রংপুরে আলুর বাম্পার ফলন এবার কৃষকের জন্য আশীর্বাদের বদলে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক কম হওয়ায় হিমাগারে আলু রেখেও লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষিদের। ৫৫ কেজির এক বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট খরচ মিলিয়ে কৃষকের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮২৫ টাকা। অথচ সেই আলু হিমাগারের গেটে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৬০ টাকায়। ফলে প্রতি বস্তায় অন্তত ১৬৫ টাকা লোকসান হচ্ছে, উৎপাদনের অন্যান্য খরচের হিসাবেও লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলাসহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকার আলুচাষিরা বলছেন, গত মৌসুমের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবারও আলু চাষ ও সংরক্ষণ করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু বাজারে দাম না বাড়ায় সেই আশায় গুড়েবালি। অনেক কৃষক লোকসান এড়াতে আলু বিক্রি না করে হিমাগারে রেখে দিয়েছেন। তবে সংরক্ষণ খরচ বাড়তে থাকায় তাঁদের দুশ্চিন্তাও বাড়ছে।
উৎপাদন খরচের চেয়ে কম বাজারদর
মিঠাপুকুর উপজেলার চেংমারী গ্রামের কৃষক বোরহান উদ্দিন গত মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে টিভিএস, স্টিক ও শিল জাতের আলু চাষ করেছিলেন। তাঁর হিসাবে, টিভিএস ও স্টিক জাতের আলু উৎপাদনে প্রতি কেজিতে খরচ হয়েছে ২৭ টাকার বেশি। অথচ হিমাগারের গেটে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১২ টাকা দরে। এতে প্রতি কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা লোকসান হচ্ছে। আগের বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবারও আলু চাষ করেছিলেন বোরহান। কিন্তু প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় হতাশ তিনি। তাঁর মতো অনেক কৃষকই এখন আলু চাষ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে সংশয়ে পড়েছেন। উপজেলার কানুদাসপাড়া গ্রামের দুই ভাই খোরশেদ আলী ও আমিনুর রহমান এবার চার বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। লাভের আশায় উৎপাদিত আলুর বড় অংশ হিমাগারে রেখেছিলেন তাঁরা। কিন্তু বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে থাকায় এখন বিক্রি করতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।
প্রতি বস্তায় খরচ ৮২৫ টাকা, বিক্রি ৬৬০
কৃষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ৫৫ কেজির এক বস্তা আলু হিমাগারে রাখতে বিভিন্ন খাতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৮২৫ টাকা। এর মধ্যে হিমাগার ভাড়া ৩৭৫ টাকা, খালি বস্তা কেনা ১০০ টাকা, হিমাগারে পরিবহন খরচ ৫০ টাকা এবং শ্রমিক খরচ ২০ টাকা। এ ছাড়া বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও চাষাবাদের শ্রমিকের খরচও রয়েছে। অন্যদিকে, হিমাগারের গেটে প্রতি কেজি আলু ১২ টাকা দরে বিক্রি করলে ৫৫ কেজির এক বস্তার দাম দাঁড়ায় ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ উল্লিখিত খরচের হিসাবেই প্রতি বস্তায় ১৬৫ টাকা ঘাটতি থাকছে। উৎপাদন ও অন্যান্য খরচ পুরোপুরি হিসাব করলে কৃষকের প্রকৃত লোকসান আরও বেশি হতে পারে। রানীপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আতাউর রহমান এবার ৪৯ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তিনি বলেন, লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ উঠবে কি না, তা নিয়েই এখন দুশ্চিন্তায় আছেন। আগের বছর ৬৯ বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে তাঁর প্রায় ৫৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। সেই অর্থও তুলতে পারেননি বলে জানান তিনি।
লোকসানের আশঙ্কায় আলু বিক্রি করছেন না অনেকে
রংপুর মহানগরের কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায় দুটি হিমাগারে ৫০০ বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছেন। বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করলে প্রতি কেজিতে প্রায় সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ টাকা লোকসান হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। এ কারণে আপাতত আলু বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে অনেক কৃষকই আলু বিক্রি নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন। একদিকে কম দামে বিক্রি করলে লোকসান, অন্যদিকে হিমাগারে রাখলে বাড়তি খরচের চাপ। ফলে চাষিদের সামনে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
উৎপাদন বেশি, সংরক্ষণের সুযোগ সীমিত
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। এর বিপরীতে বিভাগের ১২৪টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯২ টন, যা মোট উৎপাদনের ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। সংরক্ষিত আলুর মধ্যে ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ, অর্থাৎ ৮ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮ টন আলু এখনও হিমাগারে মজুত রয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ আলু বাজারে কীভাবে বিক্রি হবে এবং কৃষকেরা কতটা লোকসান এড়াতে পারবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে মোট ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ৪০২টি হিমাগার ও ৭০৩টি অ-হিমায়িত মডেল ঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৫৭ টন আলু। এর মধ্যে খাবার আলু ২৪ লাখ ৪৪ হাজার ১৪৮ টন এবং বীজ আলু ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৯১০ টন।
হিমাগারেও মজুত রয়েছে বিপুল পরিমাণ আলু
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার শাহজালাল ও গঙ্গাচড়া উপজেলার এমএনটি হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুভাস মুখার্জি জানান, কয়েক দিন ধরে হিমাগারের গেটে জাতভেদে প্রতি কেজি আলু ১১ থেকে ১৪ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, শাহজালাল হিমাগারের ধারণক্ষমতা ১৫ হাজার টন এবং এমএনটি হিমাগারের ধারণক্ষমতা সাড়ে ৯ হাজার টন। বর্তমানে হিমাগার দুটিতে যথাক্রমে ৪০ ও ৪৮ শতাংশ আলু মজুত রয়েছে। রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৪২টি হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারে খাবার ও বীজ মিলিয়ে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে।
পরিকল্পিত চাষের পরামর্শ কৃষি বিভাগের
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক এস এম আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন, গত দুই বছর ধরে আলু চাষে কৃষকেরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি অপরিকল্পিত চাষাবাদ এবং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদনের কথা উল্লেখ করেন। তিনি কৃষকদের শুধু আলুর ওপর নির্ভর না করে জমির একটি অংশে ভুট্টা, সবজি ও ধানের মতো বিকল্প ফসল চাষের পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে চলতি মৌসুমে হিমাগারে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ আলু কীভাবে ন্যায্য দামে বিক্রি হবে, সেটিই এখন কৃষকদের বড় উদ্বেগ। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর না বাড়লে রংপুর বিভাগের আলুচাষিদের সামগ্রিক লোকসান কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]