পুরোনো কার্টনেই বড় উদ্যোগ, বন্ধুদের নিয়ে সমাজ বদলাতে চায় মুগ্ধ
বয়স মাত্র ১০ বছর। এই বয়সেই পরিবেশ রক্ষা, সড়ক নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী সচেতনতা ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার শিশু মেসবাহুল ইসলাম মুগ্ধ। পুরোনো কার্টন ও খাতার পাতা দিয়ে নিজ হাতে প্ল্যাকার্ড তৈরি করে রাস্তার পাশের গাছে গাছে টাঙিয়ে দিচ্ছে সে। এ কাজে সহযোগিতা করছে তার বন্ধুরাও।
ফুলবাড়ী উপজেলার শাহবাজার থেকে হাজীর বাজারগামী সড়কের দুই পাশের গাছগুলোতে এখন চোখে পড়ছে মুগ্ধের তৈরি নানা সচেতনতামূলক বার্তা। কোথাও লেখা ‘অকারণে গাছ কাটব না’, কোথাও ‘পাখি আমাদের বন্ধু’ কিংবা ‘পাখিদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ি’। আবার কোনো প্ল্যাকার্ডে রয়েছে ‘মোড়ে গতি কমান, জীবন বাঁচান’, ‘অযথা হর্ন বাজাবেন না’ ও ‘পানিতে ময়লা ফেলবেন না’—এমন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
মাত্র ১০ বছরের একটি শিশুর এমন উদ্যোগ পথচারীদের নজর কাড়ছে। প্রশংসা পাচ্ছে তার বন্ধুমহল ও স্থানীয় মানুষের কাছ থেকেও।
পুরোনো কার্টন-খাতার পাতায় সচেতনতার বার্তা
মুগ্ধ ফুলবাড়ী উপজেলার ঘোগারকুটি গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা সুজাউদ্দৌলা শাহবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং মা গৃহিণী। দুই ভাইয়ের মধ্যে মুগ্ধ দ্বিতীয়। সে উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
বাড়িতে পড়ে থাকা পুরোনো কার্টন ও খাতার পাতা দিয়েই প্ল্যাকার্ড তৈরি করে মুগ্ধ। এরপর নিজের হাতে সেগুলোতে লেখে পরিবেশ সংরক্ষণ, সড়ক নিরাপত্তা, মাদকবিরোধী সচেতনতা ও নৈতিকতার কথা। বিকেল হলেই বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। রাস্তার পাশের গাছগুলোতে সুতা দিয়ে টাঙিয়ে দেয় নিজের তৈরি প্ল্যাকার্ড।
তার উদ্যোগে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টাও রয়েছে। গাছ কাটা থেকে বিরত থাকা, পাখির নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করা, সড়কে সতর্ক থাকা কিংবা পানিতে ময়লা না ফেলার মতো বিষয়গুলো সে তুলে ধরছে সহজ ভাষায়।
বন্ধুরাও পাশে দাঁড়িয়েছে মুগ্ধের
মুগ্ধের এই উদ্যোগে একা নয়, পাশে রয়েছে তার সহপাঠীরাও। বন্ধুরা জানায়, মুগ্ধ বাড়িতে প্ল্যাকার্ড তৈরি করে বিকেলে তাদের ডেকে নেয়। কেউ মই নিয়ে আসে, কেউ নিয়ে আসে সুতা। এরপর সবাই মিলে রাস্তার পাশের গাছগুলোতে প্ল্যাকার্ড টাঙায়।
পথচারীরা প্ল্যাকার্ড দেখে প্রশংসা করলে আনন্দ পায় তারাও। ছোট্ট এই দলটির কাছে কাজটি শুধু সময় কাটানোর বিষয় নয়; বরং নিজেদের এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।
‘একজন মানুষও সচেতন হলে নিজেকে সার্থক মনে করব
মুগ্ধ জানায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে প্ল্যাকার্ড তৈরি ও এর ব্যবহার সম্পর্কে শিখিয়েছেন। শিক্ষকের কাছ থেকে পাওয়া সেই শিক্ষা থেকেই তার এ উদ্যোগের শুরু। নিজের এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির ইচ্ছা থেকেই এমন কাজ করছে সে। মুগ্ধের ভাষায়, তার এলাকায় অনেকেই মাদক সেবন করেন। আবার অনেক মানুষ পরিবেশ সম্পর্কেও সচেতন নন।
মুগ্ধ বলে, “আমার লেখা প্ল্যাকার্ড দেখে যদি একজন মানুষও মাদক ছেড়ে দেয়, একজন মানুষও যদি পরিবেশের কথা ভাবে, তাহলেই আমি নিজেকে সার্থক মনে করব। ভবিষ্যতেও আমি এ ধরনের কাজ করে যেতে চাই।” একটি শিশুর এই বক্তব্যে ফুটে উঠেছে সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধ এবং ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে বড় পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা।
পথচারীদের চোখে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
শাহবাজার থেকে হাজীর বাজারগামী সড়কে নিয়মিত যাতায়াত করেন স্থানীয় বাসিন্দা ওবায়দুল হক। তিনি বলেন, প্রথমে রাস্তার মোড় ও গাছের পাশে সচেতনতামূলক প্ল্যাকার্ড দেখে তাঁর কৌতূহল তৈরি হয়। পরে জানতে পারেন, মাত্র ১০ বছরের একটি শিশু এগুলো তৈরি করেছে। ওবায়দুল হকের ভাষায়, বিষয়টি সত্যিই অবাক করার মতো। শিশুটির উদ্দেশ্যও অত্যন্ত মহৎ।
স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ মানুষের দৈনন্দিন চলাফেরা ও আচরণে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরির ক্ষেত্রে মুগ্ধের উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে।
ছেলের উদ্যোগে অবাক বাবা
মুগ্ধের বাবা সুজাউদ্দৌলা জানান, ছেলে যে এমন উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রথমে তিনি জানতেন না। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তার পাশের গাছগুলোতে প্ল্যাকার্ড দেখতে পান। পরে জানতে পারেন, সেগুলো তাঁর ছেলে তৈরি করেছে। ছেলের কাজ দেখে অবাক ও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। ভবিষ্যতে এ কাজে ছেলের পাশে থাকার আশ্বাসও দিয়েছেন।

শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের প্রশংসা
উত্তর ঘোগারকুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোবেদ আলী বলেন, মুগ্ধের এ উদ্যোগ অন্য শিক্ষার্থীদেরও ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
পরিবেশ ও সংস্কৃতিকর্মী অধ্যক্ষ নূর মোহাম্মদ মিয়া মনে করেন, শিশুদের এমন সৃজনশীল ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর প্রত্যাশা, মুগ্ধের মতো নতুন প্রজন্ম জ্ঞান, মেধা ও মানবিক চেতনা দিয়ে সমাজ ও দেশকে বদলে দিতে ভূমিকা রাখবে। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকে পরিবেশ, মানুষের নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে যাচ্ছে মুগ্ধ। পুরোনো কাগজ-কার্টনে লেখা তার ছোট ছোট বাক্য হয়তো একদিনে সমাজ বদলে দেবে না, তবে কাউকে ভাবতে শেখাতে পারে, কাউকে সচেতন করতে পারে। আর সেই সম্ভাবনাকেই সঙ্গী করে বন্ধুদের নিয়ে এগিয়ে চলেছে ১০ বছরের এই খুদে সচেতনতাকর্মী।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]