তারেক রহমানের কাছে সম্পাদকদের প্রত্যাশা যেসব বিষয়ে
মো.শামসুল আলম খান, কালের আলো:
রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে জাতীয় সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদ সংস্থা এবং অনলাইন মিডিয়ার সম্পাদক এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার (১০ জানুয়ারি) অনুষ্ঠানে প্রাঞ্জল ও যুক্তিনির্ভর বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। অনুষ্ঠানে সম্পাদকরা তার কাছে গণতন্ত্র, স্বাধীন সাংবাদিকতাসহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন। ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাট বন্ধ হওয়া, বাজারে দ্রব্যমূল্য যেন মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে এবং পুলিশ বাহিনীকে নৈতিকতার শিক্ষা দিয়ে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। তারেক রহমানকে আগামীর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শুভেচ্ছা জানান ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন। ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণে তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে এসেছেন এমন মন্তব্য ছিল দৈনিক মানব জমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর। তিনি বলেছেন, সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ- এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে সম্মিলিতভাবে করতে হবে।
বক্তব্যের শুরুতে বাংলাদেশে আসায় বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী সময় এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ের জার্নালিজমের ট্র্যাকগুলো ভালোভাবে স্মরণ রাখতে হবে। বিগত ১৮ বছর জার্নালিজম করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। বিদেশে চলে গিয়ে জার্নালিজম করা আর বন্ধুকে নলের মুখে জার্নালিজম করা কঠিন। দৈনিক ইনকিলাবের ওপর ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইনকিলাব বন্ধ হয়েছিল। আমাদের অফিস থেকে নিউজ এডিটর, চিফ রিপোর্টারসহ ৬ জনকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। আমি পলাতক ছিলাম। আমার বাসা অফিস সব জায়গায় তল্লাশি করা হয়েছে। এরকম অনেক ঘটনা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মাহমুদুর রহমান, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন, শফিক রেহমান, আবুল আসাদসহ সবার উপর যে অন্যায় হয়েছে, সেসব নিউজ দৈনিক ইনকিলাবে ছাপা হয়েছে। ছাপা হয় নাই, এই কথা ঠিক না। তারা বিদেশে ছিলেন বা জেলে ছিলেন, তাই দেখতে পারেন নাই। এই বিষয়গুলো বিএনপিকে স্মরণ রাখতে হবে। এখন এই পরিবেশে যে জার্নালিজম, সেটা তখন সম্ভবকর ছিলো না। ওর মধ্যেও গুরুত্ব সহকারে নিউজগুলো ছাপানো হয়েছে। তারেক রহমানের যে বিশাল ব্যক্তিত্ব এখন তৈরি হয়েছে, সেটা কিন্তু ৫ আগস্ট পূর্ববর্তী জার্নালিজমের কারণেই হয়েছে।’ ইনকিলাব সম্পাদক বলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, আশা এবং যতগুলো সার্ভে আছে; সে অনুযায়ী তারেক রহমানই আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী। আগাম শুভেচ্ছা থাকলো। আমরা আশা করি তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে খুব দ্রুতই সাংবাদিকদের সাথে আরও ‘ইফেক্টিভ ওয়ে’তে কাজ করবেন।’

অনুষ্ঠানে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সাথে জড়িত ছিলেন না। তিনি জানতেন না মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে হয়েছে এবং তিনি ফিরে এসেও জানার চেষ্টা করেন নাই মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে হয়েছে। তাকে আওয়ামী লীগের লোকজন যা বলেছে এবং ভারতীয় পক্ষ যা বলেছে, সেটাকেই তিনি ধরে নিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন এটাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এজন্যই তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। তারেক রহমানের উদ্দেশে মাহমুদুর রহমান বলেন- তারেক রহমান, আপনি ১৭ বছর দেশে ছিলেন না। আপনি জানেন না এখানে কী হয়েছে। আপনার লোকজন আপনাকে যা বলেছে সেটাই আপনি শুনেছেন। এখন যারা মিডিয়ার নতুন বন্ধুরা আপনাকে যেটা বলছে, সেটাই আপনি শুনছেন। আপনি মনে করছেন, এটাই বাংলাদেশের ১৭ বছরের ইতিহাস। বাংলাদেশের ১৭ বছরের ইতিহাস এটা না। সেই ইতিহাস আমি বর্ণনা করব। ভবিষ্যতে যদি আপনি এরকম কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন সেখানে।
লিখতে চান ও বলতে চান জানিয়ে দৈনিক মানব জমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘মিডিয়া ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর অনেকটাই স্বাধীন। অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। নিয়ন্ত্রিত এই কারণে বলছি- মব ভায়োলেন্সের কারণে আমরা সাহসী হতে পারছি না। আমাদের হাত-পা বাঁধা হয়ে যাচ্ছে। মিডিয়া অফিসে যখন আগুন দেওয়া হয়, সংবাদপত্র অফিসে যখন আগুন দেওয়া হয়, তখন আমার ভাবতে কষ্ট লাগে যে আমরা জাহান্নামে আছি না বেহেশতে আছি।’
তারেক রহমানের কাছে প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে এসেছেন। সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে সম্মিলিতভাবে করতে হবে। দলের মধ্যে থেকে যদি করার চেষ্টা করা হয় তাহলে অতীতের মতোই কিন্তু ভুল হবে। সেই ভুল থেকে এমন একটা অবস্থায় চলে যাব, যেখান থেকে আমাদের ফিরে আসা কঠিন হবে। দেশ অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন বলেন, যে উগ্রবাদ আমাদের গ্রাস করার চেষ্টা করছে, এই উগ্রবাদ থেকে দেশকে মুক্ত করতে হলে তারেক রহমান ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনো বিকল্প নেই।
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্র, স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সুশাসন চাই। এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি এবং আপনাকেও (তারেক রহমান) নিশ্চয়ই অনেকে বলেছেন। তিনি আরও বলেন, একটি দু’টি বিষয়ে মনে হয় যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে না। সেটা হচ্ছে-বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো কী। আমি মনে করি, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্লাইমেট চেঞ্জ। এ নিয়ে কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো অত আলোচনা করছে না। বাংলাদেশ কিন্তু একদম ফ্রন্টলাইন দেশের মধ্যে কয়েকটা। ক্লাইমেট চেঞ্জের কী যে ইমপ্যাক্ট হবে-এটা অলরেডি কোস্টাল এরিয়াতে দেখতে পাচ্ছি।’

নিউজ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, ‘এমন সময়ে সবাই সমবেত হয়েছি যখন একটা পুরনো স্বৈরতান্ত্রিক একটা ব্যবস্থা গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটেছে। যেই জন্যে মানুষের এত আত্মদান, সেই আত্মদানের ভিত্তিতে মানুষের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ গড়ে উঠবার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি আমরা। কিন্তু সেটা এখনো গড়ে ওঠে নাই।’ তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে আমরা রাজনীতির সংস্কৃতির নানা ধরনের প্রবণতা দেখেছি। এটার মধ্যে ডান, বাম, মধ্যবর্তী সকল রাজনৈতিক ধারা সক্রিয় ছিল। আবার এগুলোর সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন, সাধারণভাবে একটা শান্তিপূর্ণ সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থা দেখতে চান- এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ ছিল। তাদের আত্মদান আছে। এই সময়ে পরস্পরকে দোষারোপ না করে রাজনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার দিকে এগোনোর আলোচনা হলে সময়ের প্রতি সুবিচার হবে।
নূরুল কবীর আরও বলেন, পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গায় কখনোই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নাই, যেখানে গণমাধ্যমের আইনগত, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছিল না। ফলে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম আর মিডিয়ার গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা এই দুইটা হাত ধরাধরি করে চলেছে। আমরা যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর চাই তাহলে অবশ্যই গণতান্ত্রিক রাজনীতির পাশাপাশি একটা গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার পরিবেশ থাকতে হবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, ‘১৭ বছর টানা বিদেশে থাকাটা খুব কঠিন বিষয়। যখন আপনি নিশ্চিত করে জানেন যে, চাইলেও আপনি এক দিন বা দুদিনের জন্য দেশে ফিরতে পারবেন না। আমার কিছু দিন বিদেশে থাকার অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি জানতাম যে, আমি চাইলে দেশে যেতে পারব।’ প্রায় দেড় যুগের নির্বাসন কাটিয়ে গেল ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। সেদিন এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেশ নিয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। তারেক রহমানের সেই বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, “আপনি আসতে পেরেছেন; স্বপ্ন নিয়ে এসেছেন; একটা পরিকল্পনার কথা বলেছেন। পরিকল্পনা আছে আপনার। ‘আমি শুধু বলতে চাই যে, আপনার সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক, পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন হোক। আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই, অভিনন্দন জানাই, ভালো থাকুন।’

কালের কণ্ঠর সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেন, ‘আমরা দেখেছি যে, গোয়েন্দা শাসিত মিডিয়া। সেই অবস্থার পুনরাবৃত্তি আমরা চাই না। আমরা সত্যিকারের মত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই, যেটা শহীদ জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সময় আমরা পেয়েছি।’ তারেক রহমান অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে আসনে আসনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে করমর্দন ও কুশল বিনিময় করেন। কক্ষের একেবারে পেছনের সারিতে আলোকচিত্রীদের কাছে গিয়েও হাত মেলান তিনি।
কালের আলো/এমএএইচ/এইচএন


আপনার মতামত লিখুন
Array