খুঁজুন
                               
, ,
           

ফলবাগান বাড়ছে, হারাচ্ছে জুমভূমি—অনিশ্চয়তায় পাহাড়ের ঐতিহ্য

রাঙামাটি সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ
ফলবাগান বাড়ছে, হারাচ্ছে জুমভূমি—অনিশ্চয়তায় পাহাড়ের ঐতিহ্য

খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের পাহাড়ি ঢালে এখন পাকা ধানের সোনালি আভা। কোথাও চলছে ধান কাটার উৎসব, কোথাও ফসল পাহারায় ব্যস্ত জুমচাষিরা। তবে এই মৌসুমি ব্যস্ততার আড়ালে রয়েছে গভীর উদ্বেগ। দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে জুমচাষের জমি, কমছে ফসলের উৎপাদন, বাড়ছে চাষের খরচ। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্য, জীবিকা ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী জুমচাষের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। চলতি বছর তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ৬৮ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে জুমচাষ হয়েছে। এসব জমি থেকে ২৬ হাজার ৬৮১ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জুমের প্রধান ফসল ধান হলেও এর পাশাপাশি হলুদ, আদা, মারফা, শিম, মিষ্টিকুমড়া, আমিলা, তিল, চিনাল, ভুট্টা, মরিচ ও বেগুনসহ প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ ধরনের ফসল চাষ করেন পাহাড়ি কৃষকেরা।

পাহাড়ে ধান কাটার উৎসব, ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমিয়ারা
পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এখন সবুজ পাহাড়ের ঢালে ঢালে পাকা ধানের সোনালি দৃশ্য। কোথাও জুমচাষিরা ধান কাটছেন, কোথাও পাকা ফসল পাহারা দিচ্ছেন। কিছু এলাকায় ধান এখনো সবুজ থাকলেও অন্যান্য ফসল ঘরে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অনেক পরিবার জুমঘরে অবস্থান করে ফসলের দেখাশোনা করছেন।

জুমচাষিদের ভাষ্য, চলতি বছর সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় অনেক এলাকায় ধান বপনে বড় ধরনের বিলম্ব হয়নি। ফলে তুলনামূলক ভালো ফলনও পাওয়া গেছে। তবে পাহাড়ের সব এলাকায় সমান বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ধান পাকার সময়েও পার্থক্য রয়েছে। বৈশাখের শুরুতে প্রথম বৃষ্টির পর যাঁরা ধান বপন করতে পেরেছেন, তাঁদের জমির ফসল আগে কাটার উপযোগী হয়েছে। সাধারণত আগস্টের শেষ দিকে কিংবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় জুমের ধান কাটা শুরু হয়। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে চলে ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানোর কাজ। ধান শুকিয়ে গেলে জুমঘর থেকে তা মূল বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। ধান কাটার আগেই অনেকে মিষ্টিকুমড়া, ভুট্টা, মারফা ও চিনালসহ বিভিন্ন সাথি ফসল সংগ্রহ করে স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি করেন।

পাঁচ বছরে খাগড়াছড়িতে জুমচাষের জমি কমেছে ৫৪ শতাংশ
জুমচাষের মৌসুমি ব্যস্ততার বিপরীতে জমি সংকুচিত হওয়ার চিত্রটি উদ্বেগজনক। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে খাগড়াছড়িতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর পাহাড়ি জমিতে জুমচাষ হয়েছিল। চলতি বছর সেই পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টরে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে জমি কমেছে ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর, যা আগের পরিমাণের প্রায় ৫৪ শতাংশ।

রাঙামাটিতেও এক বছরের ব্যবধানে জুমচাষের জমি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত বছর জেলার ১০ উপজেলায় ৭ হাজার ৬৪৮ হেক্টর জমিতে জুমচাষ হয়েছিল। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৫১০ হেক্টরে। অর্থাৎ এক বছরে কমেছে ১ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমি। অন্যদিকে বান্দরবানে জুমচাষের জমি গত বছরের তুলনায় সামান্য বেড়েছে। গত বছর সেখানে ৮ হাজার ২৬৭ হেক্টর জমিতে জুমচাষ হয়েছিল, চলতি বছর হয়েছে ৮ হাজার ৩৬০ হেক্টরে। তবে জেলায় এ বছরের জুমচাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টর। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় চাষের পরিমাণ এখনো অনেক কম।

ফলবাগান ও বনায়নের বিস্তারে কমছে জুমভূমি
জুমচাষের জমি কমে যাওয়ার পেছনে পাহাড়ি টিলায় বাণিজ্যিক ফলের বাগান গড়ে ওঠা, পরিকল্পিত বনায়ন এবং একই জমিতে ঘন ঘন চাষাবাদের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। পর্যাপ্ত বিরতি না দিয়ে বারবার চাষ করার ফলে পাহাড়ি জমির উর্বরতাও কমছে। একই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাদ্যের চাহিদা বাড়লেও চাষের উপযোগী জমি বাড়ছে না। খাগড়াছড়ির দীঘিনালার সীমানাপাড়া এলাকার কারবারি বা পাড়াপ্রধান চয়ন ত্রিপুরা বলেন, দুর্গম এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জুমচাষ হয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের বাগান, বিশেষ করে সেগুনবাগান ও অন্যান্য গাছের আবাদ বেড়েছে। এতে জুমচাষির সংখ্যা কমে গেছে। জনসংখ্যা বাড়লেও জমি না বাড়ায় তাঁদের এলাকায় জুমচাষ অনেক কমে গেছে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার মতে, জুমচাষ শুধু একটি কৃষিপদ্ধতি নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্য, জীবিকা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কিন্তু ভূমির সংকোচন, বসতি ও বাণিজ্যিক কৃষির বিস্তার, জুমচক্রের বিরতি কমে যাওয়া, জলবায়ুর অনিশ্চয়তা এবং তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহের কারণে এই কৃষিব্যবস্থা সংকটে পড়েছে।

ধানের ফলন অর্ধেক, তবু বাড়ছে উৎপাদন খরচ
জমির সংকোচনের পাশাপাশি জুমের ধানের ফলন কমে যাওয়াও চাষিদের দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে। রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের সীতা পাহাড়ে জুমচাষ করেন সানু মারমা। তিনি জানান, আগে এক হাঁড়িতে ৫০ থেকে ৬০ আঁটি ধান পাওয়া যেত। কিন্তু এ বছর এক হাঁড়িতে ধানের পরিমাণ নেমে এসেছে ২৫ আঁটি বা তারও কমে। অর্থাৎ আগের তুলনায় ফলন অর্ধেক কিংবা তার চেয়েও কম হয়েছে। ফলন কমে যাওয়ায় আগামী বছরও জুমচাষ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এই কৃষক। তাঁর অভিজ্ঞতা পাহাড়ের অনেক জুমচাষির উৎপাদনসংক্রান্ত অনিশ্চয়তারই প্রতিফলন।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার সীমানাপাড়ার জুমচাষি মিলন ০ত্রিপুরা জানান, চলতি বছর তিনি তিন হাঁড়ি জমিতে জুমের ধান চাষ করেছেন। কিন্তু আগের তুলনায় ফলন কমেছে। উৎপাদন ধরে রাখতে এখন সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে চাষের খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে লাভ হচ্ছে না। মিলন ত্রিপুরা বলেন, তাঁর নিজস্ব জমি নেই। জুমচাষ করে বছরে ৩০ থেকে ৩৫ মণ ধান পেলেও এখন সার ও কীটনাশকের পেছনে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে লাভ কমে যাচ্ছে। তাঁর ছেলেমেয়েরাও জুমচাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

জুমচাষ টিকিয়ে রাখতে কৃষি সহায়তা ও জমির সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে ফলের বাগান বাড়ায় জুমচাষের জমি কমছে। এ বছর জুমে ধানের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চাষিদের পাঁচ কেজি করে ধানের বীজ ও ২০ কেজি করে রাসায়নিক সার দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) পক্ষ থেকেও বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি জানান, এ বছর জুমে ব্রি ধান-৮৩, বিনা ধান-১৯ ও বিনা ধান-২১ জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। তাঁর মতে, তিনটি জাতেরই ভালো ফলন হয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক জাতের ফসল উৎপাদনের বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছেন।

রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, পাহাড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যের চাহিদাও বেড়েছে। ফলে নির্দিষ্ট বিরতি না দিয়েই একই জমিতে ঘন ঘন জুমচাষ করা হচ্ছে। এতে পাহাড়ি মাটিতে আগের মতো পর্যাপ্ত জৈব পদার্থ থাকছে না, যা উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের জমিতে পর্যাপ্ত বিরতি দিয়ে জুমচাষ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ঐতিহ্য রক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড়ি মানুষের জীবিকা
জুমচাষের সংকট কেবল কৃষিজমি বা ধানের ফলন কমে যাওয়ার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা, আয়, সংস্কৃতি ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা জীবনধারা। একদিকে বাণিজ্যিক বাগান ও বসতির বিস্তারে চাষের জমি কমছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ফলন হ্রাসের কারণে চাষিরা অর্থনৈতিক চাপে পড়ছেন। তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহও এই কৃষিব্যবস্থার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে জুমচাষ টিকিয়ে রাখতে জমির পরিকল্পিত ব্যবহার, মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ, চাষের মধ্যে পর্যাপ্ত বিরতি নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের কার্যকর সহায়তা দেওয়া জরুরি। পাহাড়ের সোনালি ধানের এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে শুধু ভালো ফলনের মৌসুম নয়, জুমচাষিদের দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা ও জমির অধিকারসংক্রান্ত বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

সৌদির কারাগারে হাজারো বাংলাদেশি, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুজনের তথ্য খুঁজছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৮ অপরাহ্ণ
সৌদির কারাগারে হাজারো বাংলাদেশি, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুজনের তথ্য খুঁজছে সরকার

সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি বন্দী রয়েছেন। দেশটিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে রায়ের অনুলিপি চেয়ে সৌদি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে ওই দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল এবং কী কারণে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পায়নি ঢাকা।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় নিহত বাংলাদেশি কর্মী মো. শাহেদ আহম্মেদের মরদেহ গ্রহণ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিস্তারিত জানতে চায় ঢাকা

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে জানতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কথা বলেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি সৌদি সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে রায়ের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে। নথি পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে। সৌদি সরকার বিভিন্ন সময়ে দণ্ডিত ও কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের তালিকা বাংলাদেশকে পাঠায় উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ বলেন, ওই দুই বাংলাদেশির নাম তালিকায় রয়েছে কি না, তা যাচাই করছে সরকার।

তিনি বলেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা রয়েছে। অন্য দেশের বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করা বাংলাদেশের উদ্দেশ্য নয়। তবে বিদেশে কোনো বাংলাদেশি দণ্ডিত হলে, বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা জরুরি। এ ধরনের ঘটনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে। সাজা মওকুফের সুযোগ থাকলে কূটনৈতিক চ্যানেলে সে বিষয়েও আলোচনা করা হয় বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ছয় মাসে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যু
গত ১০ অক্টোবর সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় নিহত হন বাংলাদেশি কর্মী মো. শাহেদ আহম্মেদ। শুক্রবার সকালে তাঁর মরদেহ দেশে পৌঁছায়। পরে মরদেহ ও সরকারের আর্থিক সহায়তা তাঁর স্ত্রী কহিনুর আক্তার কাকলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

শাহেদের বাড়ি বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামে। তাঁর বাবা মো. রফিকুল ইসলাম এবং মা শাহেরা বেগম। তিনি সৌদি আরবের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জেদ্দা প্রকল্পে প্লাম্বার হিসেবে কাজ করতেন। ছুটি শেষে রিয়াদ হয়ে কর্মস্থলে ফেরার পথে বিমানবন্দরে অবস্থানকালে হামলার শিকার হন তিনি।
ওই হামলায় কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বদরপুর গ্রামের আরেক বাংলাদেশি কর্মী মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরিও নিহত হন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন বাংলাদেশি আহত হন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগের তথ্য অনুযায়ী, আহতের সংখ্যা ছিল ২৪।

শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, সৌদি আরবে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করেন। ফলে দেশটিতে যুদ্ধ বা অন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশি কর্মীদের হতাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। গত ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নিহত ১১ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শাহেদ তাঁদের মধ্যে সর্বশেষ।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, গত এক মাসে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শাহেদের মরদেহ দেশে এসেছে। অন্যদের মরদেহও দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো বাংলাদেশিকে এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়, সেই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বাংলাদেশে আটকে পড়া প্রবাসী কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো ও নবায়নের বিষয়েও সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সংঘাতের কারণে যেসব কর্মী নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না, তাঁদের ভিসাসংক্রান্ত জটিলতা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

মিশনের গাফিলতি পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে
বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশন থেকে প্রবাসীরা যথাযথ সহায়তা পান না—এমন অভিযোগের বিষয়ে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্রতিটি মিশনে শ্রমকল্যাণ উইং রয়েছে। প্রবাসীরা সাধারণত এসব উইংয়ে অভিযোগ জানান। সেখানে প্রবাসীকল্যাণ বা শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কাজ করেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীদের সহায়তা করা দূতাবাস ও সরকারের দায়িত্ব। কোনো মিশনের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় তাঁদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা এবং সংকটকালে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে দেশটির কারাগারে বন্দী বাংলাদেশিদের অবস্থা এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই নাগরিকের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে সরকার।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

৬৯১ কোটি টাকার প্রকল্প, দূষণ কমার নিশ্চয়তা নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ
৬৯১ কোটি টাকার প্রকল্প, দূষণ কমার নিশ্চয়তা নেই

দূষণ মাপতে ৬৯১ কোটি টাকার প্রকল্প, কিন্তু দূষণ কমানোর লক্ষ্যই নেই! বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিবেশ আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। ৩৪টি বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, ১৩টি পরীক্ষাগার ও ১৫টি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার স্থাপনের পাশাপাশি শিল্প-কারখানার নির্গমন নজরদারি জোরদার করা হবে। কিন্তু এত আয়োজনের পর বায়ু ও পানিদূষণ কতটা কমবে, তার পরিমাপযোগ্য কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই প্রকল্প প্রস্তাবে।

অর্থাৎ দূষণ শনাক্ত করার ব্যবস্থা বাড়বে, নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়বে, নজরদারিও বিস্তৃত হবে; কিন্তু প্রকল্প শেষে পরিবেশের কতটা উন্নতি হবে, তার হিসাব নেই। ফলে দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে শেষ পর্যন্ত দূষণ মাপার অবকাঠামোতেই সাফল্য সীমিত থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

  • ৩৪টি বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, ১৩টি পরীক্ষাগার ও ১৫টি ভ্রাম্যমাণ ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা
  • বায়ু-পানিদূষণ হ্রাসের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নেই
  • ব্যয়ের ৯৯.২০ শতাংশ প্রকল্প সহায়তা

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং পরিবেশ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা না গেলে শুধু যন্ত্রপাতি বসিয়ে দূষণ কমানো সম্ভব নয়। তাই প্রকল্পটির বড় প্রশ্ন অর্থের পরিমাণ নয়, বরং এই বিনিয়োগে বাস্তবে কতটা দূষণ কমবে।

‘ইন্টিগ্রেটেড পলিউশন ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট আন্ডার দ্য বিসিএপি’ নামের প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৯০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন পাঁচ কোটি ৫১ লাখ টাকা, আর প্রকল্প সহায়তা ৬৮৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা—মোট ব্যয়ের প্রায় ৯৯.২০ শতাংশ। তবে সরবরাহ করা নথির অংশে এই সহায়তা ঋণ, নাকি অনুদান, তা উল্লেখ নেই।

প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চার বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্প যাচাই কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গত ১১ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।

৩৪ কেন্দ্রে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ
প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে চালু থাকা ৩১টি বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (সিএএমএস) উন্নয়ন এবং নতুন তিনটি কৌশলগত কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সব মিলিয়ে ২৮টি শহুরে, তিনটি গ্রামীণ ও তিনটি আঞ্চলিক স্থানে ৩৪টি কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দূষণের উৎস শনাক্ত এবং বায়ুর মানের পূর্বাভাস দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

শিল্প-কারখানার চিমনি ও যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক নির্গমন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ রয়েছে। বায়ুর মান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য দিতে বসানো হবে ২০টি এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) ডিসপ্লে বোর্ড। তীব্র বায়ুদূষণের সময় করণীয় নির্ধারণে জরুরি পরিকল্পনা, পোড়ানো ইটের বিকল্প নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কৌশল এবং জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার পর্যালোচনাও করা হবে। ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের জন্য দ্বিতীয় জাতীয় পরিকল্পনা তৈরির কাজও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত।

পরীক্ষাগার, আইন সংশোধন ও প্রশিক্ষণ
প্রকল্পের আওতায় তিনটি বিভাগীয় ও ১০টি জেলা পর্যায়ে পরীক্ষাগারসহ প্রশাসনিক কার্যালয় নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় সম্প্রসারণ করে পরীক্ষাগারের ব্যবস্থা করা হবে। ঢাকা বিভাগীয় বা কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার সংস্কারের পাশাপাশি সিলেট, বগুড়া, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার কার্যালয়ে পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া ১৫টি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার চালু এবং দুটি রেফারেন্স পরীক্ষাগারের আন্তর্জাতিক আইএসও/আইইসি ১৭০২৫ স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে।

প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে পরীক্ষাগার ও পর্যবেক্ষণ সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন ব্যাহত হয় এবং নমুনা পরীক্ষায় বিলম্ব ঘটে। এতে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন পরীক্ষাগার ও সরঞ্জামের মাধ্যমে পরীক্ষার সময় কমিয়ে আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া পরিবেশসংক্রান্ত আইন, বিধি ও নীতিমালা সংশোধন, বিভিন্ন শিল্পের জন্য নির্দিষ্ট নির্গমন মান তৈরি, পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইনে পানির মান পর্যবেক্ষণের নির্দেশনা প্রণয়ন করা হবে। শিল্প-কারখানার বর্জ্য পরিশোধনাগার পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন দাখিলের নিয়ম তৈরির পাশাপাশি বস্ত্র খাতে পুনর্ব্যবহার, প্লাস্টিক উৎপাদকের সম্প্রসারিত দায়বদ্ধতা, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের নির্দেশনাও থাকবে। পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও বিধি প্রতিপালন বিষয়ে ৪০০ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ এবং দেশজুড়ে ৫০০টি সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।

দূষণের ভয়াবহতা জানা, কমানোর হিসাব নেই
ডিপিপি অনুযায়ী, বাংলাদেশে বার্ষিক গড় পিএম২.৫-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৬০ থেকে ১০০ মাইক্রোগ্রাম; ঢাকায় ৯০ থেকে ১০০ মাইক্রোগ্রাম। নথিতে উদ্ধৃত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশক মান পাঁচ মাইক্রোগ্রাম। সে হিসাবে দেশের গড় মাত্রা নির্দেশক মানের ১২ থেকে ২০ গুণ এবং ঢাকার মাত্রা ১৮ থেকে ২০ গুণ বেশি।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালিসিস উদ্ধৃত করে প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের সঙ্গে বছরে প্রায় এক লাখ ৫৯ হাজার অকালমৃত্যু এবং অসুস্থ অবস্থায় কাটানো ২৫০ কোটি দিনের সম্পর্ক রয়েছে। দূষণের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য ২০১৯ সালের জিডিপির প্রায় ৮.৩ শতাংশের সমান বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। দূষণের এমন ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরলেও প্রকল্পে বায়ুর মান কতটা উন্নত করা হবে, পানিদূষণ কতটা কমবে কিংবা দূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসে কী ফল পাওয়া যাবে—এসবের কোনো নির্দিষ্ট পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য রাখা হয়নি। ফলে প্রকল্প শেষে বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল যাচাই করা কঠিন হতে পারে।

‘দূষণ মাপা আর দূষণ নিয়ন্ত্রণ এক নয়’
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী ও প্রাকৃতিক অধিকারকেন্দ্রিক সুশাসনের (এনআরএলজি) প্রণেতা এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘দূষণ পরিমাপ করা আর দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়। বায়ু ও পানিদূষণ হ্রাসের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা না থাকলে প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন কঠিন হবে।’

তিনি বলেন, শুধু যন্ত্রপাতি স্থাপন করে দূষণ কমানো সম্ভব নয়। দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, শিল্প-কারখানার নির্গমন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এবং পরিবেশ আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের সফলতা যাচাইয়ে দূষণ হ্রাসের পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ, তথ্য উন্মুক্তকরণ এবং স্বাধীন পরিবেশগত ও আর্থিক নিরীক্ষাও জরুরি।

এম জাকির হোসেন খানের মতে, ৬৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে কতটি যন্ত্র বসানো হলো, শুধু তা দিয়ে প্রকল্পের সাফল্য বিচার করা যাবে না। বরং কতটা দূষণ কমল, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা হ্রাস পেল এবং প্রকৃতির কতটা পুনরুদ্ধার হলো, তা পরিমাপ করতে হবে। তা না হলে বিপুল বিনিয়োগ দূষণ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ব্যয়বহুল পর্যবেক্ষণব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে। যদিও ৬৯১ কোটি টাকার এই প্রকল্প পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু দূষণ কমানোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং স্বাধীন জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে মূল প্রশ্ন থেকেই যাবে—এত টাকা খরচ করে দূষণ কমবে, নাকি শুধু দূষণের পরিমাপ আরও উন্নত হবে?

কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে

পুরোনো কার্টনেই বড় উদ্যোগ, বন্ধুদের নিয়ে সমাজ বদলাতে চায় মুগ্ধ

কুড়িগ্রাম,সংবাদদাতা কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ
পুরোনো কার্টনেই বড় উদ্যোগ, বন্ধুদের নিয়ে সমাজ বদলাতে চায় মুগ্ধ

বয়স মাত্র ১০ বছর। এই বয়সেই পরিবেশ রক্ষা, সড়ক নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী সচেতনতা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শিশু মেসবাহুল ইসলাম মুগ্ধ। পুরোনো কার্টন ও খাতার পাতা দিয়ে নিজ হাতে প্ল্যাকার্ড তৈরি করে রাস্তার পাশের গাছে গাছে টাঙিয়ে দিচ্ছে সে। এ কাজে সহযোগিতা করছে তার বন্ধুরাও।

ফুলবাড়ী উপজেলার শাহবাজার থেকে হাজীর বাজারগামী সড়কের দুই পাশের গাছগুলোতে এখন চোখে পড়ছে মুগ্ধের তৈরি নানা সচেতনতামূলক বার্তা। কোথাও লেখা ‘অকারণে গাছ কাটব না’, কোথাও ‘পাখি আমাদের বন্ধু’ কিংবা ‘পাখিদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ি’। আবার কোনো প্ল্যাকার্ডে রয়েছে ‘মোড়ে গতি কমান, জীবন বাঁচান’, ‘অযথা হর্ন বাজাবেন না’ ও ‘পানিতে ময়লা ফেলবেন না’—এমন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। মাত্র ১০ বছরের একটি শিশুর এমন উদ্যোগ পথচারীদের নজর কাড়ছে। প্রশংসা পাচ্ছে তার বন্ধুমহল ও স্থানীয় মানুষের কাছ থেকেও।

পুরোনো কার্টন-খাতার পাতায় সচেতনতার বার্তা
মুগ্ধ ফুলবাড়ী উপজেলার ঘোগারকুটি গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা সুজাউদ্দৌলা শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং মা গৃহিণী। দুই ভাইয়ের মধ্যে মুগ্ধ দ্বিতীয়। সে উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

বাড়িতে পড়ে থাকা পুরোনো কার্টন ও খাতার পাতা দিয়েই প্ল্যাকার্ড তৈরি করে মুগ্ধ। এরপর নিজের হাতে সেগুলোতে লেখে পরিবেশ সংরক্ষণ, সড়ক নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী সচেতনতা ও নৈতিকতার কথা। বিকেল হলেই বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তার পাশের গাছগুলোতে সুতা দিয়ে টাঙিয়ে দেয় নিজের তৈরি প্ল্যাকার্ড। তার উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টাও রয়েছে। গাছ কাটা থেকে বিরত থাকা, পাখির নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করা, সড়কে সতর্ক থাকা কিংবা পানিতে ময়লা না ফেলার মতো বিষয়গুলো সে তুলে ধরছে সহজ ভাষায়।

বন্ধুরাও পাশে দাঁড়িয়েছে মুগ্ধের
মুগ্ধের এই উদ্যোগে একা নয়, পাশে রয়েছে তার সহপাঠীরাও। বন্ধুরা জানায়, মুগ্ধ বাড়িতে প্ল্যাকার্ড তৈরি করে বিকেলে তাদের ডেকে নেয়। কেউ মই নিয়ে আসে, কেউ নিয়ে আসে সুতা। এরপর সবাই মিলে রাস্তার পাশের গাছগুলোতে প্ল্যাকার্ড টাঙায়। পথচারীরা প্ল্যাকার্ড দেখে প্রশংসা করলে আনন্দ পায় তারাও। ছোট্ট এই দলটির কাছে কাজটি শুধু সময় কাটানোর বিষয় নয়; বরং নিজেদের এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।

‘একজন মানুষও সচেতন হলে নিজেকে সার্থক মনে করব
মুগ্ধ জানায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্ল্যাকার্ড তৈরি ও এর ব্যবহার সম্পর্কে শিখিয়েছেন। শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া সেই শিক্ষা থেকেই তার এ উদ্যোগের শুরু। নিজের এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ইচ্ছা থেকেই এমন কাজ করছে সে। মুগ্ধের ভাষায়, তার এলাকায় অনেকেই মাদক সেবন করেন। আবার অনেক মানুষ পরিবেশ সম্পর্কেও সচেতন নন।

মুগ্ধ বলে, “আমার লেখা প্ল্যাকার্ড দেখে যদি একজন মানুষও মাদক ছেড়ে দেয়, একজন মানুষও যদি পরিবেশের কথা ভাবে, তাহলেই আমি নিজেকে সার্থক মনে করব। ভবিষ্যতেও আমি এ ধরনের কাজ করে যেতে চাই।” একটি শিশুর এই বক্তব্যে ফুটে উঠেছে সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধ এবং ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে বড় পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা।

পথচারীদের চোখে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
শাহবাজার থেকে হাজীর বাজারগামী সড়কে নিয়মিত যাতায়াত করেন স্থানীয় বাসিন্দা ওবায়দুল হক। তিনি বলেন, প্রথমে রাস্তার মোড় ও গাছের পাশে সচেতনতামূলক প্ল্যাকার্ড দেখে তাঁর কৌতূহল তৈরি হয়। পরে জানতে পারেন, মাত্র ১০ বছরের একটি শিশু এগুলো তৈরি করেছে। ওবায়দুল হকের ভাষায়, বিষয়টি সত্যিই অবাক করার মতো। শিশুটির উদ্দেশ্যও অত্যন্ত মহৎ।

স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরা ও আচরণে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরির ক্ষেত্রে মুগ্ধের উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে।

ছেলের উদ্যোগে অবাক বাবা
মুগ্ধের বাবা সুজাউদ্দৌলা জানান, ছেলে যে এমন উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রথমে তিনি জানতেন না। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তার পাশের গাছগুলোতে প্ল্যাকার্ড দেখতে পান। পরে জানতে পারেন, সেগুলো তাঁর ছেলে তৈরি করেছে। ছেলের কাজ দেখে অবাক ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। ভবিষ্যতে এ কাজে ছেলের পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন।

শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রশংসা
উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোবেদ আলী বলেন, মুগ্ধের এ উদ্যোগ অন্য শিক্ষার্থীদেরও ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

পরিবেশ ও সংস্কৃতিকর্মী অধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদ মিয়া মনে করেন, শিশুদের এমন সৃজনশীল ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর প্রত্যাশা, মুগ্ধের মতো নতুন প্রজন্ম জ্ঞান, মেধা ও মানবিক চেতনা দিয়ে সমাজ ও দেশকে বদলে দিতে ভূমিকা রাখবে। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকে পরিবেশ, মানুষের নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে যাচ্ছে মুগ্ধ। পুরোনো কাগজ-কার্টনে লেখা তার ছোট ছোট বাক্য হয়তো একদিনে সমাজ বদলে দেবে না, তবে কাউকে ভাবতে শেখাতে পারে, কাউকে সচেতন করতে পারে। আর সেই সম্ভাবনাকেই সঙ্গী করে বন্ধুদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে ১০ বছরের এই খুদে সচেতনতাকর্মী।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি