৩০ সেকেন্ডের আতঙ্ক, মাঝ আকাশে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরল ১৭৪ প্রাণ
উড়োজাহাজটি তখন ৩৪ হাজার ফুটের কাছাকাছি উচ্চতায়। দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবের দিকে স্বাভাবিক গতিতেই এগিয়ে যাচ্ছিল ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ ফ্লাইট। বিমানে ছিলেন ১৭৪ যাত্রী ও ক্রু। কিন্তু মুহূর্তেই বদলে যায় সবকিছু।
ককপিটের ভেতর শুরু হয় ভয়াবহ সংঘর্ষ। অভিযোগ উঠেছে, সহকারী পাইলট প্রধান পাইলটকে ছুরিকাঘাত করেন এবং উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপরই বিমানটি দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজার ফুট উচ্চতা হারিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো কেবিনে।
প্রধান পাইলট গুরুতর আহত অবস্থাতেও ককপিটের দরজা খুলে দিতে সক্ষম হন। এরপর যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ককপিটে ঢুকে হামলাকারীকে কাবু করেন। একই বিমানে থাকা আরও দুই ফ্লাইদুবাই পাইলট নিয়ন্ত্রণ নেন। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে উড়োজাহাজটি। ১৭৪ মানুষের জীবন রক্ষা পেলেও এই ঘটনা এখন বিমান নিরাপত্তা, ককপিট সুরক্ষা এবং পাইলট যাচাই নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে এনেছে।
৩০ সেকেন্ডে বদলে গেল সব
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ফ্লাইটটি যখন আকাশে ছিল, তখন সহকারী পাইলট প্রধান পাইলটকে আক্রমণ করেন বলে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা জানান। এরপর উড়োজাহাজটি প্রায় ১৪ হাজার ফুট নিচে নেমে যায় ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে। অন্যদিকে CNN-এর ফ্লাইট ট্র্যাকিং বিশ্লেষণে আরও বড় উচ্চতা পতনের কথা উঠে এসেছে—প্রায় ২০ হাজার ফুট উচ্চতা হারানোর তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন উৎসে সময় ও উচ্চতার পরিমাণে পার্থক্য থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—বিমানটি স্বাভাবিক অবতরণের গতির চেয়ে অনেক দ্রুত নিচে নেমে আতঙ্ক তৈরি করেছিল।
এক যাত্রী বর্ণনা করেছেন, তাঁদের মনে হচ্ছিল উড়োজাহাজটি যেন রোলারকোস্টারের মতো নিচে নেমে যাচ্ছে। শিশুদের কান্না, যাত্রীদের চিৎকার—কেবিনে তৈরি হয় চরম আতঙ্কের পরিবেশ।
রক্তাক্ত হয়েও ককপিটের দরজা খুলে দেন স্মিত
এই ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠেছেন ভারতীয় প্রধান পাইলট স্মিত মচ্ছর। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। রয়টার্স জানিয়েছে, গুরুতর আহত হওয়ার পরও স্মিত ককপিটের দরজা খুলে দিতে সক্ষম হন। ফলে যাত্রী ও ক্রুরা ভেতরে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন। একই সময় বিমানে থাকা আরও দুই পাইলট নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং বিমানটি নিরাপদে তাবুকে নামানো হয়। সৌদি আরবে চিকিৎসাধীন স্মিতের অবস্থা স্থিতিশীল বলে ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। তাঁর চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ভারতীয় দূতাবাস।
‘নায়ক’ স্মিতের পাইলট হওয়ার গল্পও অন্যরকম
স্মিতের পেশাগত জীবনের গল্পও বেশ ভিন্ন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান চালানো তাঁর শৈশবের স্বপ্ন ছিল না। পরিবারের কাপড়ের ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়াশোনার সময় একটি এভিয়েশন সেমিনারে অংশ নেওয়ার পর বিমান চলাচলের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। পরে পাইলট হওয়ার প্রশিক্ষণ নেন। ভারতের স্পাইসজেটে কাজ করার পর ২০২২ সালে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন। তাঁর বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ চালানোর অভিজ্ঞতা এক দশকের বেশি। এখন সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই ভয়াবহ এক পরিস্থিতিতে কাজে লাগল—যদিও এই ঘটনার সময় তিনি নিজেই ছিলেন হামলার শিকার।
যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুন: ককপিটে ঢুকে কাবু করেন হামলাকারীকে
শুধু পাইলট নয়, কয়েকজন যাত্রীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাঁদের একজন ইয়ানিভ হায়ুন। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, স্মিত ককপিটের দরজা খুলে দেওয়ার পর হায়ুন সেখানে ঢুকে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করেন। পরে আরও কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু সদস্য সেখানে যোগ দেন। CNN-এর প্রতিবেদনে হায়ুনের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি হামলাকারীকে চেপে ধরে ককপিট থেকে সরিয়ে দেন। এমনকি বিমান নিয়ন্ত্রণে সহায়তার সময় তিনি আগে দেখা বিমান দুর্ঘটনার তথ্যচিত্র থেকে পাওয়া ধারণার কথা উল্লেখ করেছেন। ঘটনার পর তাঁর পোশাকেও রক্তের দাগ দেখা যায়। ইসরায়েলে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর সঙ্গে কথা বলেন।
কে সেই সহকারী পাইলট?
ঘটনার সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি এখনো এখানেই। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন সহকারী পাইলট ওমানের নাগরিক। তাঁকে সৌদি আরবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের দাবি, তিনি ফ্লাইদুবাইয়ে প্রায় আট মাস ধরে কাজ করছিলেন। তবে তাঁর পূর্ণ পরিচয়, হামলার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কিংবা তিনি একাই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন কি না—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ফ্লাইদুবাই নিজেও ঘটনাটিকে আপাতত ‘ককপিটে সংঘর্ষ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং জানিয়েছে, ঘটনার কারণ ও উদ্দেশ্য এখনো তদন্তাধীন। প্রতিষ্ঠানটি সবাইকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে অনুমাননির্ভর মন্তব্য না করার আহ্বান জানিয়েছে।
কুঠার, ছুরি—অস্ত্র নিয়েও ধোঁয়াশা
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, হামলায় কুঠার ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্মকর্তার বক্তব্যে ছুরিকাঘাতের কথা এসেছে। তাই হামলায় ঠিক কী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, সে বিষয়ে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। তবে প্রধান পাইলটের ওপর হামলা এবং ককপিটে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা—এই দুটি বিষয়ই তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে।
সৌদি আরবেই কেন জরুরি অবতরণ?
বিমানটি ইসরায়েলের দিকে যাচ্ছিল। হামলার পর সেটি সৌদি আরবের তাবুকের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে নিরাপদে অবতরণ করে উড়োজাহাজটি। এখানেও ছিল কূটনৈতিক জটিলতা। ইসরায়েল ও সৌদি আরবের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তাই ইসরায়েল যাত্রীদের ফিরিয়ে নিতে নিজেদের সামরিক উড়োজাহাজ পাঠাতে চাইলেও সৌদি কর্তৃপক্ষ সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। পরে ফ্লাইদুবাইয়ের বিকল্প উড়োজাহাজে করে যাত্রীদের ইসরায়েলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
ঘটনার পর ফ্লাইদুবাইয়ের বড় সিদ্ধান্ত
ঘটনার পর ফ্লাইদুবাই ইসরায়েলগামী ও ইসরায়েল থেকে পরিচালিত ফ্লাইট সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে বলে পরবর্তী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই রুটের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফ্লাইদুবাইয়ের নিজস্ব বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এফজেড১০৭৩ নিরাপদে তাবুকে অবতরণ করেছে এবং যাত্রীদের সবাই নিরাপদ। তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা কাজ করছে।
সন্ত্রাসী হামলা, নাকি ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্য?
ঘটনাটি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—কেন? ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ঘটনাটিকে সম্ভাব্য বড় ধরনের হামলা হিসেবে দেখছেন এবং ইরানের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, হামলাকারীর কোনো সহযোগী ছিল কি না, তা তদন্তের কথা বলেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
এখানেই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। একজন পাইলট কেন নিজের সহকর্মীকে আক্রমণ করলেন? কেন বিমান নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হলো? এর পেছনে কোনো ব্যক্তিগত কারণ ছিল, নাকি বৃহত্তর কোনো পরিকল্পনা—কোনোটিই এখনো নিশ্চিত নয়।
ফ্লাইদুবাইও কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে আগাম সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে। ফলে ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের প্রাথমিক বক্তব্য এবং আনুষ্ঠানিক তদন্তের চূড়ান্ত ফল—দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
‘৯/১১-এর মতো বিপর্যয়’—নেতানিয়াহুর মন্তব্য কেন?
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনাকে সম্ভাব্য ‘৯/১১-এর মতো বিপর্যয়’ এড়ানোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিমানটি যদি নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা না যেত, তাহলে বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারত। তবে এটি নেতানিয়াহুর মূল্যায়ন; তদন্তের চূড়ান্ত ফল নয়। এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য তদন্তে হামলার পেছনে কোনো রাষ্ট্র বা সংগঠনের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়নি।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন প্রশ্ন
ঘটনাটি বিমান নিরাপত্তার একটি সংবেদনশীল জায়গা সামনে এনেছে—ককপিটের ভেতরের নিরাপত্তা। যে জায়গায় যাত্রীদের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, সেখানেই যদি একজন ক্রু সদস্য আরেকজনকে আক্রমণ করেন, তাহলে প্রচলিত ককপিট নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
আরও একটি প্রশ্ন হলো, পাইলটদের নিয়োগ, ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই, মানসিক ও পেশাগত মূল্যায়ন এবং চলমান নজরদারি ব্যবস্থায় এমন কোনো ঝুঁকির সংকেত আগে ধরা পড়েছিল কি না। তবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তদন্ত-তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
১৭৪ যাত্রীর জন্য কয়েক মিনিটের লড়াই
এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বিমানটি শেষ পর্যন্ত বিধ্বস্ত হয়নি। একজন পাইলট গুরুতর আহত হয়েও ককপিটের দরজা খুলেছেন, যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে ককপিটে ঢুকেছেন, ক্রুরা পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন এবং একই বিমানে থাকা প্রশিক্ষিত পাইলটরা নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। এরপর সৌদি আরবের তাবুকে জরুরি অবতরণ করা হয়েছে।
ফ্লাইদুবাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সব যাত্রী নিরাপদে আছেন। আর ঘটনাটি এখন পরিণত হয়েছে একাধিক দেশের তদন্তের বিষয়ে—বিমান সংস্থা, সৌদি কর্তৃপক্ষ, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এতে যুক্ত হচ্ছে।
মাঝ আকাশে কয়েক মিনিটের সেই বিশৃঙ্খলা তাই শুধু একটি ফ্লাইটের জরুরি অবতরণের ঘটনা নয়; এটি এখন ককপিট নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এবং আন্তঃদেশীয় তদন্ত—তিনটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হয়ে উঠেছে।
কালের আলো/জেএন




আপনার মতামত লিখুন
Array