গত বছরের ক্ষতি কাটাতে আগাম আলু চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা
গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশায় দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতে আগাম জাতের আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছে আলু রোপণ। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্যমূল্য পেলে এবার লাভের মুখ দেখার আশা করছেন তাঁরা। তবে বীজ, সার, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে হিলির খট্টামাধবপাড়া এলাকায় আগাম জাতের আলু চাষ শুরু হয়। আগাম জাতের আমন ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে সেখানে বাড়তি ফসল হিসেবে আলু চাষ করেন কৃষকরা। এ অঞ্চলের উর্বর মাটি ও উপযোগী আবহাওয়ায় আলুর ভালো ফলন হয়। পাশাপাশি আগাম আলু বাজারে ওঠায় তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ কারণে প্রতিবছরই এলাকায় আগাম আলুর চাষ বাড়ছে।

তবে গত বছর বাজারে আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েন অনেক কৃষক। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার আগাম আলু চাষে নেমেছেন তাঁরা। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ প্রস্তুত করা জমিতে বীজ রোপণ করছেন।
খট্টামাধবপাড়া গ্রামের কৃষক মাহফুজুর রহমান বলেন, আগাম জাতের ধান কাটার পর জমি প্রস্তুত করে আলুর বীজ রোপণ করা হচ্ছে। আগাম জাতের আলুতে প্রতি বিঘায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মণ ফলন পাওয়া যায়। বাজারে আগে আলু তোলা সম্ভব হওয়ায় দামও তুলনামূলক ভালো পাওয়া যায়। এতে কৃষকরা লাভবান হন।
একই গ্রামের কৃষক মাহবুব হোসেন বলেন, ধান কাটার পর এলাকার কৃষকরা আলু চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার সার, বীজ, শ্রমিকের মজুরি ও জমি চাষের খরচ বেড়েছে। উৎপাদন খরচ বেশি হলেও ভালো ফলন ও দাম পাওয়া গেলে লাভের আশা করছেন তাঁরা।
কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, গত বছর আলু চাষ করে ভালো দাম না পাওয়ায় লোকসান হয়েছে। এ অঞ্চলে আগাম ধান কাটার পর জমিতে আলু চাষ করা হয়। আলু তোলার পর একই জমিতে ভুট্টা চাষ করা হয়। এবার বীজ, সার ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়বে। তাঁর মতে, আলুর দাম মণপ্রতি দুই হাজার টাকার বেশি হলে কিছুটা লাভ হতে পারে।
কৃষক ইব্রাহিম জানান, গত বছর প্রতি মণ আলু ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছিল। এতে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন। সার, তেল, জমি চাষ ও কীটনাশকের দাম বাড়লেও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাঁদের দুর্ভোগ বাড়ছে। গত বছর পাঁচ থেকে ছয় বিঘা জমিতে আলু চাষ করে তাঁর এক থেকে দেড় লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
কৃষক সিদ্দিক হোসেন বলেন, ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে সেখানে আলু চাষ করেন তাঁরা। প্রায় দুই মাসের মধ্যে আলু তোলা যায়। এরপর একই জমিতে অন্য ফসল চাষের সুযোগ থাকে। বাজারে ভালো দাম পেলে কৃষক লাভবান হন, অন্যথায় লোকসান গুনতে হয়।
কৃষক সেলিম হোসেন বলেন, এবার এলাকার বেশির ভাগ কৃষকই আলু চাষে আগ্রহী। তবে গত বছরের তুলনায় বীজের দাম বেড়েছে। গত বছর যে আলুর বীজ ৮০০ টাকায় কেনা যেত, এবার তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকায়। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ন্যায্যমূল্য না পেলে আলু চাষের প্রতি তাঁদের আগ্রহ ও আস্থা কমে যেতে পারে।
আলু রোপণ ঘিরে বেড়েছে কৃষিশ্রমিকদের ব্যস্ততাও। শ্রমিক জাকিরুল ইসলাম বলেন, কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, আবার কোথাও চলছে আলু রোপণ। এরপর আলু তোলার কাজ শুরু হবে। সব মিলিয়ে প্রায় দুই মাস আলু চাষের কাজে ব্যস্ততা থাকবে। এতে তাঁদের কাজ ও আয় বাড়ছে, যা দিয়ে পরিবারের খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে।
শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এলাকায় আলু চাষ শুরু হয়েছে। এখন তাঁরা আলু রোপণের কাজ করছেন। এ কাজ আরও ১৫ দিন চলতে পারে। এরপর শুরু হবে আলু তোলার মৌসুম। কৃষিশ্রমিকের কাজ করে যে আয় হয়, তা দিয়েই তাঁদের সংসার চলে।
হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে উপজেলায় আগাম জাতের আলু চাষ শুরু হয়েছে। প্রতি মৌসুমেই এ অঞ্চলে আগাম আলুর আবাদ হয়। খট্টামাধবপাড়া ইউনিয়নে গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৮০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ সম্পন্ন হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগাম জাতের আলুর জীবনকাল কম। মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে এ আলু তোলা যায় এবং ফলনও ভালো হয়। আগাম আলুর তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার আশায় কৃষকরা প্রতিবছর এ জাতের চাষ করেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করে চাষাবাদ করলে এবারও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গত বছরের লোকসান কাটিয়ে উঠতে এবার আগাম আলু চাষে আশাবাদী হিলির কৃষকরা। তবে তাঁদের প্রত্যাশা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারে আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, যাতে ভালো ফলন সত্ত্বেও লোকসানের আশঙ্কায় পড়তে না হয়।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]