গাছে পেঁপে, কৃষকের চোখে লোকসানের পানি
ঝালকাঠিতে পেঁপের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসানের মুখে পড়েছেন চাষিরা। বাজারে প্রতি কেজি পেঁপে ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হলেও ক্ষেত থেকে পাইকাররা কিনতে চাইছেন মাত্র ১০ থেকে ১২ টাকা দরে। উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না অনেক কৃষক। ফলে গাছের পরিচর্যা কমিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। গাছে পেকে ও মাটিতে পড়ে নষ্ট হচ্ছে পেঁপে। লোকসান সামলাতে না পেরে কোনো কোনো চাষি গাছ কেটেও ফেলছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ঝালকাঠিতে প্রায় ১১৮ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। শাহী জাতসহ বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল জাতের পেঁপে চাষ করেছেন কৃষকেরা। অনুকূল আবহাওয়ায় ফলন ভালো হওয়ায় এবং একই সময়ে বিপুল পরিমাণ পেঁপে বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়েছে। এ মৌসুমে জেলায় পেঁপে উৎপাদিত হয়েছে ১ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, অতিরিক্ত সরবরাহের কারণেই বাজারে দাম কমেছে।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পেঁপের দাম কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক গাছের পরিচর্যা কমিয়ে দিয়েছেন। এতে গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ছে। গাছে পাকা পেঁপে ঝুলে থাকার পাশাপাশি মাটিতে পড়ে পচে নষ্ট হচ্ছে। বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাজার, আড়ত ও পাইকারদের কাছে কম দামে পেঁপে বিক্রি করছেন তাঁরা।
সদর উপজেলার নবগ্রাম গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, দুই বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ করতে তাঁর প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। অথচ ক্ষেত থেকে পাইকাররা প্রতি কেজি পেঁপে ১০ থেকে ১২ টাকা দরে কিনতে চাইছেন। এ দামে বিক্রি করলে শ্রমিকের মজুরি ও ভ্যানভাড়াও উঠবে না। তাই চোখের সামনে পেঁপে নষ্ট হতে দেখলেও তাঁর কিছু করার নেই।
উত্তর বাউকাঠি গ্রামের কৃষক সাদ্দাম হোসেন ছয় বিঘা জমিতে পেঁপে চাষ করে এখন বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেন, দাম এতটাই কম যে ক্ষেতের পরিচর্যা করতেও আর আগ্রহ পান না। এ অবস্থা চলতে থাকলে পেঁপেগাছ কেটে ফেলতে বাধ্য হবেন।
কৃষক তাজুল ইসলাম জানান, প্রতি কেজি পেঁপে ১০ থেকে ১২ টাকা দরে বিক্রি করে তাঁকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে ক্ষতির মুখে পড়ে দুই বিঘা জমির পেঁপেগাছ কেটে ফেলেছেন তিনি। বাকি দেড় বিঘা জমিতে লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশায় সাথি ফসল চাষ করছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামে সার না পাওয়ায় বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি বেড়েছে শ্রমিকের মজুরি, কীটনাশক, বীজ ও সেচের খরচ। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও পেঁপের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁদের।
চাষিরা জানান, এলাকায় পেঁপে সংরক্ষণের জন্য হিমাগার বা উপযুক্ত কোনো ব্যবস্থা নেই। পচনশীল ফল হওয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে পেঁপে সংরক্ষণ করাও কঠিন। সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে বাজারে দাম কম থাকার সময় পেঁপে রেখে পরে বিক্রি করা যেত। এতে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ও লোকসান কমানো সম্ভব হতো বলে মনে করেন তাঁরা।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আলম মামুন বলেন, এ বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে পেঁপে আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। তবে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে বাজারে সাময়িকভাবে দাম কিছুটা কমেছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে পেঁপে চাষে আগ্রহ হারাবেন অনেকে। তাঁদের দাবি, কৃষকের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফল সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে বাম্পার ফলনও কৃষকের জন্য লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি


আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]