুধু সংগীতশিল্পী হিসেবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি; চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, ব্যবসা, সাহিত্য ও মানবসেবাতেও তৈরি করেছেন নিজের আলাদা অবস্থান। ‘Jolene’, ‘9 to 5’, ‘Coat of Many Colors’ এবং ‘I Will Always Love You’-এর মতো গান তাকে পরিণত করেছিল বিশ্ব সংগীতের অন্যতম পরিচিত মুখে। তার গান ও কণ্ঠ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে আছে।
১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির সেভিয়ার কাউন্টির দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম ডলি পার্টনের। ১২ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। পাহাড়ি এলাকায় বেড়ে ওঠা ডলির শৈশব ছিল আর্থিক সংকটে ভরা। তবে ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি ছিল তার গভীর টান।
শিশুকালেই গির্জায় গান গাইতেন তিনি। মাত্র ১০ বছর বয়সে গিটার শেখা ও স্থানীয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানে গান গাওয়া শুরু করেন। ১৩ বছর বয়সে ন্যাশভিলের বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ওলে অপ্রি’তে গান পরিবেশনের সুযোগ পান। সেখান থেকেই তার পেশাদার সংগীতজীবনের পথ আরও প্রশস্ত হয়।
১৯৬০-এর দশকে ন্যাশভিলে গিয়ে পেশাদারভাবে সংগীতচর্চা শুরু করেন ডলি। ১৯৬৭ সালে ‘Hello, I’m Dolly’ অ্যালবামের মাধ্যমে একক শিল্পী হিসেবে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর দ্রুতই কান্ট্রি সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পীতে পরিণত হন।
ডলির ক্যারিয়ারে একের পর এক যোগ হতে থাকে জনপ্রিয় গান। ১৯৭০ সালে ‘Joshua’ গান দিয়ে প্রথমবার কান্ট্রি চার্টের শীর্ষে ওঠেন তিনি। তবে ১৯৭৩ সালের ‘Jolene’ তাকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বড় পরিচিতি এনে দেয়।
‘Jolene’ শুধু একটি জনপ্রিয় গানই নয়, কান্ট্রি সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রেম, ঈর্ষা ও হারানোর ভয়কে অত্যন্ত সহজ অথচ আবেগপূর্ণ ভাষায় তুলে ধরেছিলেন ডলি। গানটি পরবর্তী সময়ে অসংখ্য শিল্পী নতুন করে পরিবেশন করেছেন।
ডলির লেখা আরেকটি কালজয়ী গান ‘I Will Always Love You’। ১৯৭৪ সালে নিজের কণ্ঠে গানটি প্রকাশ করেন তিনি। প্রায় দুই দশক পর ১৯৯২ সালে হুইটনি হিউস্টন ‘The Bodyguard’ চলচ্চিত্রের জন্য গানটির নতুন সংস্করণ গেয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাফল্য পান। হিউস্টনের সংস্করণটি গানটিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয় এবং ডলির গীতিকার হিসেবে অসাধারণ প্রতিভাকেও আরও প্রতিষ্ঠিত করে।
দীর্ঘ সংগীতজীবনে ডলি পার্টন প্রায় তিন হাজার গান লিখেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার রেকর্ড বিক্রি হয়েছে ১০ কোটিরও বেশি। ফলে তিনি বিশ্বের সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া নারী সংগীতশিল্পীদের অন্যতম হয়ে ওঠেন।
কান্ট্রি সংগীতের পাশাপাশি পপ ও অন্যান্য ধারার শ্রোতাদের কাছেও তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। কেনি রজার্স, এমিলু হ্যারিস, লিন্ডা রনস্ট্যাড, লরেটা লিন ও উইলি নেলসনসহ বহু কিংবদন্তি শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
১৯৮৩ সালে কেনি রজার্সের সঙ্গে গাওয়া ‘Islands in the Stream’ গানটি বিলবোর্ড হট ১০০-এর শীর্ষে ওঠে। গানটি ডলির সংগীতজীবনের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন ডলি পার্টন। ১৯৮০ সালে জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সঙ্গে ‘9 to 5’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি। চলচ্চিত্রটির জন্য লেখা ‘9 to 5’ গানটিও ব্যাপক জনপ্রিয় হয় এবং অস্কারে সেরা মৌলিক গানের জন্য মনোনয়ন পায়।
এরপর ‘The Best Little Whorehouse in Texas’, ‘Steel Magnolias’সহ বেশ কয়েকটি আলোচিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন ডলি। তার অভিনয় ছিল সংগীতজীবনের স্বাভাবিক সম্প্রসারণের মতো—হাস্যরস, আবেগ ও নিজস্ব ব্যক্তিত্ব দিয়ে তিনি দর্শকদের কাছে আলাদা জায়গা করে নেন।
ডলি পার্টনের ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। তিনি একাধিক গ্র্যামি পুরস্কার জিতেছেন এবং পেয়েছেন গ্র্যামি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডও। সংগীত রচনার অসাধারণ দক্ষতার জন্য তিনি ‘Songwriters Hall of Fame’-এও জায়গা করে নেন।
২০২২ সালে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাকে। প্রথমদিকে এই সম্মাননা গ্রহণ নিয়ে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও পরে তিনি সম্মানটি গ্রহণ করেন এবং এর পরই রক সংগীত নিয়ে কাজ করার নতুন আগ্রহ প্রকাশ করেন।
শুধু গান ও অভিনয় নয়, ব্যবসায়ও অসাধারণ সফল ছিলেন ডলি। টেনেসির গ্রেট স্মোকি মাউন্টেনস অঞ্চলের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। ১৯৮০-এর দশকে একটি স্থানীয় থিম পার্কে বিনিয়োগের পর সেটি পরবর্তীতে ‘Dollywood’ নামে পরিচিতি পায়।
ডলিউড পরবর্তীতে টেনেসির অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়। নিজের শিকড়, অ্যাপালাচিয়ান সংস্কৃতি ও শৈশবের স্মৃতিকে ঘিরে ডলি পার্টন এই উদ্যোগকে গড়ে তুলেছিলেন।
ডলি পার্টনের পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তার মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ড। শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে তার প্রতিষ্ঠিত ‘Imagination Library’ উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের শিশুদের বিনামূল্যে বই দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার কাজ তাকে সংগীতের বাইরেও ব্যাপক সম্মান এনে দেয়।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির চিকিৎসা গবেষণায় ১০ লাখ ডলার অনুদান দেন ডলি। ওই গবেষণা পরবর্তীতে মডার্নার কোভিড-১৯ টিকা তৈরির গবেষণার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
তার দাতব্য কর্মকাণ্ডের পরিধি ছিল আরও বিস্তৃত। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা, শিশুদের শিক্ষা এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে নিয়মিত অর্থ ও সহায়তা দিয়েছেন তিনি। খ্যাতির পাশাপাশি মানুষের জন্য কাজ করাকে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখতেন ডলি।
ডলি পার্টনের স্বামী কার্ল ডিন ২০২৫ সালের মার্চে ৮২ বছর বয়সে মারা যান। প্রায় ছয় দশকের দাম্পত্যজীবন কাটিয়েছেন তারা। তাদের কোনো সন্তান ছিল না।
ব্যক্তিগত জীবনকে সাধারণত প্রচারের আড়ালে রাখলেও ডলি বিভিন্ন সময় তার স্বামী ও পরিবারের প্রতি গভীর ভালোবাসার কথা বলেছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের নানা পর্যায়ে তিনি পরিবার ও নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন।
ডলি পার্টনের মৃত্যু শুধু একজন জনপ্রিয় শিল্পীর বিদায় নয়; এটি আমেরিকান কান্ট্রি সংগীতের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। দরিদ্র টেনেসির পরিবার থেকে উঠে এসে বিশ্ব সংগীতের অন্যতম প্রভাবশালী শিল্পী হয়ে ওঠার গল্পটি নিজেই এক অনুপ্রেরণার ইতিহাস।
গান লিখেছেন, গেয়েছেন, অভিনয় করেছেন, ব্যবসা করেছেন এবং মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন—সব ক্ষেত্রেই নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখে গেছেন ডলি পার্টন। তার গান যেমন প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার কাছে বেঁচে থাকবে, তেমনি শিক্ষা, শিশু কল্যাণ ও মানবসেবায় তার উদ্যোগও দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
৮০ বছর বয়সে তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বিদায় নিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি শুধু কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি ছিলেন না—তিনি ছিলেন আমেরিকান সংস্কৃতিরই এক অনন্য প্রতীক। তার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই বহুদিন বিশ্বজুড়ে বেঁচে থাকবে ডলি পার্টনের নাম।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array