সংযুক্ত আরব আমিরাতে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে টানা দুই হারে ফাইনালের আগেই বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ। বড় টুর্নামেন্টে শিরোপা জয়ের স্বপ্নের কথা বলা হলেও মাঠের পারফরম্যান্সে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না—দলের এই বাস্তবতা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয়। তাঁর মতে, ট্রফি জয়ের ক্ষুধা খেলোয়াড়দের মধ্যে থাকলেও সেই আকাঙ্ক্ষাকে পারফরম্যান্সে রূপ দিতে পারছে না দল।
বুধবার (২১ অক্টোবর) শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের কাছে ৭ উইকেটে হেরেছে বাংলাদেশ। এর আগে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৯৯ রানে পরাজিত হয়েছিল দলটি। টানা দুই হারে ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ব্যাটিংয়ে মাত্র ১৬০ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচে লড়াই জমিয়ে তোলার সুযোগও তৈরি করতে পারেনি হৃদয়ের দল।
শিরোপা জয়ের কথা বললেই হয় না, মাঠেও প্রমাণ দিতে হবে
বড় আসরে বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান নিয়ে ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে হতাশা প্রকাশ করেন তাওহীদ হৃদয়। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, টুর্নামেন্ট শুরুর আগে শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও সেই লক্ষ্যের সঙ্গে মাঠের পারফরম্যান্সের মিল থাকছে না।
হৃদয় বলেন, ‘যখনই আমরা বড় কোনো সিরিজ, ত্রিদেশীয় সিরিজ, এশিয়া কাপ কিংবা বিশ্বকাপ খেলতে যাই, ব্যক্তিগতভাবে এবং দল হিসেবে সবাই ট্রফি জিততে চাই। এই ক্ষুধাটা সবার মধ্যেই আছে। কিন্তু আমরা শুধু মুখেই বলি, আমাদের কাজে সেটার প্রতিফলন দেখা যায় না।’
ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কের এই মন্তব্য বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের একটি সমস্যাকে সামনে নিয়ে এসেছে। বড় কোনো টুর্নামেন্টের আগে সমর্থকদের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়, খেলোয়াড়েরাও শিরোপা জয়ের লক্ষ্য ঘোষণা করেন। কিন্তু মাঠে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখাতে না পারায় সেই স্বপ্ন বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
টানা দুই হারে ফাইনালের আগেই বিদায়
ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের শুরুটাই হয়েছিল হতাশাজনক। প্রথম ম্যাচে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৯৯ রানের বড় ব্যবধানে হারের পর আফগানিস্তানের বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ ছিল দলের সামনে। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেও ব্যাটিং ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে আগে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ১৬০ রানে অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। এত কম পুঁজি নিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলা কঠিন ছিল। শেষ পর্যন্ত ৭ উইকেটের হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় দলকে। দুই ম্যাচে দুই পরাজয়ে ফাইনালে ওঠার আগেই শেষ হয় বাংলাদেশের টুর্নামেন্ট।
ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতাকেই বড় সমস্যা বলছেন হৃদয়
দলের এমন পারফরম্যান্সের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ব্যাটিং ব্যর্থতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন হৃদয়। কোনো নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে দায়ী না করলেও শেষ দুই ম্যাচে ব্যাটসম্যানদের পারফরম্যান্স নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন ছিল কঠোর। হৃদয় বলেন, ‘আমি নির্দিষ্ট কোনো জায়গার দিকে আঙুল তুলতে চাই না। তবে পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে, সমস্যা আমাদের ব্যাটসম্যানদের। শেষ দুই ম্যাচে আমরা খুবই বাজে ব্যাটিং করেছি। আর সে কারণেই পুরো দলকে ভুগতে হয়েছে।’
আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানো বাংলাদেশের ব্যাটিং দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বড় সংগ্রহ গড়তে না পারা এবং প্রতিপক্ষের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বোলারদের জন্যও ম্যাচে ফেরার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। হৃদয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে দেশের বাইরে ওয়ানডে ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের যে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে, তা কাটিয়ে ওঠা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘরের মাঠে সাফল্য থাকলেও বিদেশে ধারাবাহিকতা নেই
তবে সাম্প্রতিক দুই ম্যাচের ফলের ভিত্তিতে পুরো দলকে ব্যর্থ বলে বিবেচনা করতে রাজি নন হৃদয়। তাঁর মতে, ওয়ানডে ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মাটিতে ভালো করেছে বাংলাদেশ। ত্রিদেশীয় সিরিজে অংশ নেওয়ার আগে নিজেদের সর্বশেষ পাঁচটি ওয়ানডে সিরিজের চারটিতে জয় পেয়েছিল দল।
ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয়ের সাফল্যও রয়েছে বাংলাদেশের। এসব ফলাফল দলের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেও দেশের বাইরে সেই পারফরম্যান্স ধরে রাখতে না পারার বিষয়টি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। হৃদয় বলেন, ‘এক-দুটি ম্যাচ বা সিরিজের ভিত্তিতে দলের কী হয়েছে, সেটা বলতে চাই না। দল ভালো অবস্থাতেই আছে। তবে আমি আগেও বলেছি, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাইরে আমাদের ব্যাটিং খুবই খারাপ হয়েছে, সেটা স্পষ্ট।’
বিদেশের মাটিতে ব্যাটিং দুর্বলতা কাটানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের ক্রিকেটে ঘরের মাঠে সাফল্য এবং বিদেশের মাটিতে ব্যর্থতার পার্থক্য নতুন নয়। নিজেদের পরিচিত কন্ডিশনে ভালো খেললেও ভিন্ন পরিবেশে ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে প্রায়ই সমস্যায় পড়ে দল। চলতি ত্রিদেশীয় সিরিজের ফলও সেই দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।
বিশেষ করে বড় টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে হলে শুধু শিরোপা জয়ের প্রত্যাশা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; সেই লক্ষ্য পূরণে ব্যাটিং, বোলিং ও সামগ্রিক দলীয় পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা দেখাতে হবে। তাওহীদ হৃদয়ের বক্তব্যেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন রয়েছে।
টানা দুই হারে সিরিজ থেকে বিদায়ের পর বাংলাদেশের সামনে এখন নিজেদের ব্যাটিং সমস্যা চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠার চ্যালেঞ্জ। কারণ, শিরোপা জয়ের স্বপ্ন যত বড়ই হোক, মাঠের পারফরম্যান্সে তার প্রমাণ না মিললে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়া কঠিন।
কালের আলো/এসএ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]