খুঁজুন
                               
, ,
           

ক্ষমতায় বসার পর বিএনপির সুর পাল্টে গেছে : ডা. শফিকুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬, ৭:৫৭ অপরাহ্ণ
ক্ষমতায় বসার পর বিএনপির সুর পাল্টে গেছে : ডা. শফিকুর রহমান

ক্ষমতায় বসার পর বিএনপির সুর পাল্টে গেছে বলে মন্তব্য করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, নির্বাচনের সময় বলেছিল, তারা নির্বাচিত হলে ফ্যাসিবাদের হাতে যতগুলো খুন হয়েছে, গুম হয়েছে, নির্যাতন হয়েছে, সবগুলার বিচার তারা করবে। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর এখন তাদের সুর পাল্টে গেছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের যাতাকলে পৃষ্ঠ এই জাতিকে আল্লাহতালা আমাদের ছাত্র, শ্রমিক, যুব জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মাত্র দুটি বছর আগে আমাদের মুক্তি দিয়েছিলেন। সেই সময়ে যে দলটি আমাদের মতই মজলুম ছিল, নির্যাতিত ছিল। আজকে তারা ক্ষমতায়। তারা তখন প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছিল।

জামায়াত আমির বলেন, নির্বাচনের সময় তারা বলেছিল, নির্বাচিত হলে ফ্যাসিবাদের হাতে যতগুলো খুন হয়েছে, গুম হয়েছে, নির্যাতন হয়েছে, সবগুলার বিচার তারা করবে। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর এখন তাদের সুর পাল্টে গেছে। বিচার তো তারা করছেই না। গত চার মাসে ৬০০ জনের বেশি মানুষ নির্ভমভাবে বাংলার মাটিতে খুন হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজধানীর বিজয় নগরে ১১ দলীয় জোটের উদ্যোগে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম খুনের বিচারের দাবিতে আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুঃখজনক, এই দলটি নিজেরা নিজেদের কর্মীই খুন করেছে। যাদের নিজেদের কর্মীদের সম্পর্কে নিজেদেরই কোনো দায় এবং দরদ থাকে না। ২০ কোটি মানুষের জন্য তাদের কী দায় এবং দরদ থাকবে? আমরা কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না।

তিনি বলেন, লজ্জার বিষয় বিএনপি ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হওয়ার কথা বলে ঠিক ফ্যাসিবাদের রাজপথ ধরেই তারা এখন হাঁটা শুরু করেছেন।

আমিরে জামায়াত বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, বিভিন্ন ব্যাংকে অযাচিত হস্তক্ষেপ, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলো দলীয় অনুগত লোকদের দিয়ে দখল করা, জেলায় জেলায় প্রশাসক বসিয়ে দেওয়া, এমনকি খেলার মাঠটা পর্যন্ত তারা দলমুক্ত রাখতে পারলেন না। এইভাবে তারা আবার কার্যত একদলীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের দিকেই আগাচ্ছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ কিন্তু বারবার বিপ্লবের সাক্ষী। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, আপনারা বিচার নিশ্চিত করুন না হয় আপনারা যাওয়ার রাস্তা খুঁজে বের করুন। আপনারা যে পথে হাঁটছেন, সংসদে আমরা প্রত্যেকটি বিষয় সেখানে আমরা প্রতিবাদ করছি। দুই তৃতীয়াংশ ভোট কীভাবে পেয়েছেন আপনারাই ভালো জানেন। আর এ দেশের জনগণও জানে এবং এই ব্যাপারে কিছু রাজ সাক্ষীও ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। আপনাদের দলের ভেতর থেকে পাওয়া গেছে। বিগত সরকারের মধ্য থেকেও পাওয়া গেছে।

বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে জামায়াতের আমির বলেন, বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করব। মজলুম ছিলেন, জালেম হবেন না। মেহেরবানী করে বিচারগুলো নিশ্চিত করুন। শুধু ফ্যাসিবাদের হাতে কেন? এই রাস্তায় আমাদের কলিজার টুকরা বিপ্লবের প্রতীক শরিফ উসমান হাদিকে হত্যা করে তার বিচার ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত মামলার চার্জশিট দেওয়া হয় নাই। কাকে খুশি করার জন্য, কোন সত্যকে আড়াল করার জন্য, এটা করা হচ্ছে জনগণ জানতে চায়।

তিনি বলেন, এদেশের মানুষের অন্তরে, কলিজায়, হৃদয়ে, মগজে সব জায়গায় বসে আছে মজবুত ভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ। এই আদর্শকে নির্মূল করার চিন্তা করবেন না। যদিও আপনাদের একজন সিনিয়র নেতা ঘোষণা করে দিয়েছেন নির্মূল করবেন। অতীতে যারা নির্মূল করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তারা নিজেরাই আজকে নির্মূল হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, বেশি নির্মূল, নির্মূল করবেন না। এটা এক ধরনের ভাইরাস। এই ফ্যাসিবাদের ভাইরাস, চাঁদাবাজির ভাইরাস, দুর্নীতির ভাইরাস, দলীয় শাসনের ভাইরাস, এই সব ভাইরাস মুক্ত করার জন্য আরেকটি বিপ্লব অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

কালের আলো/এসএকে

রপ্তানি কমছে, তবু ইউরোপের ডেনিমে এক নম্বর বাংলাদেশ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০১ অপরাহ্ণ
রপ্তানি কমছে, তবু ইউরোপের ডেনিমে এক নম্বর বাংলাদেশ

ইউরোপের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের শীর্ষস্থান অটুট, কিন্তু রপ্তানি আয়ের ধারায় স্বস্তি নেই। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি কমেছে ৫.৮৫ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে বাজার হিস্যা। তবে আগস্টে রপ্তানি বেড়েছে ১২.৭১ শতাংশ, যা দীর্ঘ সময়ের মন্দা পরিস্থিতির মধ্যে নতুন আশার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো প্রধান প্রতিযোগীদের রপ্তানিতে পতন, অন্যদিকে মিসর ও চীনের দ্রুত উত্থান—সব মিলিয়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে।

  • আট মাসে রপ্তানি কমেছে ৫.৮৫ শতাংশ, বাজার হিস্যা নেমেছে ২৯.৪ শতাংশে; আগস্টে ঘুরেছে প্রবৃদ্ধির চাকা
  • পাকিস্তানের চেয়ে রপ্তানি আয় ৩৪ কোটি ইউরো বেশি; তবে মিসর-চীনের উত্থানে বাড়ছে প্রতিযোগিতার চাপ

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউতে বাংলাদেশ থেকে ডেনিম আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৯১ লাখ ইউরো। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৯২ কোটি ৩১ লাখ ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ৫ কোটি ৪০ লাখ ইউরো। শুধু রপ্তানির অঙ্কেই নয়, বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্বেও এই পতনের ছাপ পড়েছে। ইইউর মোট ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের হিস্যা গত বছরের প্রায় ২৯.৯ শতাংশ থেকে কমে ২৯.৪ শতাংশে নেমেছে।

রপ্তানি কমছে আরও বেশি
ইউরোপের ডেনিম বাজারে চাহিদার দুর্বলতা বাংলাদেশের রপ্তানি কমার অন্যতম প্রেক্ষাপট। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিশ্ববাজার থেকে ইইউর মোট ডেনিম আমদানি কমেছে ৪.৪০ শতাংশ। আমদানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ২৯৫ কোটি ৬২ লাখ ইউরো। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ৫.৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ বাজারের সামগ্রিক সংকোচনের চেয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি হ্রাসের হার বেশি। এই ব্যবধানই বাজার হিস্যা কমার ব্যাখ্যা দেয়। ইউরোপে ডেনিমের চাহিদা কমে যাওয়ার প্রভাব সব সরবরাহকারীর ওপর পড়লেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে সেই অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি বাজারের অংশীদারত্ব বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আগস্টে স্বস্তি, ফিরছে কি প্রবৃদ্ধি?
আট মাসের হতাশাজনক হিসাবের মধ্যে ব্যতিক্রম আগস্ট। ওই মাসে ইইউতে বাংলাদেশের ডেনিম রপ্তানি বেড়ে ১৩ কোটি ৪১ লাখ ইউরো হয়েছে। গত বছরের আগস্টে এ আয় ছিল ১১ কোটি ৯০ লাখ ইউরো। সেই হিসাবে প্রবৃদ্ধি ১২.৭১ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর ডেনিম আমদানি বেড়েছে ১১.২৩ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপের বাজারে আমদানি বাড়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে আরও দ্রুত হারে।

এর ফলে আগস্টে ইইউর ডেনিম আমদানিতে বাংলাদেশের হিস্যা ৩০.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩১.২ শতাংশ হয়েছে। তবে এক মাসের এই প্রবৃদ্ধি দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতির মোড় ঘুরেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনো আসেনি। বরং আগস্টের ইতিবাচক ধারা পরবর্তী মাসগুলোতেও বজায় থাকে কি না, সেটিই হবে বাংলাদেশের রপ্তানি পুনরুদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

পাকিস্তানের চেয়ে বড় ব্যবধান, চাপে তুরস্কও
প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো বেশ শক্তিশালী। ইইউর দ্বিতীয় বৃহত্তম ডেনিম সরবরাহকারী পাকিস্তানের রপ্তানি জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ৭.৮৮ শতাংশ কমে ৫২ কোটি ৫৫ লাখ ইউরো হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির রপ্তানি আয়ের ব্যবধান ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ইউরো।

তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী তুরস্কের পরিস্থিতি আরও প্রতিকূল। আট মাসে দেশটির ডেনিম রপ্তানি ২১.০৮ শতাংশ কমে ৪৩ কোটি ৮৩ লাখ ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। ইইউর বাজারে তুরস্কের হিস্যা ১৪.৮২ শতাংশ। এ ছাড়া তিউনিশিয়ার রপ্তানি কমেছে ৬.৪৪ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ৬.৪৭ শতাংশ এবং মরক্কোর ১৪.৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের মতো প্রধান সরবরাহকারীদের বেশ কয়েকটি দেশই ইউরোপের বাজারে রপ্তানি সংকোচনের মুখে রয়েছে। তবে প্রতিযোগীদের রপ্তানি কমে যাওয়াই বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা নিশ্চিত করবে না; নিজেদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনাই এখানে মূল বিষয়।

মিসর-চীনের উত্থানে বদলাচ্ছে প্রতিযোগিতা
ইউরোপের ডেনিম বাজারে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে মিসরের রপ্তানি ৩১.৪৬ শতাংশ বেড়ে ১৮ কোটি ৮১ লাখ ইউরো হয়েছে। চীনের রপ্তানি বেড়েছে ১৭.৭০ শতাংশ, যার মূল্য ১৯ কোটি ৭১ লাখ ইউরো।

ছোট পরিসর থেকে প্রবৃদ্ধির দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে ভিয়েতনাম ও ভারতও। আট মাসে ভিয়েতনামের রপ্তানি ৪৫.৩৮ শতাংশ বেড়ে ৫ কোটি ৪০ লাখ ইউরো এবং ভারতের রপ্তানি ১৮.৬২ শতাংশ বেড়ে ৩ কোটি ১৪ লাখ ইউরো হয়েছে। আগস্টে মিসরের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫৯.৫৭ শতাংশ। একই মাসে পাকিস্তানের রপ্তানি বেড়েছে ১৪.৯৯ শতাংশ। বিপরীতে তুরস্কের রপ্তানি কমেছে ১৩.২৬ শতাংশ।

পরিসংখ্যানের এই বৈপরীত্য দেখাচ্ছে, ইউরোপের বাজারে সব সরবরাহকারী একই ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না। কোনো দেশ রপ্তানি হারাচ্ছে, আবার কোনো দেশ বাড়তি অর্ডার বা বাজারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মিসর ও চীনের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাজারে প্রতিযোগিতার চাপ আরও বাড়তে পারে।

বেশি মূল্য সংযোজনেও জোর
বাংলাদেশের ডেনিম শিল্পের বড় শক্তি দীর্ঘদিনের উৎপাদন অভিজ্ঞতা, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠিত সরবরাহব্যবস্থা। এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বড় পরিসরে পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই সক্ষমতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও উৎপাদন অভিজ্ঞতা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান গড়ে তুলেছে। তাঁর মতে, মূল্যস্ফীতি, দুর্বল আমদানি চাহিদা ও জ্বালানিসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ ইউরোপের পোশাক বাজারকে চাপে রেখেছে, যার প্রভাব বিভিন্ন দেশের রপ্তানিকারকদের ওপর পড়ছে।

এই বাস্তবতায় উচ্চমূল্যের ডেনিম পণ্য উৎপাদন, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শুধু বেশি পরিমাণে পণ্য রপ্তানি নয়, প্রতি ইউনিট পণ্যে মূল্য সংযোজন বাড়াতে পারলেও রপ্তানি আয়ের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

সিটি গ্রুপকে খেলাপি না করে পুনর্গঠনের পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০০ অপরাহ্ণ
সিটি গ্রুপকে খেলাপি না করে পুনর্গঠনের পরামর্শ বাংলাদেশ ব্যাংকের

দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ আপাতত খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত না করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে আর্থিক সংকট কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের বিষয়টি বিবেচনা করতে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রোববার সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে এসব পরামর্শ দেওয়া হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, ডেপুটি গভর্নর কবির আহাম্মদ ও সরোয়ার হোসেন, ঋণদাতা কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী এবং সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসান উপস্থিত ছিলেন।দেশি-বিদেশি ৪৭টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে সিটি গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংক এই ঋণ খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত করে তা আদায়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শ, সিটি গ্রুপের আর্থিক সংকট মোকাবিলা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ঋণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যাতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর আগে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিটি গ্রুপের ঋণ খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত না করার নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কয়েকটি ব্যাংক ঋণ খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত করে। এতে গ্রুপটির আর্থিক সংকট আরও জটিল হয়ে ওঠে।

কারণ, কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণ একটি ব্যাংকে খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত হলে অন্য ব্যাংক থেকেও নতুন ঋণ পাওয়া কিংবা বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সিটি গ্রুপের বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে সিটি গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলের সম্ভাবনা বিবেচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর লক্ষ্য হলো, প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক চাপ সামলে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ফেরার সুযোগ দেওয়া।

বৈঠকে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন, ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খান, প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল রহমান, ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান ও. রশিদ, পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী এবং সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খালিদ মাহমুদ খান। এ ছাড়া আরও কয়েকটি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নেন।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, সিটি গ্রুপ আগে কখনো ঋণ খেলাপি হয়নি এবং গ্রুপটির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও নেই। তাই সবাই চায়, প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান সংকট কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াক। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ব্যাংকগুলোকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে, যাতে সিটি গ্রুপের পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।  সিটি গ্রুপের বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা সচল রাখা এবং আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল কিংবা খেলাপি হিসেবে নথিভুক্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

পরিবেশ বাঁচিয়ে পোকা দমনে নতুন ভরসা পার্চিং

রংপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৪২ অপরাহ্ণ
পরিবেশ বাঁচিয়ে পোকা দমনে নতুন ভরসা পার্চিং

রংপুরের কাউনিয়ায় আমন ধানক্ষেতে ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পার্চিং পদ্ধতি। জমিতে গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি কিংবা ধইঞ্চা গাছ স্থাপন করে পোকাখেকো পাখিদের বসার ব্যবস্থা করছেন কৃষকেরা। এসব পাখি ধানের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। এতে কীটনাশকের ব্যবহার ও উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব কমছে।

কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাউনিয়ায় পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে কীটনাশক বা বালাইনাশক কেনার খরচ প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ফলে কম খরচে ধান চাষের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এ পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। কাউনিয়ার কৃষকেরা মূলত দুই ধরনের পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন—ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং। ডেড পার্চিং পদ্ধতিতে ধানক্ষেতের আইল বা জমির বিভিন্ন স্থানে গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি কিংবা খুঁটি পুঁতে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, লাইভ পার্চিংয়ে ধইঞ্চা বা অন্য কোনো জীবিত গাছ লাগিয়ে পাখিদের বসার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা হয়।

এসব ডাল ও গাছের ওপর বসে ফিঙে, শালিক, বুলবুলি ও দোয়েলসহ বিভিন্ন পোকাখেকো পাখি ধানক্ষেতের ক্ষতিকর পোকামাকড় ধরে খায়। এতে জমিতে রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আমন ধানের সবুজ মাঠের মধ্যে কোথাও ধানের শিষ বের হয়েছে, আবার কোথাও ধান পাকতে শুরু করেছে। দিগন্তজোড়া ধানক্ষেতের মাঝে চোখে পড়ে ধইঞ্চা গাছ, গাছের ডাল ও বাঁশের কঞ্চি। সেগুলোর ওপর বসে পাখিদের পোকামাকড় ধরতে দেখা যায়। কৃষকেরা জানান, পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারে একদিকে যেমন কীটনাশক কেনার খরচ কমছে, অন্যদিকে পরিবেশও তুলনামূলকভাবে দূষণমুক্ত থাকছে। পাখির বিষ্ঠা জমিতে প্রাকৃতিক জৈব উপাদান হিসেবে যোগ হয়ে মাটির উর্বরতা বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে।

নিজপাড়া গ্রামের কৃষক নাছির উদ্দিন বলেন, পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় পার্চিং পদ্ধতি বেশ কার্যকর। এটি পরিবেশবান্ধব এবং খরচও অনেক কম। এ কারণে তারা কীটনাশকের পরিবর্তে এ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। গদাই গ্রামের ধানচাষি শাহজাহান মণ্ডল বলেন, এবার তাদের জমির ধান বেশ সবুজ ও সতেজ হয়েছে। পুরো ক্ষেতেই পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন তিনি। আর কিছুদিন পর সোনালি ধান ঘরে তুলতে পারবেন বলে আশা করছেন।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আমন ধানের ক্ষতিকর পোকামাকড়ের মধ্যে রয়েছে মাজরা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, চুঙ্গি পোকা ও লেদা পোকার মথ। পার্চিংয়ের ওপর বসা পাখিরা এসব পোকার বিভিন্ন পর্যায়ের কীট ও কীড়া ধরে খায়। ফলে পোকামাকড়ের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং তাদের বংশবিস্তার কমাতে এ পদ্ধতি সহায়তা করতে পারে।

কৃষি বিভাগের মতে, পার্চিং পদ্ধতির অন্যতম সুবিধা হলো—এতে বাড়তি রাসায়নিক উপকরণ কেনার প্রয়োজন হয় না। সহজলভ্য গাছের ডাল বা বাঁশের কঞ্চি দিয়েই পাখির বসার ব্যবস্থা করা যায়। ফলে বিশেষ করে সীমিত পুঁজির কৃষকেরা কম খরচে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারেন।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শে আমন মৌসুমের শুরুতেই কৃষকেরা এ প্রাকৃতিক পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন। ধানের চারা রোপণের ২০ দিনের মধ্যে জমিতে পার্চিং স্থাপন করা প্রয়োজন। পোকার আক্রমণ শুরু হওয়ার আগেই এটি স্থাপন করলে পোকা দমনে উপকার পাওয়া যায়। তিনি জানান, প্রতি বিঘা বা ৩৩ শতক আমন জমিতে অন্তত পাঁচ থেকে ছয়টি গাছের ডাল কিংবা বাঁশের কঞ্চি পুঁতে দেওয়া উচিত। এগুলোর উচ্চতা ধানগাছের সর্বোচ্চ উচ্চতার চেয়ে কমপক্ষে এক ফুট বেশি হওয়া দরকার। এতে পাখিরা সহজে বসতে পারে এবং ধানক্ষেতের ওপর নজর রাখতে পারে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সালাহউদ্দিন জানান, চলতি আমন মৌসুমে কাউনিয়ায় ১১ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ১১ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৩৫৫ টন। তিনি বলেন, চলতি বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমন ধানের মাঠের অবস্থা বেশ ভালো। এতে কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের অধিকাংশ কৃষক এবার পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন পরামর্শের মাধ্যমে কৃষকদের এ পদ্ধতির উপকারিতা সম্পর্কে জানানো হচ্ছে। ফলে চলতি মৌসুমে আগের তুলনায় বেশি জমিতে পার্চিং ব্যবহার করা হয়েছে।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, কম খরচে প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর পোকা দমন, কীটনাশকের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশ রক্ষায় পার্চিং পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পোকামাকড়ের আক্রমণ ও ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়াও জরুরি। কৃষকদের মধ্যে এ পদ্ধতির ব্যবহার আরও বাড়ানো গেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব কৃষিচর্চা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। সহজলভ্য উপকরণ ও পাখির প্রাকৃতিক ভূমিকা কাজে লাগিয়ে কাউনিয়ার কৃষকেরা আমন ধান চাষে নতুন সম্ভাবনা দেখছেন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি